চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। বহুল প্রত্যাশিত এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোও। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে চাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন। তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে।
তফসিল অনুযায়ী খু্ঁটিনাটি তথ্য : চাকসু নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ১ সেপ্টেম্বর। খসড়া ভোটার তালিকায় আপত্তি গ্রহণ করা হবে ৪ সেপ্টেম্বর। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ১১ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে ১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে ১৫–১৭ সেপ্টেম্বর। মনোনয়ন পত্র যাচাই–বাছাই করা হবে ১৮ সেপ্টেম্বর। প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে ২১ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর। প্রার্থীদের বিষয়ে আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি হবে ২৪ সেপ্টেম্বর। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৫ সেপ্টেম্বর। ভোটগ্রহণ করা হবে ১২ অক্টোবর।
তফসিল ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মন্তব্য : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন পর ভোটের সুযোগ পাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, চাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করবে।
কলা অনুষদের শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান বলেন, চবি প্রশাসনকে ধন্যবাদ তফসিল ঘোষণা করায়। দীর্ঘ ৩ যুগ পর চাকসু নির্বাচন হবে, যার কারণে আমরা খুবই আনন্দিত। আগে সিনিয়রদের থেকে চাকসু নির্বাচনের গল্প শুনতাম এখন তা নিজের চোখের সামনে অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাই সুষ্ঠু নির্বাচন হতে যত রকমের সহযোগিতা লাগবে সেই বিষয়টা প্রশাসন মাথায় রাখবে। এবং সবাই যেন তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে ও চাকসুর সুষ্ঠু একটা নির্বাচন উপহার পাবো এমনটা প্রত্যাশা করি।
আরবী বিভাগের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান বলেন, তফসিল ঘোষণা করায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন চাকসু নির্বাচন অবশেষে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। আমরা চাই কোনো প্রকার ঝামেলা বিহীন সুন্দর ও সুষ্ঠু একটা চাকসু নির্বাচন যেন হয়। সেখানে দল মত নির্বিশেষে সবাই যেন সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে এমনটা প্রত্যাশা করি।
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময়ের এই শূন্যতা ভরাটের মাধ্যমে শুধু ছাত্র রাজনীতিই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক চর্চা নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পাবে। একইসঙ্গে চাকসুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসন, পরিবহন ও নানান সমস্যা নিয়ে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার একটি প্ল্যাটফর্ম পাবে।
তফসিল ঘোষণায় রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মন্তব্য : তফসিল ঘোষণাকে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা স্বাগত জানান। চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্যাহ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এবং চাকসু নির্বাচন কমিশনে কিছু শিক্ষক আছেন যারা ফ্যাসিস্টের সহযোগী এবং নির্দিষ্ট একটা সংগঠনের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বিশেষ করে প্রক্টর মহোদয়। এমন কমিশনের অধীনে চাকসু নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে সেটা নিয়ে আমরা সন্ধিহান। আমরা চাই চাকসু নির্বাচন কমিশন থেকে প্রক্টরসহ যারা ফ্যাসিস্ট এবং নির্দিষ্ট সংগঠনের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তারা পদত্যাগ করে একটা সুন্দর সুষ্ঠু চাকসু নির্বাচন উপহার দিবেন।
চবি শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা বলেন, দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে চাকসুর তফসিল ঘোষণাকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা। কিন্তু প্রশাসন তফসিল দিতে দেরি করায় নির্বাচনের তারিখ অক্টোবরে গিয়েছে। আমরা চাইবো, প্রশাসন সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রেখে ঘোষিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করবে।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের যুগ্ম–আহ্বায়ক মো. মাহফুজ বলেন, চাকসুর তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি যে নোংরা ছাত্র রাজনীতির দৌরাত্ম্য। চবি প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবে গত ৩৫ বছর চাকসুর নির্বাচন হয়নি। ৫ আগস্টের পরে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিলো দ্রুত সময়ের মধ্যে চাকসু নির্বাচন দেওয়া কিন্তু প্রশাসনের অবহেলার কারণে একবছর অতিবাহিত হয়ে গেল। অবশেষে যেহেতু তফসিল ঘোষণা হয়েছে আমি আশা করি প্রশাসন আমাদেরকে সুন্দর একটা চাকসু নির্বাচন উপহার দিবে।
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ চবি শাখার সদস্য সচিব মো. রোমান রহমান বলেন, আমরা চাকসুর তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। তবে আমরা কয়েকবার সংবাদ সম্মেলনে করে বলেছি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য চাকসুতে একটা পদ সৃষ্টি করা এবং বয়সসীমা সর্বোচ্চ ২৮ করা। কিন্তু প্রশাসনকে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। চবি ক্যাম্পাসে ৬০০ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছে। আর বয়সসীমা ২৮ বছরের উপরে গেলে সেখানে নেতৃত্ব আর অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের হাতে থাকবে না। রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের হাতে চলে যাবে। আশা করি প্রশাসন আমাদের দাবিগুলো মাথায় রেখে শিক্ষার্থীদের একটা সুন্দর নির্বাচন উপহার দিবে। এছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও চাকসুর তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে চাকসুতে। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর নানা সময়ে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন চেয়ে আন্দোলন করলেও ছাত্রসংগঠনগুলোর মুখোমুখি অবস্থান, কয়েক দফা সংঘর্ষ এবং উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে অচলাবস্থার মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রীয় সংসদ।