পটিয়ায় গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৫ পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাবন করছে। রান্না ঘরের গ্যাসের চুলা থেকে সৃষ্ট মাত্র ৩০ মিনিটের আগুনে মুহূর্তেই যেন নাই হয়ে ১৫ পরিবারের সবকিছু। নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, ফ্রিজ, টিভি, মূল্যবান আসবাবপত্র কিছুই রক্ষা পায়নি আগুনের লেলিহান শিখা থেকে।
গত সোমবার রাত ১২টার পর উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন ৩ নম্বর ওয়ার্ডস্থ শফিক চেয়ারম্যানের বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আগুনের সূত্রপাত হয় স্থানীয় আবু বক্করের রান্না ঘরের লাইনের গ্যাস লিকেজ হয়ে। এতে হাফেজ মাহমুদুল হকের শত বছরের পুরনো মাটির দ্বিতল ঘরসহ আবু বক্কর, আবদুল খালেক, আবদুল মালেক, আবুল মনসুর, আলী আজগর, আলমগীর, আবদুস ছত্তার, মো. হারুন, মোহাম্মদ মুছা, মো. শাহজাহান, মুন্নি আকতার, মো. ইলিয়াছ, মো. ইদ্রিস, আয়শা খাতুন ও মো. নয়নের টিনের ঘর সম্পূর্ণরূপে ভস্মিভূত হয়ে যায়। আগুনে ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র ছাড়াও মো. মুছার বোনের জমা রাখা নগদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, কৃষক ইলিয়াছের গরু বিক্রির ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, আজগর আলীর ৬০ হাজার টাকা, মো. খালেকের ৪০ হাজার টাকাসহ দুইটি মোটরসাইকেল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। স্থানীয় মুবিনুল ইসলাম সুমন ও সাইফুল ইসলাম জানান, রাত ১২টার পর হঠাৎ করে আগুন দেখে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। কিন্তু সীতাকুণ্ডের অগ্নিকাণ্ডের দুঃসহ স্মৃতির কারণে আতংকিত হয়ে গ্যাসের আগুন ও বিদ্যুতের ভয়ে মানুষ কাছে যায়নি। খরব পেয়ে পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের একদল কর্মী রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলেও সব পুড়ে খাঁক হয়ে যায় এর আগেই।
এ বিষয়ে পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেও অধিকাংশ টিনের তৈরি ঘর হওয়ায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। লাইনের গ্যাসের লিকেজের কারণেই অগ্নিদুর্ঘটনা হয়। আমরা যাওয়ার আগেই খুব অল্প সময়ে সব ঘর পুড়ে যায়। আগুন যাতে অন্য জায়গায় না ছড়ায় তার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।
বোনকে কী জবাব দেবেন মুছা : ডাকাত ও চুরির ভয়ে ছোট বোনের জমানো ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা আমানত হিসেবে ঘরে রেখে ছিলেন একটি মাদ্রাসার ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী মোহাম্মদ মুছা। কিন্তু বোনের সে আমানত আর রক্ষা করা হল না। গত সোমবার গভীর রাতের আগুনে পুড়ে সে আমানতের টাকা মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেছে। এখন কী জবাব দেবেন আদরের ছোট বোনকে- সে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন মুছা।
তিনি কাঁদো কাঁদো স্বরে দৈনিক আজাদীকে বলেন, উপজেলার কাশিয়াইশ ইউনিয়নের ভাণ্ডাল গাঁও এলাকায় ছোট বোন শামসুন নাহারকে বিয়ে দেয়া হয়। গত কয়েক বছর ধরে ঘরের ভিটে কেনার জন্য অল্প অল্প করে সঞ্চিত তার ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা তিনি ভাইয়ের কাছে জমা রাখেন। চোর-ডাকাতের হাত থেকে সে টাকা রক্ষা করা গেলেও আগুন এসে সব শেষ করে দিয়ে গেল। বোনের কাছে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে বলে জানান মুছা।
পুঁজি হারিয়ে নির্বাক ইলিয়াছ : কৃষক মো. ইলিয়াছ কৃষি কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় গরু কিনে মোটাতাজা করে তা বাজারে বেচেন। সেই টাকা দিয়ে কেনেন আবারো কয়েকটি গরু। এই চক্রে চলে তার সংসার। সর্বশেষ কিছুদিন আগে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় তিনি ৩টি গরু বিক্রি করেন। পরে আরো কয়েকটি ছোট গরু কেনার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু এক রাতের ভয়াবহ আগুনেই সে স্বপ্ন পুড়ে ছারখার হয়ে গেল ইলিয়াছের। শেষ সম্বল ও পুঁজি হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছেন কৃষক ইলিয়াস।
এদিকে খবর পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পটিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল মামুন ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নগদ ৩ হাজার টাকা, ১০ কেজি চাল, শুষ্ক খাবার ও দুইটি করে কম্বল বিতরণ করেন। তারা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে এ দুর্ঘটনার রিপোর্ট পাঠানো হবে। পরবর্তীতে ওখান থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তা দেয়া হবে। এসময় উপস্থিত ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান ফৌজুল কবির কুমার, ইউপি সদস্য এয়াকুব আলী, রুমা আকতার প্রমুখ।













