মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় দেশজুড়ে নজরদারি জোরদার করেছে সরকার। অবৈধ তেল মজুদ ও কারবার ঠেকাতে প্রতিটি জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সংকটকে পুঁজি করে অসাধু চক্রের অপতৎপরতা রোধে এই তদারকি দলগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সকালে পতেঙ্গার বিজয়নগর এলাকার কমিশনার ঘাটে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত হালদার। এতে অংশ নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও পুলিশের সদস্যরা।
অভিযানে ৩০টি ড্রামে অবৈধভাবে মজুদ করা আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে কাউকে আটক করা যায়নি। জব্দ করা তেল বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত হালদার আজাদীকে বলেন, অভিযান চলাকালে ৩০টি ড্রামে অবৈধভাবে মজুদকৃত আনুমানিক ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজেল লোডিং ও আনলোডিংয়ের কাজে ব্যবহৃত তিনটি পাম্পও জব্দ করা হয়। উদ্ধার ডিজেল ও সরঞ্জামের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা। বিপিসি এবং পুলিশ সদস্যদের নিয়ে যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে অভিযান পরিচালনাকালে ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকৃত তেল পুলিশ হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪–এর সংশ্লিষ্ট ধারায় নিয়মিত মামলা দায়েরের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রশাসন নিশ্চিত হয়েছে, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেল অপসারণ করে তা বিভিন্ন স্থানীয় বিক্রেতার নিকট সরবরাহ করছে। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং অবৈধ মজুদ প্রতিরোধের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে সকল তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট তেল কারবারিরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, জনৈক মোহাম্মদ আলমগীরের মালিকানাধীন রেইনবো ডিপো নামের জ্বালানি তেলের ডিপোতে তেলগুলো মজুদ করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে যথাযথ অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অপরদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বর্তমানে দেশের সব তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় গঠিত ভিজিলেন্স টিমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) ও (এলএ) এ দায়িত্বে রয়েছেন। এই উদ্যোগের ফলে জেলা পর্যায়ে অবৈধ মজুদ, পরিবহন ও সরবরাহ সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে রেশনিং চালু করা হলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা হয়। তবুও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েই চলেছে। কোথাও সরবরাহ ঘাটতি, কোথাও পাম্প বন্ধ বা সীমিত বিক্রির চিত্র দেখা যাচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে জ্বালানি বিভাগ। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন বৈঠক করা হচ্ছে। বুধবার থেকে এসব বৈঠকে জেলা প্রশাসকদেরও যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে মাঠপর্যায়ের সমস্যা দ্রুত শণাক্ত করা যায়।
একইসঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কিউআর কোড, ব্যানার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রচার, উপাসনালয়ে বার্তা প্রচার ও লিফলেট বিতরণের মতো কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামে প্রশাসন সাদা পোশাকে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
পতেঙ্গা থানার ওসি মোস্তফা আহমেদ বলেন, জব্দ করা মালামাল আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অবৈধভাবে তেল মজুদ ও সরবরাহের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউ যাতে বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেজন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।












