প্রজাতন্ত্রের পদে থেকেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন অভিযোগ এনে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এছাড়া ৩৩০ জন ‘দুষ্কৃতকারীর’ বিষয়ে সিএমপির জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করে তালিকায় থাকা ২৪–এর গণ অভ্যুত্থানে গণহত্যাকারী আসামি এবং চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবি করেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। অন্যথায় চট্টগ্রামবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
গতকাল সোমবার বিকালে নগরের ষোলশহরে বিপ্লব উদ্যানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী মোহাম্মদ এরফানুল হক। চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ ও এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের অবস্থান তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে ডা. শাহাদাতের বহাল থাকা নিয়ে জনমনে অস্থিরতা এবং ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। মেয়র পদটি প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদ। এই পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি বিএনপির প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী রয়েছে। এই বাস্তবতায় বিএনপি মনোনীত একজন ব্যক্তি যদি মেয়র পদে বহাল থাকেন, তাহলে আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু থাকে না। এটি নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অনেক আগেই তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। একই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকেও পদত্যাগ করতে হবে। তিনি আগামী ২৫ তারিখ বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে তিনি মেয়র পদে বহাল থাকলে আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল নষ্ট হবে এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
মোহাম্মদ এরফানুল হক বলেন, যেহেতু চলতি মাসের ২৭ তারিখে তার মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে এবং আগামী ২২ তারিখ থেকে ভোটে প্রার্থীদের প্রচারণাও শুরু হচ্ছে, সুতরাং এই বাস্তবতায় চট্টগ্রামের নির্বাচনী পরিবেশ অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ রাখতে হলে অবিলম্বে তাকে পদত্যাগ করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, আপনারা জানেন, বর্তমান যে সরকার, এটা কোনো রাজনৈতিক সরকার না, এটা একটা অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারে আমাদের দুজন ছাত্র উপদেষ্টা ছিলেন–মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আপনারা দেখেছেন, নির্বাচনের কারণে উনারা দুজন পদত্যাগ করেছেন। উনাদের কেউই নির্বাচন করছেন না। একজন পার্টি করছেন, আরেকজন তো পার্টিও করছেন না, নির্বাচনও করছেন না। তারপরও উনারা উনাদের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য। আমরা একইভাবে ডা. শাহাদাত ভাইকেও অনুরোধ করব, একইভাবে দাবিও করব যে উনি যেন পদত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, ডা. শাহাদাত হোসেন ভাই দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আমরা উনাকে সম্মান করি। উনি ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ে মেয়র হয়েছেন। আমরা চাই উনি জনগণের রায়ে মেয়র হোক। ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি যদি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়, তাহলে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি এর মেয়াদ শেষ হবে। আর মাত্র সপ্তাহখানেক আছে। আমরা দাবি করছি, ২৭ জানুয়ারির মধ্যে অবশ্যই শাহাদাত ভাইকে পদত্যাগ করতে হবে।
তিনি বলেন, এখানে তারেক রহমানের নির্বাচনি সমাবেশ হবে, উনি যেভাবে সমাবেশের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন, মেয়র পদে থেকে উনি আবু সুফিয়ানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন; মেয়র পদে থেকে এটা উনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী উনাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। সুতরাং উনি যদি ২৭ জানুয়ারির মধ্যে পদত্যাগ না করেন, আমরা তীব্র আন্দোলনে যাব, আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা এটা জানিয়ে রাখলাম।
সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তি : সিএমপির জারি করা ৩৩০ দুষ্কৃতকারী প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দুষ্কৃতকারীদের মধ্যে ২৪–এর গণ অভ্যুত্থানে গণহত্যাকারী অনেক আসামি এবং চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি স্পষ্টভাবে এই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করছে। কারণ, আমরা মনে করি এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কোনো দায়িত্বশীল বিবৃতি নয়, বরং এই বিবৃতির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমাদের প্রশ্ন হলো, যদি সিএমপির কাছে সন্ত্রাসীদের নাম, পরিচয় ও অবস্থান আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে তারা কেন এখনো গ্রেপ্তার হচ্ছে না? চট্টগ্রামবাসীর স্পষ্ট বক্তব্য, আইনের শাসন মানে সন্ত্রাসীদের এলাকা বদলানোর সুযোগ দেওয়া নয়। আইনের শাসন মানে সন্ত্রাসী যেখানেই থাকুক তাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা। এনসিপি চট্টগ্রামসহ সারা দেশের সকল সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী, ভোটার এবং চট্টগ্রামবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, সিএমপি কমিশনার যদি জানেন, এখানে ৩৩০ জন সন্ত্রাসী আছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, তাহলে তো পুলিশের উচিত তাদের গ্রেপ্তার করা। বিদেশে থাকলে প্রয়োজনে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা উচিত। যদি সেটা না পারে, তাহলে ছবি টানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা উচিত। এ কাজই তো পুলিশের করার কথা। কিন্তু উনি কীভাবে সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করে বলেন যে, আপনাদের শহরের মধ্যে নিষিদ্ধ করা হলো। একজন ব্যক্তি যদি অপরাধী হয় তাহলে সে জেলে থাকবে আর যদি অপরাধী না হয় তাহলে সে থাকবে। কিন্তু আপনি কিভাবে শহরের মধ্যে তাদের নিষিদ্ধ করতে পারেন? আমরা কোনোভাবেই এটা মানি না, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।
তিনি বলেন, এখানে সাইফুল ইসলাম লিমনের নাম আছে, হেলাল আকবর বাবরের নাম আছে। জুলাই আন্দোলনের সময় অস্ত্র হাতে তাদের ছবি আপনারা সাংবাদিকরাই তুলে পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো সতর্ক করে দেওয়া যে, আপনারা চট্টগ্রাম শহরে আসবেন না, আসলে আপনাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ধরনের একটি অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর এবং সন্ত্রাসীদের আরো সতর্ক করে একটা বিজ্ঞপ্তি যে দেওয়া হলো, আমরা এটার তীব্র নিন্দা জানাই। এই বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য ভিত্তিহীন।
তিনি বলেন, একজন সন্ত্রাসী চট্টগ্রামে থাকতে পারবে না। তার মানে কি তারা নোয়াখালী থাকতে পারবে, ফেনী থাকতে পারবে? এই দায়সারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো কেন? যেসব সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশের মানুষ আর দেখতে চায় না, তাদের গ্রেপ্তার না করে সতর্ক করে দেওয়া হলো কেন? আমাদের দাবি, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী জুবায়ের হোসেন, নিজাম উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন ওপেল, মহানগর সদস্য মোহাম্মদ সোহরাব চৌধুরী, আজগর আলী আশিক, মোহাম্মদ আজাদ, এমদাদুল হক ও মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, যুব শক্তি মহানগরের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ, বায়েজিদ থানার প্রধান সমন্বয়কারী মহিউদ্দিন তাইফুর ও বাকলিয়া থানার সংগঠক সাদমানুর রহমান চৌধুরী।












