এক–দুই করে শত পেরিয়ে হাজার। তাও এক বা দুই হাজার নয়; একেবারে ২৫ হাজার বইয়ের বিনিময়। গতকাল শুক্রবারের সকাল। নগরীর জামালখান মোড়ে ভিড় করেন তরুণ–তরুণীরা। সবার হাতে বই। ‘৭ম বই বিনিময় উৎসবে’ তাদের আগমন। চট্টগ্রামের বইপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এই আয়োজনে তারা বইগুলো দিয়ে বিনিময় করে নিয়ে যান পছন্দের অন্য বই। সারা দিনে অনেক পাঠক আসেন এবং বই বিনিময় করেন। উৎসবে প্রায় ২৫ হাজার বই বিনিময় হয়েছে।
স্টোরিটেলিং প্ল্যাটফর্ম ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজের উদ্যোগে এমন উৎসব আয়োজিত হচ্ছে প্রতিবার। বই বিনিময় উৎসবে একজন পাঠক তার পঠিত বইটি রেখে অন্য বই বিনিময় করে নিয়ে যেতে পারেন বিনামূল্যে। গত কয়েক বছর ধরে তাদের এই আয়োজন সাড়া ফেলে আসছে। রাস্তার দুই পাশে ফুটপাতে সারি সারি সাজানো বইয়ের স্টলে উপচে পড়া ভিড়। ‘বই নয়, জ্ঞানের বিনিময়’ স্লোগানে বই বিনিময় উৎসবের এই ভিড়ে দেখা যায় স্কুল–কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে প্রবীণ পাঠকদের।
এবার বই বিনিময় উৎসবে ছিল ‘প্রায়োরিটি বাংলাদেশ’ নামে চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে স্থান পায় বাংলাদেশের সাহিত্য, সিনেমা, লোকগান, ইতিহাস, চট্টগ্রাম, জাতিবৈচিত্র্য ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন স্থিরচিত্র। প্রদর্শনী দেখতে ভিড় জমান নানা বয়সী মানুষ। প্রদর্শনীতে উঠে আসে কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস, ভাওয়াইয়া–ভাটিয়ালী থেকে শুরু করে সুফি–মরমী গানের নানা বর্ণনা, বাংলা সিনেমার ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও বিভিন্ন সাহিত্যিকের বিবরণ, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন নিয়ে এই প্রদর্শনীটি সাজানো হয়। একইসাথে ছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্মিত বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী।
বই বিনিময় উৎসবের সমন্বয়ক ও ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজের পরিচালক সাইদ খান সাগর বলেন, পাঠক তৈরির উদ্দেশ্যে ছয় বছর আগে বই বিনিময় উৎসব শুরু করেছিলাম। বইমেলার মতো বই বিনিময় উৎসবের জন্যও পাঠক এখন অপেক্ষা করে থাকেন। বিশেষ করে যারা বই কিনতে চান, কিন্তু অর্থাভাবে পারেন না, তাদের জন্য বই বিনিময় উৎসব বই পড়া অব্যাহত রাখতে সাহায্য করছে।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয় ৭ম বই বিনিময় উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস বলেন, প্রতিবার এই বই বিনিময় উৎসব তার নিজের কলেবরকে বড় করছে। এত সীমাবদ্ধতার ভেতরেও সাহিত্যের প্রতি তাদের এই মুগ্ধতা আমাদের উচ্ছ্বসিত করে। চট্টগ্রামে অসংখ্য ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থান আছে। এই বই বিনিময় উৎসব চট্টগ্রামের তেমনই এক নতুন ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, কিছু তরুণ এই সময়ে কেবল নিজেদের ভালো লাগা থেকে এমন একটি উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন–এই ব্যাপারটি আমাকে আপ্লুত করে। স্মার্টফোনের এই যুগে বইয়ের আবেদন যে কমেনি তা এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত।
বিশেষ অতিথি সাংবাদিক সামসুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, একটা উৎসব সাতবারের মতো আয়োজন করে আসাটা কষ্টসাধ্য। এই আয়োজনটি পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আল জোবায়েদ, বই বিনিময় উৎসবের আয়োজক সদস্য আকিবুল ইসলাম জিশাদ, কাজী সদরুল্লাহ রাকিব, অহনা বড়ুয়া, সানজিদা রহমান ও তূর্ণ পাল প্রমুখ।
এবার বই বিনিময় উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও সিটি ব্যাংক। উৎসবে শহরের বাইরে দোহাজারী, পটিয়া ও বোয়ালখালীর পাঠকেরাও এসেছেন বই বিনিময় করতে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে পাঠকের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের আগমনে জামালখান পরিণত হয় পাঠকদের মিলনমেলায়।
বিকালে প্রদর্শনীতে আসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক জি এইচ হাবীব। তিনি বলেন, বই বিনিময় উৎসব সময়ের সাথে সমাজের একটি শক্তিশালী বার্তাবাহক হয়ে উঠতে পেরেছে। আয়োজকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই বই বিনিময়ের পাশাপাশি প্রদর্শনীর আয়োজন বই বিনিময় উৎসবের প্রাসঙ্গিকতাকে আরো বেগবান করবে।
এবার উৎসবে কথাসাহিত্য, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, হুমায়ুন–ছফা, কবিতা, ইতিহাস, রাজনীতি ও আত্মজীবনী, ক্যারিয়ার ও বিজ্ঞান, একাডেমিকসহ ১১টি স্টলে বই বিনিময় করা হয়। সর্বাধিক বই বিনিময় হয় কথাসাহিত্যের স্টল, একাডেমিক বইয়ের স্টল এবং হুমায়ুন আহমেদের স্টলে। উৎসব শেষ হয় রাত আটটায়।












