প্রথমে স্থগিত করলেও পরে বৈধ ঘোষণা করা হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আওয়ামী সম্পৃক্ততা’র অভিযোগ থাকায় শুরু থেকে আলোচিত চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া আংশিক) আসনের বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদের মনোনয়নপত্র। ফলে দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে আসনটিতে কোনো প্রার্থী নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন। সর্বশেষ ২০০১ সালে কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। পরে অংশ নেয়া নির্বাচনগুলোতে বিএনপির সমর্থন পেলেও তিনি নিজ দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ছাতা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। এবার অলির ছেলে ওমর ফরুক এলডিপির মনোনয়ন পেয়েছেন। গতকাল তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
এদিকে এ আসনে আরো তিন বিএনপি প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এরা হচ্ছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মিজানুল হক চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম রাহী ও চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নুরুল আনোয়ার। এর মধ্যে রাহী ছাড়া বাকি দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিষয়টিকে অনেকে ‘বিএনপির প্রার্থী জসীমের প্রতিপক্ষ হিসেবে এখনো বিএনপি’ বলে মন্তব্য করছেন। এদিকে বিএনপির প্রার্থী জসীমের বিরুদ্ধে হলফনামায় তথ্য গোপনসহ নির্বাচন বিধিমালা ‘বরখেলাপ’ করার অভিযোগ করেছেন এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুক। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রাহীর অভিযোগ, জসীমের সঙ্গে আওয়ামী কানেকশন রয়েছে। তবে জসীম নিজেকে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী দাবি করে বলেছেন, ‘আওযামী লীগের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই’।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম–১৪ আসনে ৭ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। ওমর ফারুক ও রাহী ছাড়া বাকি ৫ প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপির জসীম উদ্দীন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ বাদশা মিয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল হামিদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের এইচএম ইলিয়াছ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মৌ. মো. সোলাইমান।
জসীমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : অভিযোগ আছে, জসীম বিএনপির কোনো পদে নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে জসিম উদ্দিনের সঙ্গে থাকা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। তার বিরুদ্ধে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও শহিদুল হকের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাকে অনেকে ‘বেনজীরের ক্যাশিয়ার’ বলে দাবি করেন। বলা হয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের সমর্থন নিয়ে ২০২৪ সালে চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যন নির্বাচিত হন জসীম উদ্দীন আহমেদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র–জনতার আন্দোলনে রাজধানীর বাড্ডার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে কারাগারেও যান তিনি।
জসীমের বিরুদ্ধে এলডিপি প্রার্থীর যে অভিযোগ : এডিপি প্রার্থী ওমর ফারুক গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে ধানের শীষের প্রতীকে যারা নির্বাচন করতেন এবং আজকের যুগে এসে ধানের শীষ প্রতীকে যারা নির্বাচন করছেন, এখানে আমি বিস্তর ফারাক দেখছি। এই জিনিসটা দুঃখজনক। আমি নিশ্চিত যে আমার আব্বার (কর্নেল অলি আহমদ) কাছেও এটা খারাপ লাগবে। একটা প্রার্থীর যোগ্যতা আজকের দিকে পিওরলি অর্থবিত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি উনাকে (জসীম উদ্দীন আহমেদ) ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা চিনি। উনি বিত্তশালী মানুষ। উনি আচার–আচরণে অমায়িক মানুষ। অবশ্য দুয়েকটা সোশ্যাল মিডিয়াতে অন্য ধরনের আচরণ দেখা গেছে। উনার হলফনামার সাথে বিত্ত বৈভবের মিল দেখছি না। একবার আমাদের জাতীয় ক্রিকেটার নাসির সাহেব ও তার স্ত্রী উনার (জসীম) দুবাইয়ের হোটেল রয়েল কনকর্ডে ভিজিট করেছেন। ওখানে দাঁড়িয়ে তাকে (জসীম) মালিক হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছেন। কিন্তু হোটেল রয়েল কনকর্ডের ব্যাপারে হলফামায় কোনো উল্লেখ নেই।
ওমর ফারুক বলেন, উনি (জসীম) আমাদের দলের নেতাকর্মীদের টাকা–পয়সার লোভ দেখাচ্ছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি এটা নির্বাচন বিধিমালার সরাসরি বরখেলাপ। জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে অনেক ব্যবসায়ী অর্থায়ন করেছেন। উনার (জসীম) বিরুদ্ধে অর্থায়নের অভিযোগ আছে এবং একটি হত্যা মামলায় উনাকে আসামি করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম রাহী আজাদীকে বলেন, আমিসহ বিএনপির ছয়জন দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। এদের যে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দল অবশ্যই উপকৃত হতো। কারণ ৬ জনই বিএনপির কর্মী। এখন যাকে দেয়া হয়েছে তিনি বিএনপির কেউ না।
অভিযোগ নিয়ে যা বললেন জসীম : জসীম উদ্দীন আহমেদ আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম–১৪ আসনে দীর্ঘ বছর শীষের প্রতীককে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমার মাধ্যমে ধানের শীষের প্রতীকটা ফেরত পেয়ে মানুষ উচ্ছ্বসিত। সারা দেশে ধানের শীষ জনপ্রিয়, কারণ এটা উন্নয়নের প্রতীক।
তিনি বলেন, আমি বিএনপিপন্থী একজন ব্যবসায়ী এবং ২০০৪ সালে মদিনা শরীফ বিএনপির সহসভাপতি ছিলাম। কমিটির কাগজপত্র আমার কাছে আছে। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে খবর নিতে পারেন। গত উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চন্দনাইশবাসী আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছেন। গরিব, দুঃখী ও মেহনতি মানুষের জন্য কাজ করার জন্য এসেছি। আমাকে প্রার্থী করায় মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। তাদের মধ্যে ঈদের আমেজ বিরাজ করছে। কারণ তারা যোগ্য, ভালো, সৎ ও বিএনপিপন্থী একজন প্রার্থী পেয়েছে। চন্দনাইশবাসী আমার জন্য পাগল। তাই তারা স্থগিতের কথা শুনে ২৫–৩০ কিলোমিটার দূর থেকে যে যেভাবে পেরেছে ছুটে এসেছে।
এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনি কী বলেছেন আমি শুনিনি। আপনার কাছ থেকে শুনলাম।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে থাকা ছবি নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেন, আমি ব্যবসায়ী মানুষ। কঙবাজারে আমার একটা ফাইভ স্টার হোটেল আছে। আমি ওটার এমডি। এখন ওখানে গিয়ে কেউ যদি ছবি তোলে, আমি কী করতে পারি। সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলেও সবাই সবার সঙ্গে ছবি তোলে। এখন এ রকম দুই–চারটা ছবি নিয়ে যদি প্রেপাগান্ডা চালায়, সমালোচনা করে, আমার কী করার আছে? মানুষ এই সমালোচনার জবাব ১২ই ফেব্রুয়ারি ইনশাআল্লাহ দেবে। অপোজিশন পার্টি যারা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে তারা ভোটের রেজাল্ট কী হবে সেটা আন্দাজ করতে পেরে ভয় পেয়েছে। কর্নেল অলি সাহেব জামায়াতের প্রোগ্রামে গেছেন। তাই বলে কি তিনি জামায়াত হয়ে গেছেন?
তিনি বলেন, কেউ আমাকে সাবেক পুলিশ প্রধানের ক্যাশিয়ার বলছে, কেউ আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ী ও আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলছে। তাদেরকে এটা প্রমাণ করার জন্য বলেছি। প্রমাণ করতে না পারলে তাদেরকে জারজ সন্তান ডেকেছি। আমি ক্লিয়ার করে দিচ্ছি, আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে কোনোদিন জড়িত ছিলাম না। আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলাম না এবং আওয়ামী লীগের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। যারা বলছে তাদের প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় আগামীতে তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব।
এদিকে জসীমকে দলের মনোনয়ন দেয়ার প্রতিবাদে অনশন করার ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি এম এ হাশেম রাজু। যিনি নিজেও চট্টগ্রাম–১৪ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। বর্তমানে তিনি জসীমের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। রাজু আজাদীকে বলেন, অনশন করার ঘোষণা দেয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা আমাকে দল ঘোষিত প্রার্থীর জন্য কাজ করার নির্দেশনা দেন। দলের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।











