২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা, চুক্তি ছাড়াই শেষ

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি বৈঠক ব্যর্থ । হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর নিয়ে মতবিভেদ, একে অপরকে দোষারোপ

আজাদী ডেস্ক | সোমবার , ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

প্রায় ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ বৈঠক। গত ৫০ বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। কিন্তু গতকাল রোববার সকালে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘোষণা দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আলোচনা ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি খারাপ খবর। যুক্তরাষ্ট্র খুবই সরল এবং চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় ইরান সেটি গ্রহণ করে কিনা।

ভ্যান্স আরো জানান, ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে আগেই কিছুটা উদাসীন মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। মায়ামিতে একটি কুস্তি প্রতিযোগিতায় (ইউএফসি) যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হলো কিনা, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে আলোচনায় ব্যস্ত থাকার সময়টিতে ট্রাম্প কুস্তি দেখে কাটিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। খবর বিডিনিউজের।

আলোচনায় মতবিভেদ দেখা দিয়েছিল মূলত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর নিয়ে। এ দুটো বিষয়ে মতানৈক্যই একটি চুক্তিতে পৌঁছার চেষ্টার পথে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

একে অপরকে দোষারোপ : আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইরান শর্ত মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে এবং এমন কোনো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন না করে, যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে, সেটি এখনো না, দুই বছর পরও না।

অন্যদিকে, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলেও দাবি তাদের। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানায়, তেহরান মনে করে এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই ঠিক করতে হবে তারা ইরানের আস্থা অর্জন করতে চায় কিনা।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা যৌক্তিক প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে বাকের কালিবাফ লিখেছেন, আমাদের সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু আগের দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের প্রতিপক্ষের উপর বিশ্বাস নেই। আর অপর পক্ষও (যুক্তরাষ্ট্র) এই দফা আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

ওদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কয়েক সপ্তাহের সংঘাত ও গভীর অবিশ্বাসের পর মাত্র এক দফা আলোচনায় সব মিটমাট হয়ে যাবে, এমনটি ভাবা অবাস্তব। তিনি জানান, কিছু বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হলেও দুই/তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো ঘোর মতবিরোধ আছে।

কূটনীতি কখনো শেষ হয় না : বাঘাই বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা, আস্থা ও বিশ্বাস এবং ইরানের অধিকার ও স্বার্থকে স্বীকার করে নেওয়ার উপর। শান্তি আলোচনা বা একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কূটনীতি কখনো শেষ হয় না। পাকিস্তান ও অন্যান্য বন্ধুভাবাপান্ন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা চলবে বলে জানান তিনি।

পাকিস্তানে আলোচনার আগে থেকেই ইরান কেবল বিদেশের ব্যাংকে জব্দকৃত অর্থ ফেরত পাওয়াই নয়, বরং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ গোটা অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আসছিল। বিশেষ করে ইসরায়েলের লেবাননে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর উপর হামলা বন্ধ করার বিষয়ে ইরান অনড় ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, লেবানন সংঘাত আলোচনার অংশ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে তাদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক পাকিস্তান আয়োজন করলেও দুই পক্ষকে চুক্তিতে পৌঁছতে তারা বাধ্য করতে পারেনি।

আরো আলোচনার আহ্বান : আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার উভয় পক্ষকে গত মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার এবং ইতিবাচক স্পৃহা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুই পক্ষের জন্য কাজ চালিয়ে যওয়া জরুরি উল্লেখ করে ইসহাক দার বলেন, পাকিস্তান এই সংলাপ চালিয়ে যেতে দুই পক্ষকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং দুই পক্ষকেই যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এরপর কী : কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো ছায়া ঘনিয়ে আসছে। সবার নজর এখন সামনের দিনগুলোতে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কি আবার আলোচনায় বসবে, নাকি আবারও রণক্ষেত্রে ফিরে যাবে? যুদ্ধবিরতি টিকবে কিনা তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা সেই বিরোধও রয়ে যাচ্ছে।

ওদিকে, হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তাও আঞ্চলিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। সামনের দিনগুলোতে আলোচনা আবার শুরু হবে কিনা সেটি একটি প্রশ্ন হয়ে আছে। কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার আভাস মিললেও আপাতত পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য কোনো তারিখ বা স্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে আস্থা নেই তা এরই মধ্যে হওয়া আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে। মূল বিরোধের বিষয়গুলোতেও কোনো মীমাংসা হয়নি। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যেহেতু বলেছেন, এক দফা আলোচনাতেই সব মিটামাট হবে এমন ভাবাটা বাস্তবসম্মত নয়, তা সেই আলোচনা যতই গুরুতর, দীর্ঘ এবং উচ্চ পর্যায়ের হোক না কেন। ইরানের পক্ষ থেকে এমন কথা এই ইঙ্গিতই দেয় যে, কূটনীতির পথ এখনো খোলা।

তবে এই মুহূর্তে যা কারোই জানা নেই, তা হলো যুদ্ধবিরতির আর যেটুকু সময় বাকি আছে তার মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো ধরনের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে কিনা। তাছাড়া দুই পক্ষের স্বার্থের পাশাপাশি বাদবাকি বিশ্বের স্বার্থে দুই পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছার জন্য কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকবে সেটিও জানা নেই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহরমুজ প্রণালি পার হতে হলে টোল দিতে হবে, ঘোষণা ইরানের
পরবর্তী নিবন্ধআজ চৈত্রসংক্রান্তি