নগরীতে গত ১৭ বছরে দুই হাজার একরের বেশি ভূমিতে পরিকল্পিত আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প এলাকা গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তা করতে পারেনি। দুই হাজার একর ভূমিতে অন্তত ১২ হাজার প্লট করার সুযোগ ছিল। অথচ সিডিএ একটি প্লটও তৈরি করতে বা বরাদ্দ দিতে পারেনি। দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও সিডিএ পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মৌজা দর এবং হুকুমদখলের প্রচলিত নিয়ম চট্টগ্রামে পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। এতে শুধু পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলা বন্ধ হয়ে যায়নি, একইসাথে সিডিএর আয়ের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি করেছে।
সিডিএর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সিডিএর আইনে নগরীতে প্রতি বছর ৫০ হেক্টর জায়গা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা শিল্প এলাকা গড়ে তোলার এই বাধ্যবাধকতা চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টার প্ল্যানেও রয়েছে। ভূমির অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান রাখাসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তুলতে উক্ত আইন করা হয়। কোনো শহরে পরিকল্পিত এলাকা গড়ে না উঠলে সেখানে বস্তির সম্প্রসারণ ঘটে, সরু রাস্তায় গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। ফায়ার সার্ভিস এবং অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি সেবাও বিঘ্নিত হয়। মানুষের জীবন, ধনসম্পদ এবং সর্বোপরি নগরজীবন হুমকির মুখে পড়ে। পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলা হলে নগর এবং নাগরিকদের জীবনমানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অপরদিকে আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তোলার মাধ্যমে সিডিএ শুধু নগরবাসীর আবাসনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে না, একইসাথে নিজেদের আয় বৃদ্ধি করে। তহবিল সমৃদ্ধ করে। এসব অর্থ নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। নগরীর অনুন্নত এলাকার জমি সস্তায় নিয়ে তা উন্নয়ন করে প্লট হিসেবে বরাদ্দ দিয়ে অতীতে সিডিএ বড় অংকের তহবিল গড়তে সক্ষম হয়েছিল। জানা যায়, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গত প্রায় ৬৬ বছরে নগরীতে ১২টি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। এসব আবাসিক এলাকায় সিডিএ ৬,৩৬৪টি প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে গড়ে তোলা হয় অনন্যা আবাসিক এলাকা। এরপর গত ১৭ বছরে সিডিএ আর কোনো আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে পারেনি। অনন্যা দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেও সফল হয়নি সিডিএ। প্রথমে যে জায়গা পছন্দ করা হয়েছিল তার মৌজা ভ্যালু চড়া হওয়ায় পিছু হটতে হয়। পরবর্তীতে হাটহাজারীতে ভূমি নিয়ে একটি আবাসিক এলাকা বা উপশহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সম্ভব হয়নি। এসব ক্ষেত্রে ভূমির মৌজা ভ্যালু এবং হুকুমদখল করতে হলে তিন গুণ দাম দেয়ার নিয়ম সিডিএকে পিছু হটাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, মৌজা ভ্যালু নিয়ে কিছুটা হটকারিতা রয়েছে। কিছু এলাকায় এমন দর নির্ধারণ করা হয়েছে যার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। ২ লাখ টাকা কাঠা বিক্রি হয় না এমন অনেক জায়গার মৌজা ভ্যালু কাঠায় ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা করে রাখা হয়েছে। ফলে এসব ভূমি হুকুমদখল করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা কঠিন। তারা বলেন, হাটহাজারীর একেবারে অনুন্নত এলাকায় যেখানে রাস্তাঘাটও নেই, চলাচলের কোনো পথ নেই, পানি আছে, এমন একটি জায়গায় প্রতি কাঠা ভূমি যদি বিশ লাখ টাকার বেশি দামে হুকুমদখল করতে হয়, তাহলে প্লট করে বিক্রি করা অসম্ভব। তিনি বলেন, কাঠাপ্রতি বিশ লাখ টাকায় হুকুমদখল করার পর ভূমি উন্নয়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করে প্লট তৈরি করার ক্ষেত্রে কাঠাপ্রতি আরো আট–দশ লাখ টাকা খরচ যুুক্ত হয়। রাস্তাঘাট, খেলার মাঠসহ আবাসিক এলাকার নাগরিক সুবিধাগুলো তৈরি করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। এক্ষেত্রে কাঠাপ্রতি ত্রিশ–পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা খরচ করে প্রতি কাঠা ৪০ লাখ টাকা দামে ওই প্লট সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা কঠিন। চড়া দামে শহর থেকে এত দূরে গিয়ে মানুষ কেন প্লট কিনবে? সেই শঙ্কায় ২০১৬ সালে ‘অনন্যা আবাসিক (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প’ হিমাঘারে চলে গেছে। একনেকে পাশ হওয়া ২ হাজার ৮৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি পাঁচলাইশ, কুয়াইশ ও বাথুয়া মৌজার ৪১৮ দশমিক ৭৩ একর জমির ওপর করার কথা ছিল। পরবর্তীতে মৌজা রেটের কারণে পাঁচলাইশ ও কুয়াইশ মৌজার ভূমি বাদ দিয়ে হাটহাজারীর বাথুয়া ও শিকারপুর মৌজার ২৭৬ একর জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাটহাজারীর বাথুয়া এবং শিকারপুরেও পঁয়ত্রিশ–চল্লিশ লাখ টাকার কমে প্লট বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে না বিধায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
কর্মকর্তারা জানান, ভূমির মৌজা রেট প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রায় তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। আবার হুকুমদখল করতে ওই মৌজা রেটের তিন গুণ টাকা প্রদানের নিয়ম থাকায় সিডিএ আবাসিক এলাকা করতে পারছে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রচলিত নিয়মে চট্টগ্রামে আবাসিক এলাকা করার মতো পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ভূমি উন্নয়ন করে আবাসিক এলাকা করার মতো অবস্থা নেই। প্রচুর অর্থ খরচ করতে হবে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মাঝে প্লট দেয়া সম্ভব হবে না। একটি তিন কাঠার প্লটের দাম কোটি টাকা পড়ে যাবে। আমরা ক্রেতা পাব না। তাই বিকল্প ভাবতে হবে।
বিকল্প নানা প্রস্তাব আসছে উল্লেখ করে অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ এসেছে। এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে সিডিএর আয় বাড়ানো জরুরি।
সিডিএর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি লুপ রোড আবাসিক এলাকা এবং অনন্যা দ্বিতীয় পর্যায়ের আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টাকা। প্রথমত, চড়া দাম, দ্বিতীয়ত, সিডিএর ফান্ডে তেমন টাকা নেই। একটি জায়গা হুকুমদখল করে আবাসি এলাকা গড়ে তুলতে শুরুতে পুরো বিনিয়োগ আমাদেরকে করতে হবে। পরে প্লট বরাদ্দ দিয়ে হয়তো টাকা তোলা যাবে। কিন্তু শুরুতে এতগুলো টাকা দেয়ার মতো অবস্থা সিডিএর নেই। তবুও আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় কিছু করার চেষ্টা করছি।











