‘দালাল আমার ফুত নাইমরে সাগরো ফালাইয়া মারিলিছে। তোমরা তারে আইন্যা দেও। তোমরা দালালের বিচার করো’। এভাবে ডুকরে ডুকরে কান্না করছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের আঁখি বেগম। আঁখি বেগমের ছেলে নাইম মিয়া অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে কয়েকজনের সঙ্গে নাইমও ভূমধ্যসাগরে মারা যান। শনিবার তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার। তার পর থেকেই দিন–রাত ছেলের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন আঁখি বেগম। তার গগনবিদারি চিৎকারে সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশী ও স্বজনরাও কাঁদছিলেন। তারা নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন। খবর বিডিনিউজের।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ জনের মৃত্যুর খবর তারা জানতে পেরেছেন। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মোট ছয়জন মারা গেছেন। এছাড়া দিরাই উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজনের মৃত্যুর সংবাদ এসেছে। খবর বিডিনিউজের। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার বলেন, বেসরকারি নানা মাধ্যম থেকে খবর পেয়ে আমরা ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করছি। দালাল হিসেবে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসন যাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছে তারা হলেন জগন্নাথপুরের চিলাউড়া শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), একই গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জনি (২৫), পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২), দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের সাইদ সরদারের ছেলে নূরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে যুবদল নেতা মজিবুর রহমান (৩৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমান (২৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩০)। এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমও মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামে যুবকদের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। মা–বাবা, ভাই–বোনেরা বিলাপ করছেন। নাইম মিয়ার মা আঁখি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, আমার ফুতরে মারিলাইছে দলালে। আমি দলালের বিচার চাই। আমার মতো আরো অনেক মার বুক খালি করছে দলাল। দলালের কঠিন বিচার চাই আমি।
নাইম মিয়ার পিতা দোলন মিয়া বলেন, গ্রামের আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকায় আমার ছেলেকে লিবিয়া হয়ে গ্রিস নেওয়ার চুক্তিতে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর লিবিয়ায় জিম্মি করে আরো পাঁচ লাখ টাকা নেয়। ২১ মার্চ তাকেসহ ট্রলারে অনেকজনকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। এখন শনিবার খবর পেয়েছি, আমার ছেলে মারা গেছে। দালাল আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
যেসব যুবক মারা গেছে বলে খবর এসেছে, তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এক থেকে পাঁচ মাস আগে অবৈধভাবে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা এ পথে যাত্রা করেন। সমুদ্রে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা মারা গেছেন। পরে তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ বলছে, গ্রিসের উপকূলের একটি দ্বীপের কাছে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ছাড়া মানব পাচারকারী চক্রের নৌকা আটকের পর শনিবার এই হতাহতের বিষয়টি সামনে আসে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, সুনামগঞ্জের যেসব যুবক লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে মারা গেছেন তাদের বিষয়ে তথ্যের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। পাশাপাশি দালালদের তালিকা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যেভাবে বেঁচে গেলেন কিশোরগঞ্জের কাদির : বাংলানিউজ জানায়, দুবাই থেকে অবৈধভাবে গ্রিসের পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশি ১৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তবে এই বিপর্যয়ে কিশোরগঞ্জের এক যুবক বেঁচে গেছেন। তার বেঁচে যাওয়া গল্প শুধু আশ্চর্য নয়, এটি আমাদের জানায় কতটা কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রবাসের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা। বেঁচে যাওয়া যুবক হলেন অষ্টগ্রাম উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের পশ্চিম সাভিয়ানগর গ্রামের আব্দুল কাদির। তিনি এক সন্তানের জনক।
কাদিরের মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলে প্রায় ১২–১৫ লাখ টাকা খরচ করে আব্দুল্লাহপুরের দালালের মাধ্যমে দুবাই থেকে গ্রিসে যাচ্ছিল। বড় নৌকায় যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দালাল চক্র তাকে ছোট নৌকায় পাঠায়। যে কারণে সেটি ডুবে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
ঝড়, ভয় এবং ভয়ংকর অবস্থা–এসবের মাঝেও আব্দুল কাদির বেঁচে ফিরেছেন। তার জীবনের এই কষ্ট স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।












