জমি পাওয়ার বিষয়টি ঝুলে থাকলেও বহুল প্রত্যাশার বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগোল সরকার। দেশের আগামী ১শ’ বছরের বন্দর হিসেবে গড়ে উঠতে যাওয়া বে-টার্মিনাল নির্মাণ কার্যক্রমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা এই মেগা প্রকল্পে গতিশীলতা তৈরি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কোরিয়ার দুইটি কোম্পানিকে বে- টার্মিনালের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ১২৬ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮৬ টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান দুইটি বে-টার্মিনাল নির্মাণে ডিজাইন, ড্রয়িং এবং টেন্ডার ডুকুমেন্টস তৈরি থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রমের পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের আগামী ১শ’ বছরের বন্দরের চাহিদা মোকাবেলার লক্ষ্যে হালিশহর সমুদ্র উপকূলে গড়ে তোলা হচ্ছে বে-টার্মিনাল। এটি সরকারের একটি মেগা প্রকল্প। উপকূলের জেগে উঠা একটি চরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রাকৃতিক একটি চ্যানেলে বন্দরটি গড়ে তোলা হবে। অবশ্য এজন্য বঙ্গোপসাগরে ব্রেকওয়াটার নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক চ্যানেলটিকে খনন করে গভীরতা বাড়াতে হবে। শুরুতে ৯৩৯ একর ভূমিতে টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হলেও ক্রমে তা আড়াই হাজার একরে উন্নীত হবে। কিন্তু ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ভূমির মাত্র ৬৮ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি কিনে নিয়েছে। এর বাইরে সরকারের ৮৭১ একর খাস জায়গা বে-টার্মিনালের জন্য বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি ঝুলে থাকায় পুরো প্রকল্পটি গতিহীন হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে উক্ত খাস জায়গা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে ভূমি মন্ত্রণালয় জায়গাটি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নিকট হস্তান্তর করবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ভূমি বন্দর কর্তৃপক্ষের নামে নামজারী করবে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের পুরোটাই ঝুলে থাকায় প্রকল্পটি কবে নাগাদ শুরু হবে এবং ঠিক কবে গিয়ে শেষ হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, করোনাকালে বে-টার্মিনালের কার্যক্রম নানাভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে লকডাউন পরিস্থিতির পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকর্তা কর্মচারীর করোনা আক্রান্ত হওয়াও বড় সংকট হয়ে উঠেছিল। করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পর বে-টার্মিনালের কার্যক্রম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন করে মাঠে নামে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কোরিয়ার কুনওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালটিং কোম্পানি লিমিটেড এবং ডিয়েনইয়াং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে কাজটি পেয়েছে। এতে মোট ব্যয় হবে ১২৬ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮৬ টাকা। ইতোমধ্যে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি এই দরপ্রস্তাব অনুমোদন করেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর পুরো প্রকল্পের কাজে নতুন করে গতিশীলতা তৈরি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। জায়গার ব্যাপারটি সুরাহা না হলে শুধু পরামর্শক নিয়োগে প্রকল্প গতি পাবে না বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, দফায় দফায় চিঠি দেয়া হলেও জেলা প্রশাসন এখনো সরকারের খাস জায়গাটি বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। জায়গাটি হাতে পাওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের বাকি কাজগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর জমি বন্দর কর্তৃপক্ষ কিনে নিয়েছে। এই জমিতে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ আনুষাঙ্গিক কিছু কার্যক্রম চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চলে সাড়ে চারশ’ একর ভূমিতে। এতে করে বে-টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি বড় এলাকায় পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ সাড়ে নয় মিটারে ড্রাফটের জাহাজ বার্থিং নিতে পারে। বে-টার্মিনালে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে। বে-টার্মিনালে মোট তিনটি টার্মিনাল থাকবে। প্রতিটি টার্মিনালে ৩০০ মিটার লম্বা ছয়টি জেটি থাকবে। অর্থাৎ একটি টার্মিনালে ১৮শ’ মিটার লম্বা জেটি এবং পশ্চাদ সুবিধা গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি টার্মিনালে একই সাথে ছয়টি জাহাজ বার্থিং দেয়া যাবে। ২০২৪ সালে বে-টার্মিনালে জাহাজ ভিড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হলেও ভূমি প্রাপ্তিতে বিলম্বের কারণে এই লক্ষ্য অর্জন কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করা হয়েছে।












