হোমিওপ্যাথি ও হ্যানিম্যান

ডা. দেবব্রত ভট্টাচার্য | শুক্রবার , ১০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ

১৭৫৫ সালের ১০ই এপ্রিল মাঝরাতের পর জার্মানির স্যাক্সনী রাজ্যের এলব নদী তীরবর্তী ক্ষুদ্রনগরী মিসেনের কর্ণার হাউসনামক এক অখ্যাত, অজ্ঞাত দরিদ্র পরিবারে ডা. হ্যানিম্যান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ক্রিশ্চিয়ান গডফ্রায়েড হ্যানিম্যান ও মাতার নাম জোহানা ক্রিশ্চিয়ান। হ্যানিম্যান চিকিৎসা জগতে এক বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। তিনি জার্মানীর খ্যাতনামা উচ্চডিগ্রীধারী চিকিৎসক হয়েও যখন দেখন প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগী আদর্শ আরোগ্য সাধিত হয় না, রোগটি চাপা পড়ে নাহলে ঔষধের বিষক্রীয়াই নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। তখন তিনি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিবাদ দিয়ে রোগ আরোগ্যের জন্য গবেষণায় ব্রতী হন। হোমিওপ্যাথি হলো আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার এক আদর্শ চিকিৎসাকলাবিদ্যা। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের চিরন্তন বিধান সমূহের উপর ইহার প্রতিটি নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত। এই চিকিৎসা বিদ্যার নিজস্ব দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা আছে। সমবিধানবা সমঃ সমং সময়তিএই শ্বাশত সত্যের স্বপ্নদ্রষ্টা মহামানব ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের বহু আগে হিপোক্রেটিস, প্যারাসেলসাস, গ্যালেন প্রভৃতি মনীষীগণ সদৃশ বিধানের কথা স্বীকার করে গেছেন। সদৃশ তত্ত্বের সন্ধান দেন আলব্রেচ ভন হ্যালার, তাই ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান কখনো নিজেকে সদৃশ বিধানের আবিষ্কারক বলে দাবী করেননি। কিন্তু কেউ সদৃশ বিধান নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেননি। একমাত্র এই তত্ত্বের উপর পরিপূর্ণ গবেষণা করে হোমিওপ্যাথিকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী চিকিৎসা বিজ্ঞানী, সার্জন, বহুভাষাবিদ, রসায়নবিদ, উদ্ভিদবিদ্যায় পারদর্শী, মনস্তাত্ত্বিক, অনুবাদক ও গবেষক ডা. ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেড্রিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান।

১৭৯০সালে তিনি লিপজিকের ৪/৫ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্ব স্টষ্টারিজ নামের শহরতলীতে চলে আসেন। এই সালে এডিনবার্গের বিখ্যাত অধ্যাপক, শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ, প্রতিভাবান চিকিৎসা বিজ্ঞান ডাঃ উইলিয়াম কালেনের “A treatise of the Materia Medica” এর জার্মান ভাষায় অনুবাদকালে ” Cortex Perubians or Perubian Bark” অধ্যায়ে “Tonic effects on stomack” মন্তব্যের উপর গবেষণা চালাতে গিয়েই হোমিওপ্যাথির মূলসূত্র আবিস্কার করেন। ’ ১৮১১ সালে হ্যানিম্যানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মেটেরিয়া মেডিকা পিউয়া’ ১ম খন্ড প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি সুস্থ মানবশরীরে পরীক্ষিত প্রত্যেকটি ঔষধের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন, বইটা ছয় খন্ডে সমাপ্ত হয়। ২য় খন্ড (১৮১৬), ৩য় খন্ড (১৮১৭), ৪র্থ খন্ড (১৮১৮), ৫ম খন্ড (১৮১৯) ও ৬ষ্ঠ খন্ড (১৮২১) প্রকাশিত হয়। ১৮১২ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর হতে ১৮২১ সাল পয্যন্ত হ্যানিম্যান লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর ৬ মাস ধরে হোমিওপ্যাথি বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন। প্রত্যেক শনি ও বুধবার বিকাল ২ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত এ ক্লাস চলত। ১৮১৭ সালে তিনি ‘রেপাটারিয়াম’ নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থ ৪ খন্ডে প্রকাশিত হয় মোট পৃষ্ঠার সংখ্যা ৪২৩৯, এর প্রত্যেক পাতায় রয়েছে ৫২টা লাইন। বইটা ল্যাটিন ভাষায় লেখা। এই গ্রন্থে তিনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঔষধের বাছাই ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে আলোচনা করেন।

১৮১৯ সালে অর্গাননএর ২য় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই সালে সর্বসাধারণ্যে প্রচারের জন্য মেডিকেল ইনস্টিটিউটনামে একট প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এরপর আনহ্যান্টাকিথেনে গমন করেন ১৮২১ সালে আনহ্যান্টাকিথেনের নগরীর সিউক কর্তৃক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করে সনদ পান। ১৮২৪ সালে অর্গাননএর ৩য় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৮২৮ সালে হ্যানিম্যান ক্রনিক ডিজিজেসনামক গ্রন্থটি ৪ খন্ডে প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থে ক্রনিক মায়াজমসমূহের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৮২৯ সালে অর্গানন“- এর ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই সালের ১৩ই আগস্ট তার এম.ডি উপাধি পাওয়ার পঞ্চাশতম বার্ষিক উৎসব উপলক্ষে এক ভোজের আয়োজন করেন। এসময়ে জার্মান সেন্ট্রাল হোমিওপ্যাথিক ইউনিয়নস্থাপিত হয়। ১৮৩৩ সালের জানুয়ারী মাসে লিপজিকে একটি হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল স্থাপন করেন ১৮৩৩ সালে অর্গানন“- এর ৫ম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৮৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যানিম্যান প্যারিসে অবস্থানকে অর্গাননএর ৬ষ্ঠ সংস্করণের পান্ডুলিপি লেখার কাজ শেষ করেন, ১৯২১ সালে হ্যানিম্যানের মৃত্যুর অনেক পরে ডাঃ রিচার্ড হেল জার্মানি হতে অর্গাননএর ৬ষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। হেলের সম্পাদিত হ্যানিম্যানের এ মূল পাণ্ডুলিপিটা মুদ্রিত আকারে প্রথমে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯২১ সালের ৩ রা মার্চ। প্রকাশ করেন লিপজিকের প্রকাশক ডাঃ উইলমার স্কচ। একই সালের ডিসেম্বরে আমেরিকার সানফ্রান্সিস্কোর ডাঃ উইলিয়াম বোরিক মূল পান্ডুলিপিটার ইংরেজি অনুবাদ করেন।

হ্যানিম্যান নিজে দেহে ৯০টি মতান্তরে ১০০টি মতো ঔষধ পরীক্ষা করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সহিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৭৯২ সালের শেষ দিকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করলেও ১৮০৫ সাল পর্যন্ত একই সময়ে হোমিওপ্যাথি ও এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। এরপর থেকে পুরোপুরি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা আরম্ভ করেন ১৭৯০ সাল থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় এবং ১৮৩৫ সাল থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন। কথিত আছে, তার চেম্বারে এতো রোগী হতে যে, রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম পড়ে যেতো। হ্যানিম্যান ছিলেন শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ, অনুবাদক ও লেখক। তিনি ইংরেজি ভাষা হতে জার্মান ভাষায় ১৫টি বই এর ২১ খন্ড (১৭৭৭১৮০৯), ফরাসি ভাষা হতে ৬টি বই ৯ খন্ড (১৭৮৪১৭৯৬), ইতালিয়ান ভাষা হতে ১টি (১৭৯০), ল্যাটিন ভাষা হতে ১টি (১৮০৬) অনুবাদ করে নিজেকে পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি অনুবাদ করেন ফিজিওলজি, কৃষিবিদ্যা, স্বাস্থ্য বিদ্যা ও রসায়ন শা সম্পর্কিত কতকগুলো প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। তিনি প্রায় ১১৬টি বৃহৎ গ্রন্থ ও অসংখ্য ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তার রচিত গ্রন্থাবলীর মধে শুধু ২৩টি রসায়ন শাস্‌ত্রে। রসায়ন শাস্‌ত্রে তার রচিত গ্রন্থ ফার্মাসিউটিক্যালস্‌ লেক্সিকনএকটি অনন্য গ্রন্থ। তার আর একটি গ্রন্থ কফির ক্রিয়াতার মৃত্যুর এক যুগ পরেও ফরাসী, ভেনিস, হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান, স্পেনিশা, ইতালিয়ান, ইংরেজি ভাষান ভাষান্তরিত হয়েছে।

বার্লিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিশ্বের অন্যতম সার্জন বায়োলজির গবেষক হোমিওপ্যাথি অধ্যয়ন এবং ঔষধ নিজের সহকারীর শরীরে পরীক্ষা এবং রোগীর উপর প্রয়োগ করে লিখেছেন, “এক সময় আমার অভিযোগ ছিল হোমিওপ্যাথি এক বিজ্ঞানবর্জিত ফাঁকিবাজি। আসলে হ্যানিম্যান আমার এক শতাব্দী এগিয়ে রয়েছেন বলে হোমিওপ্যাথি বুঝতে আমার সমন লেগেছে

প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রান্সের প্রফেসর জ্যাকুই বেনভেনেস্তের তার নেতৃত্বে তিনটি উন্নত দেশে ১৪ জন বিজ্ঞানীর একটি প্রতিনিধিদল দীর্ঘ ৩ বছর গবেষণা চালিয়ে রিপোর্ট দেন– “হোমিওপ্যাথি ঔষধের কার্যকারিতা নিঃসন্দেহে এর শক্তিকরণ পদ্ধতি বিজ্ঞানভিত্তিক।হ্যানিম্যানের আত্মউৎসর্গের সুফল তার জীবনকালেই পৃথিবীতে বৈপ্লবিক সাড়া জাগায়। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও নিজ লক্ষ্যে অবিচল। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি হোমিওপ্যাথিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কর্মময় জীবনের অবসানে ইহলোক থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে গভীর আত্মতৃপ্তির সাথে হ্যানিম্যান তাই বলেন, “ইহজগতে আমি বৃথা জীবনধারণ করি নাই। ১৮৪৩ সালের ২রা জুলাই রোববার ভোর ৫টায় প্যারিসে নিজের ঘরে রুই দ্য মিলান নংস্থানে এই মহামানব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পৃথিবীতে যতদিন রোগযন্ত্রণা থাকবে ততদিন চিকিৎসাশাস্ত্রও থাকবে এবং মহাত্মা হ্যানিম্যানের নাম আর্তপীড়িত মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক, আজিজুর রহমান হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চকবাজার, চট্টগ্রাম। সভাপতি, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলা শাখা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনেক সন্তান বাবা-মায়ের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ও বড় নেয়ামত
পরবর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা