হেমন্তের আকাশ বড্ড রহস্যময়। কখনো ঝকঝকে নীল, কখনো ধবধবে সাদা, আবার কখনো বা সাদা আর নীলের ছোপ ছোপ মিশেলে একাকার হয়ে যায় গোটা দিগন্ত। সেই মিশেলটা অনন্য, শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো। কখনো ঝলমলে রোদে চোখ ঝলসে যায়, আবার পরক্ষণেই হালকা শীতল বাতাস এসে গালে ছোঁয়া দিয়ে মনে করিয়ে দেয় ঋতু বদলের গান শুরু হয়েছে। এই আকাশের মন বোঝা মুশকিল, অনেকটা আমার মতই বোধহয়!
সাদা মেঘেদের আমি বরাবরই তুলতুলে হাওয়াই মিঠাই মনে করি। যদি আকাশ ছোঁয়া যেত, তবে দু’হাত ভরে মেঘ মুঠোবন্দী করতাম। আমার দৃষ্টিসীমা জুড়ে যত মেঘ, সব জমিয়ে রাখতাম– শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস মাখা কোনো স্বচ্ছ কাচের জারে। কিন্তু হেমন্তের আকাশে তাকালে হঠাৎ কখনো মনে হয়– আকাশের বুকজুড়ে যে সাদা ছোপগুলো ভাসছে, সেগুলো আসলে কাশফুলের স্বপ্ন।
মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে যেমন কাশফুল বাতাসে মাথা দোলায়, ঠিক তেমনই মেঘেরা আকাশে নরম ভেসে থাকে। দুটোকে আলাদা করা যায় না–একটা মাটির স্নিগ্ধতা, আরেকটা আকাশের কোমলতা। মনে হয়, বিস্তৃত নীলের ভেতর সাদা কাশফুলেরা লুকিয়ে রেখেছে আকাশের নিজস্ব মায়া।
মাঝে মাঝে মনে হয়–হেমন্তের আকাশ যেন নিজের মনের গভীর কথা মেঘের ভিতর লিখে রাখে। যেন আকাশের মাঝে কোথাও লুকানো আছে নীরব বিষাদের পঙক্তি, ঠিক আমাদের ভেতরের অজানা দুঃখের মতো। বাতাসে ভেসে থাকা সেই মেঘেরা তখন শুধু মেঘ নয়–ওরা যেন স্মৃতির পাতায় ছড়িয়ে থাকা অবুঝ আলপনা। আমরা মানুষেরা শুধু সেগুলো পড়তে জানি না, কিন্তু অনুভব করে ফেলি অজান্তে। সন্ধ্যার বাতাসে সেই মেঘেদের রঙ মিশে যেত আমার চিন্তায়, ঠিক যেমন হেমন্তের বিকেল মিশে যায় নরম আলোয়, নিঃশব্দ কোনো স্মৃতিতে।
হেমন্তের আলো এমন এক আলো–কখনো সোনালি, কখনো হালকা ধূসর, আবার কখনো রোদ–ফুরোনো বিষণ্ন। সেদিকে তাকালে মনে হয়, দিনের বুকেও যেন কোনো দীর্ঘশ্বাস জমে আছে–অকারণে, শব্দহীন। তবুও, হেমন্তের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো এর সেই অকারণ বিষণ্নতা। হলদে পাতার মতো মনও যেন ঝরে পড়ে, নিঃশব্দে। সুন্দর একটা আকাশ দেখতে দেখতেও হঠাৎ মন কেমন করে ওঠে, বুকের ভেতর শূন্যতা খেলে যায়। যেন বিশাল আকাশে ডানা মেলে উড়তে থাকা একলা ছোট্ট পাখির মতো, যার উড়ালেও আছে স্বাধীনতা, আবার একাকীত্বও। হেমন্তের দুপুরে যখন বকের সারি আকাশের দিকে উড়ে যায়, আর দূরে কোথাও শোনা যায় এক জংলী ঘুঘুর ডাক তখন মনে হয়, কল্পনার নরম জগৎটা কে যেন আচমকা বাস্তবের মাটিতে টেনে নামিয়ে দিল।
সেই অকারণ টানেই হেমন্তের দিনগুলোকে মনে হয় ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি, আবার উদাসও বটে। কিন্তু এ উদাসীনতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অন্যরকম সৌন্দর্য যেন সবকিছুই আছে, তবু সবকিছুই আবার নেই। আর সেই না–থাকার পেছনে যে শূন্যতা, তা–ই হয়তো আমাদের মনকে এক নিঃশব্দ নরম আলোয় ভিজিয়ে দেয়। হেমন্তের আকাশে যখন দিনের শেষ সূর্যালোক ফিকে হয়ে আসে, তখন মনে হয়–এই সময়টুকুই জীবনের সবচেয়ে গভীর মুহূর্ত, যেখানে আলো–আঁধারি মিলেমিশে দাঁড় করিয়ে রাখে আত্মাকে। হেমন্ত আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু সেই নীল–সাদা আকাশ, সেই অকারণ বিষাদ, সেই মেঘ–ভেজা আলোয় ডুবে থাকা বিকেলগুলো– থেকে যায় মনের কোণে, একটুকরো মায়ার মতো। হয়তো সেই কারণেই, প্রতি হেমন্তেই মনে হয়– আকাশটা আজ একটু বেশি নরম, একটু বেশি আবেগতাড়িত, যেন আমারই হারানো মনের মতো।












