দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে ভোটের হাওয়া এখন বেশ সরগরম। ২০০৬ সালে শাহ আমানত সেতুর ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার এই অঞ্চলে উন্নয়নের যে জয়যাত্রা শুরু করেছে তা এখন বেশ দৃশ্যমান। বিএনপি প্রার্থী ৩ বারের এমপি সরওয়ার জামাল নিজামের সামনে এবার যে ৬ প্রার্থী নির্বাচনী মনোনয়নপত্র বাছাইপর্বে উত্তীর্ণ হয়েছেন তাদের মধ্যে ১৯৯১ সালে জামায়াত ইসলামী মনোনীত মাহমুদুল হাসান চৌধুরী ১৯৯১ সালে একবার দাড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করেন। সেবার তিনি ২,৫৬২ ভোট পান। তিনি ছাড়া অন্য ৫ প্রার্থীর কারো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড নেই। তাই অনেকের কাছে এবারের নির্বাচনে হেভিওয়েট সরওয়ার জামাল নিজামের সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে নবীন প্রার্থীরা ভোটারের সমর্থনে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ৭ জন প্রার্থীর মনোনয়পত্র বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে। প্রার্থীরা হলেন, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীতে মনোনীত সরওয়ার জামাল নিজাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী এস.এম.শাহজাহান, জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী, এনডিএম এর মোহাম্মদ এমরান, খেলাফত মজলিশ মোহাম্মদ ইমরান ও ইনসানিয়াত বিপ্লব পার্টির মু. রেজাউল মুস্তাফা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিএনপি মনোনীত সরওয়ার জামাল নিজাম এই আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত আতাউর রহমান খান কায়সার ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে মোট ভোটার ৩,৯৫,২৪৬ জন। মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১১৮টি। ১৯৯১ সালের পর এই আসনে হয় বিএনপি না হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনী দৌড়ে না থাকায় দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত এ আসনে এবার বেশ খোশ মেজাজে ভোটের মাঠে আছে বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ও তার সমর্থকেরা। তবে সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াতের মাহমুদুল হাসান চৌধুরীও। নির্বাচনের মাঠে বড় চমকের আশায় আছেন মোমবাতি প্রতীকে সুন্নি জোটের প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা এস.এম.শাহজাহান। ১৯৯১ সাল থেকে অংশগ্রহণমূলক চারটি নির্বাচনেই ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ভোটে অংশ নিয়েছে।
বিএনপি সমর্থকদের দাবি, সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ভোটের মাঠে একজন পাকা খেলোয়াড়। সাধারণ ভোটারদের কাছে তিনি অনেক জনপ্রিয়। এই অঞ্চলের উন্নয়নে তার অনেক অবদান রয়েছে। এ আসন বরাবর বিএনপির ঘাটি। বিএনপি সমর্থকেরা মনে করেন এখানে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম বিপুল ভোটে জয় লাভ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে বেশিরভাগ নেতাই এক হয়ে সরওয়ার জামাল নিজামের সাথে ভোটের মাঠে আছেন। সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনী লড়াই নতুন এক রেকর্ড গড়ার অপেক্ষায় বিএনপির এই প্রবীণ নেতা।
জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তারা এবার ভোটের মাঠে বিপ্লব ঘটাবেন। তাদের প্রার্থী আনোয়ারা কর্ণফুলীর সর্বমহলের পরিচিত মুখ। যার কারনে বিগত যেকোন সময়ের তুলনায় এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন এবং দলের প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জয়লাভ করবেন এই প্রত্যাশা। জামায়াত সমর্থকেরা আরো বলেন, দলের মনোনীত প্রার্থী বিগত ১ বছর ধরে ভোটের মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গেছেন। যা তাদের ভোটের বাঙে নিরব বিপ্লব হবে।
সুন্নি জোটের অনুসারীদের মতে, আনোয়ারা–কর্ণফুলী পীর আউলিয়ার এলাকা। সুন্নি জনগণ তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করছেন। সবাই এখন বুঝে গেছে দীর্ঘদিন বিরতিহীন ভাবে রাজনীতির মাঠে থাকা সাবেক ছাত্রনেতা এস.এম.শাহজাহান প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের মাঝে তার ব্যক্তিগত ইমেজ রয়েছে। দলীয় পরিচিতির বাইরেও তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনে অতীতের রেকর্ড ভেঙে মোমবাতির বাঙে বিপুল ভোট পড়বে।
অন্যদিকে ভোটের মাঠে সরব রয়েছে জাতীয় পার্টি প্রার্থী আব্দুর রব চৌধুরীও। তিনি দলীয় পরিচির সাথে ব্যক্তি জনপ্রিয়তাকে ভোটে কাজে লাগাতে চান। এনডিএম, খেলাফত মজলিশ ও ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রার্থীও নিজেদের মত করে ভোটারদের কাছ থেকে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছেন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ এই চারটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোটের হিসাব পাওয়া গেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ৪২,৯৭৩ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এডভোকেট মোহাম্মদ কবির চৌধুরী পান ৩৩,৫৬৩ ভোট, জাতীয় পার্টির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ৬,৮৬১ ভোট, জামায়াতের মাহমুদুল হাসান চৌধুরী ২,৫৬২ ভোট, ইসলামী ফ্রন্টের মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী ২,২৪৯ ভোট, বাংলাদেশ জনতা পার্টির আমিনুর রহমান ৯৮৪ ভোট, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (খালেকুজ্জামান) আকতার কবির চৌধুরী ৩৯৯ ভোট, জাকের পার্টির আমির আহমেদ খান ২৪৯, ন্যাপ (ভাসানী) নুরুল হক ১৯৯ ভোট, স্বতন্ত্র আব্দুল হক ১৭১, জাসদ (রব) মুখতার আহমদ ১৪৬, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (কাদের) আলী আহমদ তালুকদার ৯৫ ভোট পান।
১৯৯৬ সালে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম ৫২,৭৯২ ভোট পেয়ে এ আসনে নির্বাচিত হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতাউর রহমান খান কায়সার পান ৪১ হাজার ৯০১ ভোট, জাতীয় পার্টির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ৮,৯২৬ ভোট, জামায়াতের শামসুদ্দিন আহম্মেদ মির্জা ৪,২১২, ইসলামী ফ্রন্টের মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী ৩,০৮৪ ভোট, ন্যাপ (ভাসানী) নুরুল হক ২৮১ ভোট, বিকেএ প্রার্থী রশিদুল হক ২১২ আর জাকের পার্টিও চিত্ত সেন বড়ুয়া ২১২ ভোট পান।
২০০১ সালে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম ধানের শীষ প্রতীকে ৭৬ হাজার ৪৭৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় বার এমপি হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জমান চৌধুরী বাবু পান ৬৮ হাজার ১৮৬ ভোট, ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত আবদুর নুর চৌধুরী ৩০৮১ ভোট, ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আব্দুস সাত্তার রনি ১৬৮০ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ জামাল আহমেদ ২২৯ ভোট, স্বতন্ত্র আব্দুল হাই ১৫০ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কালাম বকুল ১৩৩ ভোট, বাংলাদেশ প্রগ্রেসিভ পার্টি আলী আহমেদ তালুকদার ১২৮ ভোট ও জাসদ মনোনীত মো. আবু তাহের ৯৬ ভোট পান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জমান চৌধুরী বাবু ১ লক্ষ ১০ হাজার ৯৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম পান ৮৬ হাজার ৭৫১ ভোট, ইসলামি ফ্রন্টের এম.এ. মতিন ৪,৩০৭ ভোট, গণফোরামের উজ্বল ভৌমিক ৫১৭ ও বিকেএ প্রার্থী রশীদুল হক ৪২৮ ভোট পান।












