একাত্তর মানে আমার কাছে আবেগ, একাত্তর মানে রক্তঝরা এক নির্মম ইতিহাস। একাত্তর মানে মা–মাটি ও মাতৃভূমি। ইশকুলবেলায় মা জননীর কাছে যুদ্ধদিনের গল্প শুনে ভয়ে শিউরে উঠতাম। চোখে দেখিনি ’৭১। মুক্তিযুদ্ধের নাটক, ছবি আর ইতিহাস পড়ে উপলব্ধি করতাম, ৭১–র স্মৃতিকথা শুনে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতাম। আহারে! শিকড়ের গল্প শুনলে রক্ত অশ্রু হয়ে ঝরত, মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রজন্ম হয়ে হৃদয় গহিনে ৭১ কে ধারণ করে বাউণ্ডুলের মতো স্বপ্ন ফেরি করে বেড়াতাম।
আমি একাত্তরের দুটি বিস্মৃত অধ্যায় নিয়ে কাজ করেছি। এই কাজগুলো করতে মনে হয়েছে আমি স্বাধীনতা দেখিনি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে গিয়ে মনে হয়েছে যেন একাত্তরে ফিরে গেছি। দুটি বিস্মৃত অধ্যায়: তন্মধ্যে একটি ছিল একাত্তরের শহীদ ছবুর, অপরটি একাত্তরের জলপুত্র (মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি জলদাশ)
একাত্তরের শহীদ ছবুর:
ছেলেবেলায় মায়ের মুখে প্রথম শুনেছিলাম মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা। সেই সময় নানাবাড়িতে আগুন দিয়েছিল পাকহানাদার বাহিনী। চারদিকে আগুন, গোলাগুলি আর বোমাবাজি। চিৎকার আর আহাজারির শব্দ। লাশের গন্ধ বাতাসে। মায়ের বয়স আর কত চার–পাঁচ। মাকে পাখির ডানার মতো শাড়ির আঁচলে আগলে রাখতেন নানুজি।
একাত্তরের সেই গল্প শুনে ভয়ে শিউওে উঠতাম। চোখে দেখিনি ’৭১। মুক্তিযুদ্ধের নাটক, ছবি আর ইতিহাস পড়ে উপলব্ধি করতাম, যুদ্ধের স্মৃতিকথা শুনে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতাম। মুক্তিযোদ্ধা সেজে ভাবতাম অনেক শত্রু সেনাদের খতম করব। দেশ স্বাধীন করব, স্বপ্ন ডানায় চড়ে, লাল সবুজের বিজয় নিশান কপালে বেঁধে সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে আনন্দ মিছিল করব। বিজয় মিছিলের স্লোগান হবে, জয় বাংলা! জয় বাংলা!
আহারে, শিকড়ের কাছে শোনা সেই গল্প, মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রজন্ম হয়ে হৃদয় গহীনে ধারণ করে স্বপ্ন ফেরি করে বেড়ানো। যুদ্ধদিনের গল্প স্মৃতির ঝাঁপিতে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই নক্ষত্র মাটি। যে মাটিতে সবাই হেসে–খেলে ঘুরে বেড়াই, জোছনা ভরা রাতে জোছনা উপভোগ করে, বৃষ্টির দিনে বৃষ্টিতে ভিজে। ঝাঁকিয়ে যখন শীত নামে কুয়াশার চাদর ছিড়ে প্রভাতফেরিতে যায় এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। আনন্দ সুখ দুঃখ একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করে, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা যেন সোনার বাংলাদেশ। এতো সুন্দর আমার দেশের মাটি বিশ্বের আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ।
সেই মা–মাটির টানে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, খুব কাছের প্রতিবেশী শহীদ গাজী আবদুস ছবুর। যিনি যুদ্ধ শেষে মায়ের কাছে ফিরেননি। ১২টি বছর প্রতীক্ষায় ছিলেন শহীদ ছবুরের মা ছমেরাজ খাতুন। শেষ নিঃশ্বাসটি চলে যাওয়ার সময়ও ছেলেকে খুঁজে বেরিয়েছেন শহীদ ছবুরের মা। ছেলেও চিরতরে চলে যাওয়ার সময় মাকে দেখার জন্য আর্তনাদ করেছিলেন। শহীদ ছবুর তাঁর সহযোদ্ধদের বলেছিলেন, ‘খবরদার অস্ত্র ফেলো না হাত থেকে। আমি মরে গেলেও দেশ স্বাধীন হবে।’
হ্যাঁ, দেশ স্বাধীন হয়েছে। ৫৫ টি বছর বৃক্ষের পাতার মতো ঝরে গেল। কী পেয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা? আমরা কী দিতে পেরেছি তাঁদের সম্মান কিংবা মর্যাদা। তাঁরাই তো সোনার বাংলার সোনার মানুষ।
শহীদ ছবুর মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলতে চেয়েছে একটি পক্ষ। তাঁর কবর পাহাড়ে রয়ে গেছে।
কতো চড়াই উৎড়ায়ের পর দীর্ঘ ৫১ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ৯ মে ২০২২ শহীদ ছবুরের নাম গেজেট ভুক্ত হয় এবং গত ২৭ অক্টোবর ২০২২ সালে শহীদ ছবুরের বোন জাহেদা আপা, জরিনা আপা এবং সহোদর গাজী সেলিম ভাইয়ের হাতে শহীদ ভাতার বই এবং রেশন কার্ড তুলে দেয়া হয়। ভাতা কার্ড এবং রেশন কার্ড পেয়ে শহিদের ভাইবোন আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কিছুতে ভুলতে পারছে না ৭১–ও শহীদ ছবুরকে। শহীদ পরিবারে সবাই আনন্দে আত্নহারা ৫১ বছর পর তাঁদের পরিবার শহীদ মর্যাদা পাওয়ায় সবাই খুশি। ভাইবোনসহ পুরো পটিয়াবাসী কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় সিক্ত করে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এসবের নেপথ্য–ও পেছনে ছিল ‘একাত্তরের শহীদ ছবুর’ বইটি। এবং শহীদ স্মৃতিকে আগামীর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তাঁর স্মৃতি বিজড়িত ইশকুলে শহীদ ছবুর শিশুতোষ পাঠাগার নামে একটি পাঠাগারও স্থাপন করা হয়েছে। ধামাচাপা পড়ে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া মু্ক্িতযোদ্ধাদেও কাছ থেকে তথ্য নিয়ে লেখা আমার একাত্তরের শহীদ ছবুর শুধু একটি বই নয় এটি একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস ও প্রামাণ্য দলিল।
একাত্তরের জলপুত্র (মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি জলদাস):
একাত্তরে দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, পটিয়া করল গ্রামের জলদাস পাড়ার সুনীল কান্তি জলদাস। মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি জলদাস একসময় সপরিবার নিয়ে সংসারের হাল ধরতে পটিয়া করল গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের কাট্টলীর লতিফপুরে জলদাস পাড়ায় চলে আসেন। জলদাস পেশার পাশাপাশি সুনীল কখনো জলদাসগিরি, কখনো রাজমিস্ত্রি, কখনো–বা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। বড়ো পরিতাপের বিষয় একসময় যখন তাঁর জীবন থমকে যায় চিকিৎসার ব্যয়নির্বাহ করার জন্য, তাঁর স্ত্রী শোভারাণী মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছেন সাহায্যের জন্য, কেউ মুখ ফিরিয়ে তাকায়নি। জাইল্লা বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। একসময় চিকিৎসার অভাবে না ফেরার দেশে চলে যান মুক্তিযোদ্ধা সুনীল জলদাস। আহা জলদাস মুক্তিযোদ্ধার জীবন! নিজ গ্রামেও সুনীলের কোনো স্মৃতি নেই। এমনকি অনেকে জানে না যে, চট্টগ্রামে একাত্তরের একজন জেলে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার ভাটিখাইন ইউনিয়নের করল গ্রামে একাত্তরের জলপুত্র সুনীল জলদাসের বাড়ি।
প্রায় ১২ বছর ধরে সুনীলের অজানা গল্প কুড়োনোর চেষ্টা করেছি মাত্র। কুড়োনো গল্পের ঝাঁপি মেলে দিলাম নতুন প্রজন্মের কাছে। জানি না কতুটুকু সফল হলাম। গত ২০২৩ সালে অরম একুশে বইমেলায় চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শৈলী থেকে একাত্তরের জলপুত্র বইটি প্রকাশিত হয়। সমগ্র বাংলাদেশে জেলে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এটি প্রথম রচনা। বিস্মৃত অধ্যায় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে একাত্তরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়েছিল লাল সবুজের বিজয় নিশানের জন্য দেশ স্বাধীন করার জন্য। একাত্তরের পুরোনো শকুনের প্রজন্মরা যতই চেষ্টা করুক একাত্তর কখনো মুছা যাবে না। একাত্তর বাংলাদেশ যতদিন থাকবে একাত্তরও ততদিন বেঁচে থাকবে। একাত্তরের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি হৃদয়ে লালন করতে হবে অনন্তকাল ধরে, সম্মান করতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক।










