অতীতের অন্যায় সংশোধনের যদি কেবল নতুন অন্যায় সৃষ্টি হয় তবে জাতির ইতিহাসের চাকা সামনের দিকে না গিয়ে পিছনের দিকে চলবে। প্রতিহিংসাপরায়ণ জাতি বিচারহীনতায় ভুগবে। জাতীয় জীবনে যেকোন সেক্টরে শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না। অরাজকতা ও নৈরাজ্য লেগেই থাকবে। সর্বদা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করবে। হিংসা–প্রতিহিংসা দারুণভাবে বিভাজন সৃষ্টি করে। সেটা পারিবারিক, সামাজিক, গুষ্টিগত এমনকি সর্বস্তরে। তাই ক্ষমতাহীনরা ভীষণভাবে বঞ্চিত হয়। দার্শনিক হান্নান আরেন্ট বলেছেন, ক্ষমা (এটা সাধারণ ক্ষমা নয়, অপরাধীরা অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে) মানবিক স্বাধীনতার এক অপরিহার্য উপাদান, কারণ ক্ষমা ব্যতীত মানুষ অতীতের অপরাধের নিকট চিরদিন বন্দী থাকে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। অতীতের অন্যায় সংশোধনের নামে যদি কেবল নতুন অন্যায় সৃষ্টি হয় তবে ইতিহাস ভিন্নরূপ ধারণ করে। মনে রাখতে হবে বিচার ও প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। বিচার হচ্ছে নীতি, প্রমাণ ও আইনের শাসনের ফল, আর সেটা সমাজকে স্থিতিশীল করে। প্রতিহিংসা হচ্ছে আবেগ, ঘৃণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার–যা সবার আমলে আমাদের দেশে চোখে পড়ে। এখানে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। যদি নিত তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক সুখে শান্তিতে বাস করতে পারতো। দেশ হতো সমৃদ্ধশালী। ন্যায় নীতি মেনে চললে অনেক শান্তি পাওয়া যায়। আকাশচুম্বী সম্পদের মালিক ও বিপুল ক্ষমতার অধিকারী না হয়েও অনেক শান্তিতে মর্যাদা সম্পন্ন জীবন অতিবাহিত করা যায়। এগুলোর পিছনে যারা ছুটছে হয়ত অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে বা অমসৃণ ঝঞ্ঝাটময় জীবন কাটাচ্ছে। অন্যায় অবিচারকে ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যেই সমাজ প্রতিহিংসাকে বিচার বলে ভুল করে সেই সমাজ অচিরেই ন্যায় বিচার হারায়, বিভাজন সৃষ্টি হয়। দেশে স্থিতিশীলতা আসে না–যা উন্নয়ন, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ব্যক্তিগত আক্রোশ, দলগত আক্রোশ, সমাজের দেশের বিভিন্ন স্তরে স্তরে আক্রোশ, প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার, এগুলো স্রোতের বিপরীতে নিয়ে যায়। নিয়ে আসে ধ্বংস। ব্যক্তিগত হলে সংকীর্ণতা, আর রাষ্ট্র যদি প্রতিহিংসাকে নীতিতে পরিণত করে তখন এর অভিঘাত হয় সুদূরপ্রসারী। কারণ এটি সহাবস্থান ও মানবিক নৈতিকতার ওপর আঘাত আনে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সমাজে প্রতিহিংসাকে বিচার ভাবে সে সমাজ বিচারহীনতায় ভোগে। কারণ সুশাসন–সুবিচার সমাজকে স্থিতিশীল রাখে। ছোট ছোট প্রতিহিংসা এক সময় বড় আকার ধারণ করে, আইনের তোয়াক্কা করে না, ফলে বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনে। আজকের যোগাযোগ মাধ্যম এতই সক্রিয় যে ক্ষোভকে মুহূর্তের মধ্যে আগুনের মতো ছড়িয়ে দেয়। তাই প্রতিহিংসার রাজনীতি এখন সহজ ও জনপ্রিয়। সুতরাং প্রত্যেককে দূরদর্শী হতে হবে। এটি প্রতিরোধ করতে হবে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মানুষ পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি রাজনীতি যে কী ভয়ঙ্কর হিংসায় পরিণত হয় তা যুগে যুগে দেশে দেশে প্রমাণিত। অপর পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কত অন্যায়ের আশ্রয় নেয় তার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিবর্তনের ফলে আমরা দেখি ক্ষমতাসীনরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পুনর্গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অর্থনৈতিক ক্ষতি পুনরোদ্ধার করা, স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনা–এগুলোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে প্রতিশোধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফলে দেশে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং ক্রমান্বয়ে দেশের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রতিহিংসামূলক রাষ্ট্রীয় চর্চা চলতে থাকলে সে সকল জনপদে হিংসা স্থায়ী আসন পেয়ে বসে। তাতে দেখা গেছে পরবর্তী প্রজন্মে উগ্রতা ও সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। উদাহরণ স্বরূপ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে নির্বাচন পূর্ব কঠোর অভিযানের ফল হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থাহীনতা–যেখানে সহিংসতার চক্র ভাঙার বদলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটা সঞ্চারিত হয়েছে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুনির্দিষ্ট অপরাধীদের অবশ্যই গ্রেফতার করবে। কিন্তু একটা বিশেষ বাহিনী দিয়ে অপেশাদার অপরাধী, কোনও রকম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয় সহ অতি সাধারণ নিরীহ বিপুল সংখ্যক লোককে গ্রেফতার করা হিতে বিপরীত হবে। প্রশ্ন থেকে যায় যেখানে আইনি প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই মুখ্য। ইতিহাস শিক্ষায় বলে সেখানে প্রতিহিংসা সমাধান নয়। এই প্রতিহিংসায় হিংসা বিস্তার লাভ করে। সত্যি বলতে কী আমাদের মতো দেশে এটি চলমান প্রক্রিয়া, এখানে শুধু পক্ষ ও ভূমিকা বদলায়। তাতে দেশের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি হয় সুষ্ঠু, ন্যায়ভিত্তিক, স্থিতিশীল সমাজ গঠিত হয় না। মানবাধিকার সংস্থা ও অপরাধ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায় যখন রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসল অপরাধীদের চেয়ে সাধারণ নিরাপরাধ নাগরিকদের গ্রেপ্তার করে তখন সমাজে নীরব ক্ষোভ সঞ্চার হয়। পরবর্তীতে সুযোগ পেলে এরা পতিশোধে বশবর্তী হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কিছু কিছু দেশ প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে সমঝোতায় এসে সবাই মিলে (অবশ্য আমাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন) দেশ গড়ার কাজে লেগে গিয়েছিল বলেই অতি দ্রুত দেশকে পুনর্গঠন করতে পেরেছিল। কয়লার পানি দিয়ে যেমন কয়লা পরিষ্কার করা যায় না, তেমনি হিংসা দিয়ে হিংসা দূর করা যায় না। উদাহরণ স্বরূপ দেখা যায় ১৯৯৪ সালে আফ্রিকার রুয়ান্ডার ‘হুতু ও তুতসি’ জনগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষ লক্ষ নাগরিক সহিংসতায় প্রাণ হারায়। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু রাষ্ট্র পাল্টা দমন ও প্রতিহিংসার পথে না গিয়ে ‘গাচাচা’ নামক এক সমপ্রদায় ভিত্তিক ন্যায় বিচার ব্যবস্থা চালু করে। অপরাধীদের শাস্তি, সত্য উদঘাটন, স্বীকারোক্তি, অনুশোচনা এবং সামাজিক পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্র প্রতিহিংসাকে নীতি করেনি বলে অন্যতম স্থিতিশীল রাষ্ট্র। ইউরোপের উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের সংঘাত ‘ক্যাথলিক ভার্সেস প্রোটেস্ট্যান্ট রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা, অবিশ্বাস। ১৯৯৮ সালে ‘গুড ফ্রাইডে” এ্যাগ্রিমেন্ট করে প্রতিহিংসার চক্র ভাঙে। তারা বুঝেছিল প্রতিশোধের সন্ধানে থাকলে শান্তি আসবে না। ন্যায় বিচার, আপস, ক্ষমা ও সহাবস্থানের মধ্যে নিহিত আছে শান্তি। ইতিহাস বলে বিভাজন যতবেশি–অশান্তি তত দীর্ঘস্থায়ী। পরিশেষে বলতে চাই, একটি স্থিতিশীল, উন্নত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে চাইলে রাষ্ট্রকে নীতিনির্ধারককে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসা বাঞ্চনীয়।
লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।











