ঢাকার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বিএআরসি) ‘হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গবেষণা প্রস্তাবনা পর্যালোচনা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন’ শীর্ষক ইনসেপশন কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রাবার ড্যাম নির্মাণ, দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে হালদা নদী ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এ অবস্থা নিরসনে হালদা পাড়ের মানুষ, নদীতে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে, হ্যাচারি ও মৎস্য অধিদপ্তরের সম্মিলিত কাজের মাধ্যমে নদীকে রক্ষা করতে হবে।
শনিবার আয়োজিত এই কর্মশালায় মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কাজ কেবল অর্থনীতি বা বিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমরা যে মৎস্যসম্পদ নিয়ে কাজ করি, তা আমাদের সামগ্রিক জীবনবোধেরও অংশ। তিনি বলেন, হালদা নদী সাধারণ মানুষের সম্পদ। তাই গবেষণার উপস্থাপনা ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন এমন ভাষায় হওয়া উচিত, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে। সামাজিক–অর্থনৈতিক গবেষণায় নারীদের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে উপদেষ্টা বলেন, হালদা পাড়ের বাস্তবতা বোঝার জন্য সেখানকার নারীদের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সামাজিক–অর্থনৈতিক গবেষণা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হালদা নদী বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নদী এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হালদার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হালদাকে ইতোপূর্বে মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এই হেরিটেজের গুণগত মান, ঐতিহ্যগত অবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ সবকিছু আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। এর স্বতন্ত্র অবস্থা যেন বিনষ্ট না হয়, এখানে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও দূষণ না হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কাজ করছে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের মাছ উৎপাদন বিশ্বের কাছে এখন বিস্ময়। ইলিশ আহরণ, তেলাপিয়া উৎপাদন, স্বাদু পানি ও বদ্ধ পানির মাছ উৎপাদনে আমরা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। মৎস্য খাতে আমরা গতানুগতিক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এ খাতে গবেষণাভিত্তিক প্রকল্প নিতে হবে, অঞ্চলভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে হালদা নদী বাংলাদেশের অদ্বিতীয় নদী। এখান থেকে সরাসরি মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। যুগ যুগ ধরে স্থানীয় অধিবাসীরা মাছের ডিম সংগ্রহ করে নিজস্ব পদ্ধতিতে রেণু উৎপাদন করে দেশের মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কিন্তু নানামুখী দূষণ এবং কৃত্রিম নানা আয়োজনে হালদায় মা মাছের স্বাভাবিক চলাচল এবং ডিম ছাড়ার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হুমকির মুখে পড়ছে। অবশ্য এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও দায়ী করা হয়। তাঁরা জানান, রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য দেশে আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি করা হয়েছে, পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অবৈধ জাল ব্যবহার করে অথবা বিষ প্রয়োগ করে যারা দেশের মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কঠোর বলে আমরা জানি। বলা জরুরি যে, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য মাছের চাহিদা পূরণের প্রধান ভূমিকা রেখে যাচ্ছে হালদা নদী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই নদীকে রাজনৈতিকভাবে একশ্রেণির নদী খেকোরা দখল করে নিচ্ছে। নদীর দুইপাড় যেভাবে দখল হচ্ছে তেমনি পুরো চট্টগ্রামের ময়লা আবর্জনা মলমূত্র এবং পলিথিনে জমাটবদ্ধ হয়ে নদীর তলদেশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। তাই হালদাকে বাঁচাতে চট্টগ্রামবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হালদা নদীর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। হালদা নদীর নাব্যতা হ্রাসে নদী খনন, হালদার সাথে সংযুক্ত শাখা খাল খনন ও শাখা খালের স্লুইস গেইট সংস্কার করতে হবে। হালদা নদী ও শাখা খালের মধ্যে কলকারখানা, ডেইরি ফার্ম, পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। হালদা পাড়ে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা হ্যাচারিগুলো পুনঃনির্মাণ ও নতুনভাবে আরো হ্যাচারি নির্মাণ করতে হবে। হালদা পাড়ের বাসিন্দা, জেলে ও মৎসজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য তাদেরকে গরু ক্রয় করে দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁরা বলেন, হালদা নদীর মা মাছের প্রজনন বৃদ্ধি ও মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সকলের সহায়তা পেলে হালদার পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সক্ষম হবে।








