হার্ড–ডে অর্থাৎ কঠিন কিন্তু আমি বলি প্রতিটা মানুষের জীবনে কোন না কোন সময়ে, সেটা ভোবেই হোক। হার্ড–ডে আসে। শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে, প্রোঢ়ত্বে এমন কি বৃদ্ধি বয়সেও এই হার্ড–ডে আসতে পারে। যারা জ্ঞানী, আত্মসচেতনী, তারা হার্ডডে বুঝতে পারে, সতর্কতা অবলম্বন করে জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়। আর যারা পারে না তারা জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়। যারা অসীম ধৈর্যের সহিত হার্ড–ডে মোকাবিলা করে তারাই টিকে থাকে। হার্ড–ডে এর দিনগুলিতে একটা লোকের আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিপর্যয়, রোগে আক্রান্ত, সার্পোট দেওয়ার লোক নেই। পদে পদে নানা রকম বিপদ, ঘাত প্রতিঘাত, দুর্ঘটনা জনিত কারণে স্বজন হারানো। আশা নিরাশা, এই রকম নানাবিধ কারণে জীবনে হার্ড ডে আসতে পারে। তাই তাদের হার্ড–ডেকে কাটিয়ে উঠতে সাহসের সহিত দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে যেতে হবে। দরকার হলে একাই নড়বে। দেখবেন সেই লোক আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। তারাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঝরে গাছ ভাঙে না, শিখর শক্ত হয়। ওদের সংসার হয়েছে। সচ্ছলতা এসেছে, সুতরাং কোন অবস্থাতেই ভেঙে পড়লে চলবে না। উঠে, জাগো, দাঁড়াও আবার জীবন ফিরে পাবে। হওয়ার কোন কারণ নাই। আমেরিকান জিমন্যাষ্ট ‘গাবিড গলাস’ বলেছেন। হার্ড–ডেজ আর দ্য বেস্ট, দ্যাটস হোয়েন চ্যাম্পিয়ন আর মেইড।” অর্থাৎ কঠিন দিনগুলি মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সময় আর তখনই তৈরী হয় চ্যাম্পিয়ন। প্রাচুর্য, আরাম আয়াসে থেকে উশৃঙ্খলতা, অপর পৃষ্ঠার দুঃখ কষ্টকে ভুলে থাকা বিপজ্জনক। যারা ছোট বেলা থেকে কষ্টের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করেছেন। অর্থ উপার্জন করেছেন। জীবনকে গোরবান্বিত করেছেন তারাই প্রকৃত মানুষ হয়েছেন। সমাজ এবং দেশ তাদের কাজ থেকে অনেক কিছু পেয়েছেন। কখনো বলোনা কাতর, স্বরে বৃথা জন্ম এ সংসারে। জন্মগত ত্রুটি নিয়ে কত শিশু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। তাদের জীবন ওত থেমে থাকে না। যার দু’হাত নাই সেও পা দিয়ে লিখে পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পায়। ২০ বছরের এক কাতারি তরুণ ‘কডাল রিগ্রেশন সিনড্রোম’ অর্থাৎ শরীরে নিম্নাংশ ছাড়া জন্ম নিয়েছেন। ত্রুটিটা গর্ভাবস্থায় ধরা পড়লেও মা কিছুতেই গর্ভপাত করাতে দেয়নি। জন্ম নেওয়ার পর মা–বাবা বলেছিল আমরা তার দুইপা। ছেলেটার নাম ‘ঘানিস–আল মুফতাহ’। গত কাতারের বিশ্বকাপে তাকে অ্যাম্বাসেডর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিষয় ছিল রাষ্ট্র বিজ্ঞান। এটাই হলো ‘আমরা করবো জয়’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার কীর্তি বলে শেষ করা যাবে না । বিশ্বে যে সমস্ত দেশ আজ সমৃদ্ধি লাভ করেছে, প্রথম সারির কাতারে আছে তাদেরও এক সময় হার্ড–ডে গেছে। ঐ হার্ড–ডে সময়ে যারা ঐ দেশগুলির নেতৃত্ব দিয়েছে তারা দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে দৈন্যদশা থেকে আবার উঠে দাঁড়ানো যায়। সেখানে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভাজন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, জাতিগত, গুষ্টিগত হানাহানি, সংঘাত এই গুলি মোকাবিলা করে আজ তারা উন্নত দেশ। উন্নতজাতি হিসাবে স্বীকৃত যেমন–প্রথমেই বলা যাক জাপানের কথা–দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৫ সালের আগস্টে ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণে জাপান ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। সবাই মনে করেছিল জাপান শেষ। আর উঠতে পারবে না। কিন্তু জাপান সেই প্রান্তিক দুর্যোগকে ‘হার্ড–ডে’ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। উন্নত পরিকল্পনা, শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্ম সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্থীরচিত্ত সিদ্ধান্তের ফলে মাত্র দুই দশকের মধ্যেই জাপান তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী এক গভীর বাস্তবতা সম্মুখীন হয়েছিল। খাদ্য সংকট অর্থনীতি সংকট, রাজনীতি শিল্পের ধ্বংস সব অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু ইউরোপ সেই কঠিন সময়কে শিক্ষায় পরিণত করলো। মার্শাল প্ল্যান, ইউরোপীয় কয়লা ইস্পাত সম্প্রদায় পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠান ভিত্তি–সকলের জন্ম হলো সেই ‘হার্ড–ডের পরীক্ষার ভেতরে, আজকের ইউরোপের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও দীর্ঘ মেয়াদি অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব সেই দুর্দিনের সুচিন্তার ফল। আবার অন্যপ্রান্তে ১৯৯০ সালের পর দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত। বিশ্ববরেণ্য নেতা ‘নেলসন ম্যান্ডেলা” যিনি ২৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন–দীর্ঘ বর্ণবৈষম্যে, দমন পীড়নে জর্জারিত, চার দশক ধরে সহিংস দাঙ্গায় জাতীয় সত্তার চূড়ান্ত ক্ষয়প্রাপ্ত দেশটাকে আলোর মুখ দেখিয়েছিল। তিনি সারা জীবন বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন করেছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার অতীতের রক্তাক্ত দিনগুলিকে প্রতিশোধের বীজে পরিণত না করে বরং জাতীয় পুনর্মিলন ও সত্যকমিশনের এই হিংসাকে নৈতিক সাহসে রূপান্তর করেছিলেন, যেটা অন্যদেশের জন্য অনুকরণীয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ দেখিয়েছিল হার্ড–ডে যদি সৎসাহসের সহিত অতিক্রম করা যায় তবে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টানো সম্ভব। তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ায়–কোরিয়ান যুদ্ধ (১৯৫০–৫৩)। যুদ্ধে দেশটি ভগ্ন দরিদ্র নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৬০ এর দশকে ‘হান নদীর অলেকিক তা সামনে আসে। তখন থেকেই শিল্প উন্নয়নের মূলে একটি মাত্র চিন্তা ছিল বিগত দিনের দুর্দিনকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপাদানে পরিণত করা। আজকের প্রযুক্তি নির্ভর কোরিয়া, বিশ্ব শ্রেষ্ঠ উৎপাদন ব্যবস্থা, কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার– সকলই ‘হার্ডডে’ এর মধ্যেই সফল হয়েছিল। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও কঠিন দিনের সম্মুখীন হয়। ১৯৩০ এর মহামন্দা আমেরিকার অর্থনীতিকে চুর্ণ–বিচুর্ণ করে দেয়। ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। শিল্প প্রতিষ্ঠান মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে যায়। কিন্তুু প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংলিন ডেলানো রুজভেল্ট সেই সংকট কালে শক্ত হাতে হাল ধরেন। সেই ‘হার্ড–ডে’–এর সংকট কালকে রূপান্তর করলেন। নিউ–ডিল এর ব্যাপক পুনর্গঠন পরিকল্পনার মাধ্যমে। তাই পরবর্তী শতাব্দীতে আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সামাজিক নিরাপত্তা, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত স্থাপিত হয়।
পরিশেষে বলবো আমাদের মতো মধ্যম আয়ের দেশে মাঝে মাঝে হার্ড–ডে এর ধাক্কালাগে। বহুবিধ সমস্যার দেশ বাংলাদেশ। সমস্যা লেগেই থাকে। যেমন–রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন ও অস্থিরতা, দুর্বল অবকাঠামো ও আর্থিক অবস্থা, সুশাসনের অভাব, তীব্র বেকার সমস্যা–সব মিলে অনেকেই বলে হার্ড–ডেতে আছি। সেবক না হয়ে যদি আত্মকেন্দ্রিক হয়। তবে দেশ সেবা করা যায় না। উপরের দৃষ্টান্তগুলি পর্যালোচনা করা যায় এবং অনুকরণীয় হতে পারে।
লেখক : প্রাক্তন চিফ, অ্যানসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল চট্টগ্রাম।











