দেশে প্রায় ২৬ লাখ হেক্টর আয়তনের বনাঞ্চল রয়েছে, যারমধ্যে এক তৃতীয়াংশের বেশি বৃহত্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত। একসময় দেশের সবচেয়ে ঘন ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ চিরহরিৎ বনাঞ্চল ছিল এখানে। এমনকি এখানে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া উদ্ভিদের এত বেশি ঘন বন ছিল যে, মাটিতে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাত না। কিন্তু বৃহত্তর চট্টগ্রামের সেই চিরহরিৎ বনাঞ্চল এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে এসব বনাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় প্রজাতির পশু–পাখি।
এরই মাঝে মানুষের জন্য বনের গুরুত্ব তুলে ধরতে আজ ২১ মার্চ ‘বন এবং উদ্ভাবন : একটি উন্নত বিশ্বের জন্য নতুন সমাধান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে ‘বিশ্ব অরণ্য দিবস’।
একসময় চট্টগ্রামের মীরসরাই থেকে দক্ষিণে কঙবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত এবং সমুদ্র উপকূল থেকে পূর্বদিকে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ‘চট্টগ্রাম হিল’–এ ছিল ঘন বৃক্ষ আচ্ছাদিত চিরহরিৎ বন। এই বনাঞ্চলে ছিল বৈচিত্র্যময় পশু–পাখির বসবাস। এই বনের ছিল এক অসাধারণ স্থাপত্য, যা বিমোহিত করত দেশি–বিদেশি মানুষকে। বনের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাজে লাগিয়ে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলো চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসার ঘটায়। কিন্তু একদিকে দেশীজাতের বৃক্ষ ও লতাগুল্মের বন ধ্বংস এবং অন্যদিকে বিদেশী জাতের চারা লাগানোর কারণে ঐতিহ্যবাহী ‘চট্টগ্রাম হিল’–এর সেই চিরহরিৎ বনাঞ্চল এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। সেসাথে শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক বনের বাস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ছে।
জলবায়ু পরিস্থিতি এবং গাছের প্রকারের উপর ভিত্তি করে বনকে গ্রীষ্মমন্ডলীয়, চিরহরিৎ, আংশিক চিরহরিৎ, পর্ণমোচী এবং শুষ্ক বন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। হ্রদ, পুকুর, মাটি, শিলা ইত্যাদির মতো অজৈব উপাদানও নিয়ে বন গঠিত হতে পারে। একটি বনকে একটি বাস্তুতন্ত্র গঠনকারী এলাকা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আর ‘ইকোসিস্টেমস’ বা বাস্তুতন্ত্র বলা হয় সেই পরিবেশকে, যেখানে উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি এবং অণুজীবগুলি যেখানে একসাথে বসবাস করে এবং অস্তিত্বের জন্য একে অপরের উপর নির্ভর করে।
বনভূমি বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে সাহায্য করে। বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অঙাইডের (গ্রিনহাউস গ্যাস) বর্ধিত পরিমাণ গ্রিনহাউস প্রভাবে পরিণত হয় এবং এর ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটে। বনভূমি মাটি ক্ষয় রোধ করে। বনাঞ্চলে উপস্থিত গাছ মাটির কতাকে শিকড় দিয়ে শক্তভাবে ধরে রাখে এবং ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। বন কার্বনের মতো বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে পরিবেশ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। বনাঞ্চল মাটির ক্ষয় রোধ করতে এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রকৃতিতে অঙিজেন এবং কার্বনের ভারসাম্য স্থাপনে সহায়তা করে। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বন অপরিহার্য বলে মনে করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যা ও প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. আশরাফ আলী ছিদ্দিকী।
বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী ড. আনছারুল করিম বলেন, অতীতের বন পুনরুদ্ধার কর্মসূচিগুলিতে বনের পরিবেশগত কার্যকারিতা, জীববৈচিত্র্য এবং কার্বনের সহ–সুবিধাগুলো বিবেচনা না করে কেবল গাছের আচ্ছাদন উন্নত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে বন আছে, কিন্তু বনে পশু–পাখি নেই। তবে বনবিভাগ দেশীয় প্রজাতির গাছপালা লাগিয়ে সেই ঘন বন পুনরুদ্ধার করবে এবং কঙবাজারকে সারাবিশ্বে একটি মডেল হিসাবে উপস্থাপন করবে বলে জানান প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আমির হোসেন চৌধুরী। তিনি বিদেশি প্রজাতির গাছের বনায়নের বিরোধিতা করে বলেন, বিদেশি প্রজাতির গাছ আমাদের পশু–পাখির বসবাসের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগিয়েই আমাদের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করতে হবে।












