হাম নিয়ে আতঙ্ক নয় চাই সচেতনতা

| বৃহস্পতিবার , ২ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে হাম। সমপ্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের মধ্যে এই সংক্রমণ বেড়েছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, বরং সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতন থাকাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।

গতকাল দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামের সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে গত মঙ্গলবার একদিনে নতুন করে আরো ২৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এতে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে। এর মধ্যে কিছু শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে মঙ্গলবার শুধুমাত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৩ জন শিশু। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু হামের টিকা দেয়নি। এছাড়া ইতোমধ্যে ৭ জনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। অপরদিকে গত সোমবার রাতে কক্সবাজার থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে চমেক হাসপাতালে আসা আয়েশা সিদ্দিকা নামে সাড়ে ৫ মাস বয়সী শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। কক্সবাজার থেকে আসার আগেই পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে হামে মৃত্যু হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগর এলাকা থেকে গতকাল ৬ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলসরুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে নগর থেকে এখন পর্যন্ত ৪১ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। অপরদিকে ১৫ উপজেলা থেকে গতকাল ১০ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত নমুনা পাঠানো হয়েছে ৫০ জনের। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত মোট ৯১ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৩ জন শিশুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ শিশু হামের টিকা দেয়নি। এছাড়া কয়েকজন এক ডোজ টিকা দিয়ে আরেক ডোজ দেয়নি। এছাড়া পূর্ণ দুই ডোজ টিকা দিয়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে এমন শিশুও রয়েছে। অন্যদিকে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ মাস বয়সী এক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। এদের বয়স ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে।

এদিকে, ইউনিসেফ থেকে হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, এমপি। গত সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার টিকা ক্রয়ে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানান তিনি। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) থেকে এই টিকা সংগ্রহ করা হবে। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চালু, ভেন্টিলেটর সরবরাহ ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড প্রস্তুতের মাধ্যমে কাজ চলছে। একইসঙ্গে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের আক্রান্ত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। একবার সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করলে খুব দ্রুত তা আশপাশের অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে। হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ সর্দিজ্বরের মতো। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া। তবে কয়েকদিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সব ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক না হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি। হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ। এই জটিলতাগুলোই অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, শিশুদের অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবেশিশুর যদি জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং র‌্যাশ আসে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই রোগে নিউমোনিয়াও হতে পারে। বাসায় নিয়ে বসে থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে