মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র হয়েছে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে গতকাল সোমবার তৃতীয় দিনের মতো ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, উপসাগরী দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্রিয় হওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক বক্তব্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই যুদ্ধ এক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো নেগোশিয়েশন বা সমঝোতা করবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানি।
এদিকে সংঘাতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ১৩১টি শহরে হামলার ঘটনায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে রয়টার্স লিখেছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেও একটি হামলার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এছাড়া ইরানের হামলায় মার্কিন বাহিনীর চার সদস্য নিহত হওয়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে, অন্তত ১০ জন ইসরায়েলির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ভুল করে তিনটি মার্কিন এফ–১৫ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে। গতকাল সেন্টকম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, ঘটনাটি মিত্রপক্ষের গুলিতে ঘটা দুর্ঘটনা (ফ্রেন্ডলি ফায়ার)। বিধ্বস্ত তিনটি বিমানের ছয়জন ক্রু নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর্পস (আইআরজিসি) বলছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ১১তম ঢেউ ছুড়েছে ইসরায়েলের বিরশেবা শহরকে নিশানা করে। ইরানের তাসনিম নিউজ বলছে, ওই শহরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যোগাযোগ শিল্প কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়েছে। ভবনটিতে রয়েছে মাইক্রোসফটসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কার্যালয়। সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটির রানওয়েতে ড্রোন আঘাত করেছে। আইআরজিসি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি বলছেন, আমেরিকানরা তাদের অধিকাংশ বিমান সাইপ্রাসে সরিয়ে নিয়েছে। আমরা সেখানেও আরও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করব, যাতে সেখান থেকেও তাদের চলে যেতে বাধ্য করা যায়।
এছাড়া গতকাল ভোর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, কাতার, দুবাইয়ে ব্যাপক বিষ্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গতকাল ওমানের একটি বন্দরেও হামলা চালায় ইরান। তবে উপসাগরীয় প্রায় সব দেশেই আক্রমণ চালালেও ওমান হামলার লক্ষ্য ছিল না বলে আল জজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। ওমানে হামলার প্রসঙ্গে আরকাচি বলেছেন, ওমানে যা হয়েছে সেটি আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল না। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের প্রভাবশালী এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এখন সরকারি নির্দেশে কাজ করছে না, বরং কার্যত ‘স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে’ তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কাতারেও হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, শিল্পনগরী রাস লাফানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হামলার পর কাতারের জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মুসাফাহ এলাকায় একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আবুধাবি মিডিয়া অফিসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলার ফলে সৃষ্ট আগুন তাৎক্ষণিকভাবে নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় জ্বালানি কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বা তেল উত্তোলনে কোনো প্রভাব পড়েনি।
ইরানের ২ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি কাতারের : ইরান থেকে ধেয়ে আসা দুটি যুদ্ধবিমান সফলভাবে ভূপাতিত করার দাবি করেছে কাতারের বিমানবাহিনী। গতকাল কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে একথা বলেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বিমানবাহিনীর পাশাপাশি কাতারের নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া সাতটি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং পাঁচটি ড্রোনও প্রতিহত করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে, যদিও বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
লেবাননে হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান নিহত : ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই লেবাননে হেজবুল্লাহর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ইতোমধ্যে অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এসব হামলায় আরো ১৪৯ জন মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানান লেবাননের কর্মকর্তারা।
এদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈরুতে তাদের চালানো হামলায় হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান হুসেইন মাকলেদ নিহত হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিধি বাড়ায় লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। তবে গতকাল হেজবুল্লাহর সশস্ত্র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে লেবানন সরকার। গোষ্ঠীটি তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে অবস্থানরত তাদের দেশের নাগরিকদের দ্রুত দেশটি ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধ এক মাস চলতে পারে : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বর্তমান সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ বা প্রায় এক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। তিনি জানান, অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মূলত নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে এবং সংঘাত দীর্ঘ হলেও প্রস্তুতি রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে চারটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা, দেশটির নৌ সামরিক শক্তি ভেঙে দেওয়া, পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ঠেকানো, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করা। তবে ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা কর্মসূচি বৈধ এবং তারা আগ্রাসনের জবাব দিচ্ছে। মূলত ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন স্থাপনা রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করেই হামলা চালাচ্ছে ইরান।
সংঘাতে ‘সরাসরি যোগ দেবে না’ যুক্তরাজ্য : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে যুক্তরাজ্য যোগ দেবে না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তবে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস ধ্বংস করতে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রশংসা করে নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, তাদের অভিযানের ফলে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের তেহরানের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তবে এই সংঘাতে নেটো সরসারি জড়াবে না বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যা করছে তা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে ইরানের ক্ষমতাকে হ্রাস করছে। নেটোর এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বা এর অংশ হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। তবে মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ প্রচেষ্টাকে সফল করতে যা সম্ভব তা করতে পারে।
দুইদিন আগে দোহা, দুবাই ও মানামাতে আছড়ে পড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেবল কিছু ভবনের কংক্রিট আর কাচই ভাঙেনি, একইসঙ্গে তা মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের সংঘাত–সঙ্কট থেকে মরুদ্যানের এই অংশটুকু নিরাপদ, স্থিতিশীল–উপসাগরের দেশগুলোর সযত্নে লালিত এমন ভাবমূর্তিও খসিয়ে দিয়েছে। এখন ওই দেশগুলো অসম্ভব দুটি পছন্দের একটি বেছে নেওয়ার এক বিষণ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর একটি হল যুদ্ধে জড়ানো, সেক্ষেত্রে তাদের ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে; আর না হলে নিজেদের শহর পুড়তে দেখেও চুপচাপ বসে থাকতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘ হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।











