হাত বাড়ালেই সনদ!

২০-৩০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় এনআইডি জড়িত চক্র, মূল হোতারা অধরা

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১ at ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ

হাত বাড়ালেই মিলছে সনদ। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মসনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, সিটি কর্পোরেশনের প্রত্যয়নপত্র, আয়কর সনদপত্র, ইউনিয়ন পরিষদের সনদসহ যাবতীয় সনদপত্র কোনো ঝামেলা ছাড়া মাত্র দুই মিনিটেই তৈরি হচ্ছে সাধারণ কম্পিউটারের দোকানে। একটি সুসংগঠিত চক্র এ কাজে জড়িত। বরাবরই চক্রটির মূল হোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। ধরা পড়ে চুনোপুটিরা। এজন্য থেমে থেমে চক্রটি জালিয়াতি অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে দক্ষিণ বাকলিয়া মামুনুর রশিদ মার্কেট থেকে জুনায়েদুল ইসলাম (২৮) নামে এ চক্রের এক সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব। আটক জুনায়েদ পটিয়া উপজেলার উত্তর কৈয়াগ্রামের মো. ইউনুসের ছেলে। র‌্যাব দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে আসছে জানিয়ে র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) ফ্লাইট লেফটেনেন্ট নিয়াজ মোহাম্মদ চপল জানান, বাকলিয়ার একটি দোকানে বসে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহার করে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম সনদ, ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সনদ তৈরি করে প্রতারণা করে আসছিলো জুনায়েদ। অভিযোগ পেয়ে পরবর্তীতে সেই দোকানে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। এ সময় ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ভুয়া সনদপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে এনআইডি জালিয়াতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। একই ব্যক্তির একাধিক এনআইডি থাকলে সেটির নোটিফিকেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আসতে এক বছরের মতো সময় লাগে। এই এক বছরের মধ্যে জালিয়াত চক্রের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায়। প্রতারক চক্রটি স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য প্রথমে জন্ম সনদ সংগ্রহ করে। এই কাজের জন্য তাদের আলাদা চ্যানেল বা সোর্স থাকে। যাদের মাধ্যমে এনআইডি কার্ড তৈরির কাজগুলো তারা পেয়ে থাকে। এরপর চক্রের মধ্যে থাকা ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের মাধ্যমে ভোটার আইডি কার্ডের ফরম পূরণ করে সেই তথ্য সার্ভারে আপলোড করে। এরপর যাচাই বাছাইয়ের পর চক্রটি ঠিকমতো কাজ করতে পারলে এনআইডি কার্ড পেয়ে যায়।
গত বুধবার রাত পৌনে ৯টার দিকে নগরীর ফ্রি পোর্ট এলাকা থেকে ভূয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে জড়িত রাকিব হোসেনকে (২৫) আটক করে র‌্যাব-৭। র‌্যাব জানায়, রাকিব অভিনব কায়দায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে মাত্র দুই মিনিটে ভূয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম সনদ তৈরি করে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নেজাম উদ্দীন আজাদীকে জানান, এটি একটি চক্র; যারা ভূয়া জাতীয়তা সনদ ও জন্ম নিবন্ধন সরবরাহ করে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করতে সহায়তা করে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন আবেদনের নিবন্ধন ফরমে যুক্ত করা জাতীয়তা ও জন্ম সনদ এবং বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্রের ফটোকপিগুলো সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে সংগ্রহ না করে তারা নিজেরা এসব সনদ তৈরি করে আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করে। বাংলাদেশী নাগরিকদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে পরিচিতি দিতে তারা এ কাজ করে থাকে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ সেপ্টেম্বর নগরীর চান্দগাঁও এলাকার হাসেম টেলিকম নামে একটি দোকান থেকে ভূয়া সনদ তৈরির সরঞ্জামসহ প্রদীপ দাস নামে এক যুবককে আটক করে র‌্যাব। ২০ সেপ্টেম্বর নগরীর খুলশী থানাধীন টেকনিক্যাল মোড় এলাকার একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন সনদপত্র তৈরির অভিযোগে শাহেদ হোসেনকে আটক করে। ১৮ জুন র‌্যাবের হাতে চকরিয়ার সাহারবিল মাইজঘোনা থেকে ধরা পড়েছিল ওসমান গণি নামে এক ব্যক্তি; যে রোহিঙ্গাদের কাছে ভূয়া এনআইডি কার্ড ও পাসপোর্ট সরবরাহ করতো। এ সময় তার কাছ থেকে ৭টি ভূয়া পাসপোর্ট, ৭টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি জন্ম সনদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবৈধ সীল মোহর উদ্ধার করা হয়। ৫ মে নগরীর আগ্রাবাদ ও দেওয়ান হাট এলাকা থেকে জাল এনআইডি ও জাল সনদ তৈরি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে র‌্যাব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধট্রেন চালক, গার্ড ও টিটিইদের আলটিমেটাম স্থগিত
পরবর্তী নিবন্ধসিনিয়র জেল সুপারকে ‘তিরস্কার’