হাতি হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে উপরে ঝুপড়ি ঘর

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ২৮ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনের দুর্গম এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপনসহ বনজসম্পদ উজাড়, দখলের সুবিধার্থে প্রায় একমাস আগে একটি বন্য হাতিকে ফাঁদ পেতে হত্যার পর মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে যে জায়গায় হাতিটির মরদেহ পুঁতে ফেলা হয়েছে তা পাহাড়ের পাদদেশের ফসলি জমির মাঝখানে। এমনকি যেখানে বিশাল গর্ত করে হাতিটিকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে তা ধামাচাপা দিতে সেখানে আস্ত একটি ঝুপড়ি ঘরও তৈরি করা হয়েছে। তবে হাতি হত্যার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় মরদেহটি মাটিচাপা না দেওয়ায় একমাসের মধ্যেই ওই এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই সেখানকার মানুষ এবং বনবিভাগের কর্মীদের সন্দেহ দানা বাঁধে। অবশেষে আবিষ্কৃত হয় ফসলি জমির মাঝখানে রাতারাতি গড়ে তোলা ঝুপড়ি ঘরের নিচ থেকেই দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এরপর গত বৃহস্পতিবার এবং গতকাল শুক্রবার বনবিভাগের একটি দল ওই ঝুপড়ি ঘরের নিচের মাটি অপসারণ করতে গেলে ফাঁস হয় বন্য হাতি হত্যার পর মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন নলবিলা বনবিটের অধীনস্থ চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের মুসলিম নগর এলাকার করিম্মাকাটা ঘোনার দুর্গম বনাঞ্চলে। সংরক্ষিত বন পাহারাসহ সার্বিক তদারকির জন্য বনবিট এবং কর্মকর্তাকর্মচারী নিয়োজিত থাকলেও বন্য হাতি হত্যার পর কীভাবে মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে এবং তাও একমাস অতিবাহিত হওয়ার আগে কেউ কিছুই জানতে পারল নাএ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার সাবেক এক জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, বর্তমানে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, পাহাড় সাবাড় করে মাটি বিক্রির মাধ্যমে সমতল ভূমিতে রূপান্তর এবং বনভূমি বেচাবিক্রি করে চলেছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সরকার দলীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মূলত এই চক্রই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুর্গম ওই এলাকাকে বন্য হাতির উপদ্রবমুক্ত করতেই পরিকল্পিতভাবে বন্য হাতি হত্যার পর গোপনেই মাটিচাপা দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন লোকজন বলছেন, কাগজেকলমে বনবিভাগ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বন, বন্য প্রাণীসহ বনজ সম্পদ সুরক্ষায় তাদের ভূমিকা একেবারেই রহস্যজনক। এই অবস্থায় বন্য প্রাণীরাও একেবারে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে সংরক্ষিত বনের ভেতর। যদিওবা বন আইনেই উল্লেখ রয়েছেসংরক্ষিত বন এলাকায় কোনো ধরনের জনমানব প্রবেশ করতে পারবে না এবং এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেখানে আস্ত একটি বন্য হাতিকে কীভাবে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে তা সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান জানান, নিয়মিত টহল দেওয়া বনকর্মীরা দুইদিন আগে দুর্গন্ধ পায় দুর্গম ওই এলাকায়। এরপর স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ফসলি জমির মাঝখানে নির্মিত ঝুপড়ি ঘর অপসারণ করা হয়। এরপর পুলিশ, সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে গিয়ে মাটি কুঁড়ে হাতিটির মরদেহ শনাক্ত করা হয়। তিনি আরও জানান, হত্যার পর পুঁতে ফেলা হাতিটির শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করাসহ ভেটেরিনারি সার্জন ময়নাতদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মো. মোস্তাফিজুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, হত্যার পর মাটি কুঁড়ে পুঁতে ফেলা বন্য হাতিটি পুরুষ এবং বয়স আনুমানিক ১০ বছর। গুলি করে বা বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেঁতে হাতিটিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সংগৃহীত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ল্যাবে পরীক্ষানিরীক্ষার পর শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে সঠিক কোন কায়দায় হাতিটিকে হত্যা করা হয়েছে।

ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান বলেন, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী, এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে বা যারাই জড়িত থাকুক তাদের শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচলন্ত অবস্থায় চট্টলা এক্সপ্রেসে আগুন
পরবর্তী নিবন্ধযুক্তরাষ্ট্র থেকে এলো ৬২ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন গম