জন্মলগ্ন থেকে এখন অবধি সময়ের পরিক্রমায় পৃথিবীতে যতগুলো শহর অতীত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে গ্রিসের এথেন্স অন্যতম। গ্রিক পুরানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এই এথেন্সের ইলিসস উপত্যকায় চুনাপাথরের পাহাড়ের ওপর স্বগৌরবে ২,৫০০ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক পুরানের দেবী অ্যাথেনার সম্মানে নির্মিত পার্থেনন মন্দিরটি। তবে সেখানে শুধু পার্থেননই না, রয়েছে আরো একাধিক স্থাপত্যকলা। এছাড়াও রয়েছে গ্রিসের সেকালের শাসকদের স্মৃতিবিজড়িত অগণিত ছোট ছোট স্থাপনা।
অ্যাক্রপলিস নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা বের করতে পারেননি ঐতিহাসিকগণ। কারণ ইলিসস উপত্যকায় স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাগুলোকে বর্তমান যুগের ঐতিহাসিকরা অ্যাক্রপলিস নামে নামকরণ করলেও প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগের সময় থেকেই অ্যাক্রপলিস শব্দটির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পেরেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। সে যা–ই হোক, গ্রিসের ইতিহাসের সঙ্গে যে শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা খুব সহজেই বোঝা যায়।
আড়াই হাজার বছর আগে নির্মিত এই বিখ্যাত স্থাপনাগুলো নিয়ে কখনোই ঐতিহাসিকদের আগ্রহের কমতি ছিলো না। কারণ খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত হলেও এখন অবধি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি এথেন্সের অ্যাক্রপলিস এবং পার্থেননের মতো স্থাপনাগুলো। সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় মাত্রার ভূমিকম্প, যুদ্ধ কিংবা বোমা বিস্ফোরণেও অ্যাক্রপলিস ও পার্থেননের মূল কাঠামোগুলো প্রায় অক্ষত রয়েছে। আর এই কারণেই আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদদের আগ্রহ জাগে সেকালের এমন নির্মাণশৈলী নিয়ে।
প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, অ্যাথেন্সের যে জায়গায় অ্যাক্রপলিস দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ব্রোঞ্জ যুগের সময়েও কোনো একজন নির্দিষ্ট শাসককে কেন্দ্র করে একটি ছোট সাম্রাজ্য পড়ে উঠেছিলো। আর ইতিহাস বলে, ব্রোঞ্জ যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। তবে ব্রোঞ্জ যুগে অ্যাক্রপলিসের ঠিক কতটুকু নির্মাণ হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে কতটুকু টিকে ছিলো তা নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।
পার্থেনন নির্মাণে প্রায় ১৩,৪০০টি বড় বড় পাথরের খন্ড ব্যবহার করেন নির্মাতারা। শুধুমাত্র এই পাথরগুলোর পেছনেই অ্যাথেনীয়রা তখন ব্যয় করেন প্রায় ৪৭০টি রৌপ্যমুদ্রা, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনজন নির্মাতা মিলে যে ডিজাইন করেছেন সেটি অনুযায়ী ২৩,০০০ বর্গ ফুটের মেঝের কাজও করা হয়। পার্সিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া পুরাতন মন্দিরের চুনাপাথরের উপরেই মেঝের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো।
পুরো ভবনটিকে একটি মন্দিরের মতো করে গড়ে তুলতে অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন নির্মাতারা। ভবনের প্রতিটি পাশ নিম্ন ধাপ ও উচ্চ ধাপ করে তৈরি করা হয়, যা মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এছাড়াও পার্থেননের ভেতরে ১৯টি এবং বাইরে ৪৬টি কলাম তৈরি করা হয়। আর এই কলামগুলোকে কেন্দ্র করে সীমানা প্রাচীরের মতো করে দেয়া হয়েছিল। তবে অভ্যন্তরীণ কলামগুলোর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। মন্দিরের বিভিন্ন কোণে অবস্থিত কলামগুলো অন্য কলাম অপেক্ষা ব্যাসের দিক দিয়ে বেশি বড়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে– পার্থেননে কোনো ডান কোণ নেই!
খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে যখন এথেন্সে এই নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৫০ বছরেও শেষ করা যায়নি অ্যাক্রপলিসের পুরো কাজটি। ঐতিহাসিকরা এর পেছনে জেনারেল পেরিক্লেসের নজরদারিকে ইঙ্গিত করেন। যদিও তার মৃত্যুর পরে বাকি কাজগুলো থেমে থাকেনি।
নির্মিত হওয়ার এক যুগ পরই বড়সড় ভূমিকম্পের শিকার হয় পার্থেনন। তখন এটি এবং পাশ্ববর্তী অন্যান্য স্থাপনাগুলো অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছিলো। খ্রিস্টপূর্ব ৪২৬ সালে সংগঠিত ঐ ভূমিকম্পে গোটা এথেন্স ক্ষতির শিকার হলেও পার্থেননের একটি কলামকে শুধুমাত্র ১ ইঞ্চির মতো সরাতে পেরেছিলো। আধুনিক যুগের প্রত্নতত্ত্ববিদরা গবেষণা করতে গিয়ে অনেক চমকপ্রদ তথ্য পান। মূলত, স্থপতিদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় নির্মিত হওয়ার কারণেই বিভিন্ন সময় মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেয়েছিলো পার্থেনন ও এর আশেপাশের স্থাপনাগুলো।
২০১৫ সালে একদল প্রকৌশলী পার্থেননের কাঠামোগুলো পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তারা জানান, আড়াই হাজার বছর আগের স্থপতিরা এর কাঠামোকে ভূমিকম্প সহনীয় করেই তৈরি করেছিলেন, যার কারণে অ্যাক্রপলিস ও পার্থেননের কাঠামো এখনো এথেন্সের বুকে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই অ্যাক্রপলিসের জন্য হলেও প্রাচীন স্থপতিরা অসংখ্য ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। আধুনিক যুগের কেউই হয়তো কখনো কল্পনা করেননি হাজার বছর আগের স্থপতিরা এমন উন্নত চিন্তাভাবনা করে সেটিকে বাস্তবে রূপান্তর করতে পারতেন। শুধু তা–ই নয়, অ্যাক্রপলিস ও পার্থেনন প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ গ্রিসের সবচেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ শহর হিসেবে এথেন্সকে উপস্থাপন করেছিলো।








