হাঁটুতে কখন ব্যথা পাননি বা নেই, বলাটা বেশ ভার। পায়ের এই হাঁটুকে ব্যবহার করে আমরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থান্তারিত হই। আমরা সমতল, উঁচুনিচু, সিঁড়ি, পাহাড়ে উঠানামা করি। যেহেতু কাজ বেশি তাই ক্ষয়ও বেশি, তাই পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাঁটু ব্যথা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে আমাদের চলন ক্ষমতা ব্যাহত হয়।
হাঁটু মানবদেহের জটিল অস্থিসন্ধি যা একটি নমনীয় কব্জা, দরজার কব্জা মতো। এই কব্জাটি মূলত কাজ করে হাড় (ফিমার, টিবিয়া এবং প্যাটেলা), তরুনাস্থি, মেনিস্কাস, লিগামেন্ট, পেশির সমন্বয়ে, যা যথাক্রমে ভার বহন, ঘর্ষণরোধ, ভার শোষণ, সংযুক্ত রাখা ও চলনে সাহায্য করে। সর্বোপরি হাঁটুর সন্ধিটি পুরো সাইনোভিয়াল নামে পিচ্ছিল তরলযুক্ত একটি ক্যাপসুল বা আবরণের ভেতরে থাকে, যাতে হাঁটু পুষ্টি পায় ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
হাঁটু ব্যথার কারণ ও ধরন:
বয়স ভেদে হাঁটু ব্যথার কারণ ও ধরণ বেশ আলাদা হতে পারে।
গ্রোথ পেইন: হাড় দ্রুত বড় হওয়ায় সন্ধ্যা বা রাতে ব্যথা,
খেলার আঘাত: দৌড়, লাফ, ফুটবল/ক্রিকেট খেলতে গিয়ে মচকানো
প্যাটেলোফেমোরাল পেইন সিনড্রোম: হাঁটুর সামনে ব্যথা, সিঁড়ি উঠানামায় বাড়ে
এছাড়া লিগামেন্ট ইনজুরি (ACL, MCL), মেনিস্কাস টিয়ার, তরুনাস্থির ক্ষয় শুরু, পুরনো আঘাতের প্রভাব, অস্টিওআর্থ্রাইটিস (হাঁটুর জয়েন্ট ক্ষয়), হাড় দুর্বল হওয়া (অস্টিওপোরোসিস) ইত্যাদি।
হাঁটু ব্যথার ধাপ সমূহ:
কীভাবে বুঝবেন আপনি ধীরে ধীরে হাঁটু ব্যথাতে আক্রান্ত হচ্ছেন–
ধাপ–১: প্রথমে আপনি হাঁটুতে ক্লান্ত বোধ করবেন, হাঁটতে ইচ্ছে করবে না।
ধাপ–২: এরপর আপনার হাঁটুতে সময়িক ব্যথা অনুভব করা, যা বিশ্রামের পর ব্যথা চলে যায়।
ধাপ–৩: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা মূল ব্যথা, যা বিশ্রামের পরও চলে যায় না।
ধাপ–৪ঃ হাঁটু তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে বা অস্থিসন্ধি বিকৃত হয়ে যায়।
তাই ধাপ–১ ও ২ এর মাধ্যমে শরীর আমাদের শতর্ক করে, তখনই আমরা সঠিক ব্যবস্থা নিলে ধাপ–৩ বা ৪ এর ভয়াবহতার মধ্যে পড়তে হবে না।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হব:
প্রাথমিক চিকিৎসা কাজ না করলে ও উপরের ধাপ–১ ও ২ পুনঃ পুনঃ অনুভব করলে। ব্যথা বা যে কোন জটিলতা ২–৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়া।
শিশু/কিশোরদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা রাখতে হবে। হাঁটু ব্যথার কারণে হাটতে না চাওয়া। রাতে নিয়মিত ব্যথায় ঘুম ভেঙে যাওয়া। হাঁটু ফুলে যায় বা জ্বর থাকে
চিকিৎসক:
হাঁটু ব্যথার ধরণ অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও ভিন্ন:
রিউমাটোলজিস্ট: প্রদাহজনিত হাঁটুর বাত ব্যথা, যেমন– রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এঙ্কাইলোজিং স্পন্ডাইলাইটিস ইত্যাদি।
ফিজিক্যাল মেডিসিন/ ফিজিওথেরাপিস্ট: হাঁটুর যে কোন ধরনের ব্যথা, যা তীব্র বা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তবে হাঁটুর যেকোন অংশ ভেঙে বা সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যাওয়া ব্যতীত।
অর্থোটিস্ট: হাঁটুর বিকৃতি রোধ বা সংশোধন ও প্রয়োজনে তীব্র ব্যথায় অস্থিসন্ধিকে স্থির (Immobilize) করে রাখার জন্য এই বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পরে।
অর্থোপেডিক সার্জন: হাঁটুর যেকোন অংশ ভেঙে গেলে, অতিমাত্রায় ক্ষয় ও সম্পূর্ণ ছিঁড়ে গেলে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমাধান করে থাকেন।
তবে দুঃখজনক বা আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে হাঁটুর গজও রিপোর্ট ভুল আসে। সে ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের মাধ্যমে বিশেষ শরীরবৃত্তীয় টেস্ট যেমন Lachman Test, McMurray Test ও বহু সংখ্যক টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবেন, অপারেশন ছাড়া সুস্থ হওয়া সম্ভব কিনা।
প্রাথমিক চিকিৎসা:
হাঁটুতে হঠাৎ ব্যথা, মচকানো বা চোট লাগলে POLICE মেথড অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
P–Protection (সুরক্ষা), OL–Optimal Loading (নিয়ন্ত্রিত ভর/ব্যবহার), I-Ice (বরফ সেঁক), C–Compression (সহনিয় চাপে ইলাস্টিক ব্যন্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা), E–Elevation (হাঁটুকে উঁচুতে রাখা)।
উল্লেখ্য যদি ন্যূন্যতম ৩ দিনের নতুন ব্যথা হয়, সেখানে বরফ বা আইস ব্যাগ ভেঁজা কাপড়ে পেঁচিয়ে ১৫–২০ মিনিট দিতে হবে। ৩ দিন বা তার অধিক হয়, তাহলে গরম সেঁক দেয়া যাবে।
হাঁটুর যত্ন:
সঠিক পুষ্টি গ্রহণ যেমন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ খেলাধুলা, অতিরিক্ত চাপ এড়ানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পেশি শক্তিশালী করা, উঁচু হিল এড়ানো। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে হালকা ব্যায়াম, সহায়ক উপকরণ যেমন লাঠি ব্যবহার করা।
সাধারণ ব্যয়াম:
হাঁটু ব্যথায় কিছু নিরাপদ ব্যয়াম উল্লেখ করা হল। ব্যয়ামগুলোর নাম ইংরেজিতে দেয়া হল, যাতে YouTube বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে খুঁজে ভিডিও দেখে আরও ভালো বোঝা যায়। প্রত্যেকটি ব্যয়াম ১০ বারে একটা সেট, মোট ২টি সেট করতে হবে এবং ২ সেটের মাঝে ১ মিনিট বিরতি দিতে হবে। ব্যথা থাকলে দিনে ৩ বেলা করতে হবে। আর ব্যথা না থাকলে, প্রতিরোধ হিসেবে ১ বেলা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি উপরোল্লিখিত নিয়মে গরম বা ঠাণ্ডা সেঁক দিতে হবে ১ বা ২ বেলা।
হাঁটু ও উরুসন্ধি ভাঁজ করা: চিত হয়ে সোজা হয়ে শুতে হবে। এক হাঁটু ভাঁজ করতে হবে, এরপর দুই হাত দিয়ে হাঁটুকে ধরে বুকের কাছে টেনে এনে ৫ সেকেন্ড ধরে রেখে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে এবং উপরের নিয়ম অনুসারে পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
Isometric quads exercise: প্রথমে চিত হয়ে সোজা হয়ে শুতে হবে, ব্যথার হাঁটুর নিচে একটি বালিশ বা টাওয়েল রোল করে দিবে হবে। এরপর হাঁটু দিয়ে নিচে চাপ দিয়ে ৫ সেকেন্ড ধরে রেখে আবার স্বাভাবিক হবে।
Knee strengthening exercise with ankle weigh : cuff: পঁভভ: প্রথমে চেয়ারে বা উঁচু যায়গায় বসতে হবে, যেন পা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। ঝুলন্ত অবস্থায় একটি বালুর ব্যগ (Sand Bag) বা ওজন গোড়ালিতে বেঁধে দিতে হবে। ব্যথাবিহীনভাবে ১ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত ওজন বেঁধে দেয়া যেতে পারে। এবার পা ঝুলন্ত অবস্থা থেকে উপরে উঠাবে ৫ সেকেন্ড ধরে রেখে আবার নামিয়ে ফেলবে।
Single leg Bridge : প্রথমে চিত হয়ে সোজা হয়ে শুতে হবে, দুই হাঁটু ভাঁজ করতে হবে। এরপর ভাল পা সোজা করতে হবে ও হিপ জয়েন্ট থেকে ৪৫ ডিগ্রী উঁচু করতে হবে। এই অবস্থায় কোমর উঁচু করে ৫ সেকেন্ড ধরে রেখে কোমর ও পা আবার নামিয়ে ফেলবে।
Patellofemoral Mobilization : হাঁটু সোজা করে বসতে হবে। হাঁটুর উপরে বা সামনে একটি বাটির মত হাড় আছে যাকে Patella বলে। এই বাটিটিকে উপরে–নিচে, ডানে–বামে নড়াচড়া করতে হবে। প্রত্যেকটি নড়াচড়া উপরের নিয়মে পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
Hip flexor stretching: এখানে Half kneelingবা অর্ধেক হাঁটু গেড়ে আসন নিতে হবে। ব্যথা করলে নিচে বালিশ দেয়া যেতে পারে। এরপর শরীরকে সামনের দিকে ঝুকালে ঊরুসন্ধিতে টান অনুভব করবে।
ঊঠ–বসা করা: ব্যথাবিহীন সীমার মধ্যে উঠ–বস করা। বেশি কষ্ট হলে জানালার গ্রিল ধরে চেয়ারে উঠ–বস করা যেতে পারে। প্রথম দিকে ১ সেট ব্যয়াম করলেও হবে। (বিঃদ্রঃ কোন সমস্যা হলে ফিজিওথেরাপিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে)।
সাধারণ পরামর্শ:
হাঁটুর ব্যথায় উঁচু কোমড ব্যবহার করা ভালো। সূর্যস্নান (Sunbath) সকাল ৮টা–১০টার মধ্যে বা ৪টার পর করা, যা ১৫–৩০ মিনিটই যথেষ্ট। হাঁটু ব্যথা অবস্থায় আমাদের সক্রিয় বিশ্রামে (Active Rest) থাকতে হবে। ব্যথা হয় না বা কম হয় এমন দৈনন্দিন কাজ করতে হবে। হাঁটা সাময়িকভাবে একেবারেই সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে হাত ও শরীরের সম্ভাব্য ব্যয়াম করতে হবে। সর্বশেষ মনকে প্রফুল্ল রাখতে হবে।
পরিশেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রায় ৪০%-৫০% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কিছু না কিছু সময়ে হাঁটু ব্যথার সমস্যা অনুভব করেন। তাই হাঁটুর যত্ন নিন ও চলাচল সচল রাখুন, যার প্রেক্ষিতে হিপোক্রেটিস বলেছেন ‘হাঁটা মানুষের সর্বোত্তম ওষুধ’।
লেখক: কনসালটেন্ট–ফিজিওথেরাপি ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপক, সিআরপি চট্টগ্রাম–এ. কে.খান কেন্দ্র।










