ইংরেজিতে ‘Poke one’s nose into others affairs‘ বলে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে। যার বাংলা অর্থ হলো ‘পরের ব্যাপারে নাক গলানো‘। এই কর্মটি যেমন কিছু ব্যক্তি করে থাকে, তেমনি করে কিছু রাষ্ট্র। এহেন চরিত্রের ব্যক্তিরা আমাদের আশেপাশে থাকে। এদের আমরা চিনি। যে সকল রাষ্ট্র এই কর্মটি করে তারাও আমাদের চেনা। প্রবাদটি মনে এলো সমপ্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইউরোপীয় দেশ হাঙ্গেরি সফরের সময় সে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে প্রকাশ্যে তার ‘নাক গলানো‘ দেখে। আগামী রবিবার ১২ এপ্রিল, এই লেখা যেদিন ছাপার অক্ষরে বের হবে তার পরদিন, হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক ছয় দিন আগে ভারতীয় বংশদ্ভুত স্ত্রী, উষা ভ্যান্সকে সাথে নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্স হাঙ্গেরি সফর করেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের পক্ষে ওকালতি করার জন্যে। অবশ্য তাতে আমার মত আমজনতা কেউ অবাক হয়নি। কেননা পরের ঘরের ব্যাপারে নাক গলানো যুক্তরাষ্ট্রের অতি পরিচিত পুরানো স্বভাব। ভ্যান্স এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতিয়ালি–কাজটি করার জন্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পছন্দের মানুষ দীর্ঘ ১৬ বছর একটানা হাঙ্গেরির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা এন্টি–ইউরোপীয় মনোভাবাপন্ন এই ইউরোপীয় রাজনৈতিক নেতা, ভিক্টর ওরবান। ২৭টি ইউরোপীয় দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন যাতে শক্তিশালী হতে না পারে তার জন্যে ওরবান যা কিছু তার ক্ষমতার মধ্যে সম্ভব করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে। দুর্বল–ইউরোপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও পছন্দ। ট্রাম্প যেমন ইউক্রেনে সামরিক সাহায্য কমিয়ে দিয়েছেন, ঠিক তেমনি ভিক্টর ওরবানও রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাহায্যের যে প্রস্তাব করেছিল তাতে ‘ভেটো’ দিয়েছেন। তাতে লাভ হয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বার্তায়, আচার–আচরণে, এমন কী নানা কর্মকান্ডে যে পুতিন–প্রীতি তা কারো অজানা নয়। অথচ রাশিয়া আমেরিকার ‘জাত শত্রু‘। আর এখানে মিল ওরবান ও ট্রাম্পের। এই কারণে ওরবানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের। ইতিমধ্যে ওরবান বার কয়েক হোয়াইট হাউস সফর করেছেন ট্রাম্পের আমন্ত্রণে। রুশ প্রেসিডেন্টেরও পছন্দের ব্যক্তি ডানপন্থী ভিক্টর ওরবান। রাশিয়াও চায় দুর্বল–ইউরোপ। তাহলে তার আধিপত্যবাদের জন্যে কাজটা সহজ হয়।
এখন দেখা যাক আমেরিকা কীভাবে হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনে নাক গলাচ্ছে। জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরি সফর করার আগেও হাঙ্গেরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে ‘উদারপন্থী পক্ষপাতিত্ব‘ বা ‘liberal bias‘ দূর করার জন্যে ওরবানের প্রশংসা করেছিলেন এবং এবার বুদাপেষ্ট সফরকালে নির্বাচনী প্রচারণার শেষের দিনগুলিতে হাঙ্গেরীয় নেতাকে সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সাধ্যমত তাকে সাহায্য করতে চাই।‘ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওরবানকে ‘একজন প্রকৃত বন্ধু‘ হিসাবে বর্ণনা করে মাইগ্রেশন বিষয়ে তার (ওরবান) অবস্থানের প্রশংসা করেছেন। হাঙ্গেরিতে পৌঁছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স হাঙ্গেরির নির্বাচনী প্রচারণায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনী হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ করে ওরবানকে ইউরোপের একজন ‘রোল মডেল’ হিসাবে বর্ণনা করেন। সে সময় ওরবান ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যানসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অথচ তিনি ভুলেই গেছেন তিনি স্বয়ং নিজে হাঙ্গেরির নির্বাচনে ওরবানের পক্ষে ওকালতি করে সে–দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছেন। সেখানেই ভ্যান্স থেমে থাকলে কথা ছিল। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে ওরবানের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘এই নেতৃত্ব মহাদেশের জন্য একটি মডেল হতে পারে।‘ ইইউর (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ব্রাসেলসসের আমলারা হাঙ্গেরির অর্থনীতি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। তারা হাঙ্গেরিকে জ্বালানি ক্ষেত্রে কম স্বনির্ভর করার চেষ্টা করছে, হাঙ্গেরীয় ভোক্তাদের খরচ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। উদারনৈতিক রাজনৈতিক রীতি–নীতির বিরোধিতা করার জন্য ওরবানকে থামাতে ইইউ–এর পদক্ষেপ গুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, হাঙ্গেরীয় ভোটারদের কী তথ্য দেবে না দেবে তা ব্রাসেলসসের আমলারা কেন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে বলবে?’ তার যুক্তি হলো, হাঙ্গেরীয়রা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। অতি সত্যি কথা। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে উনি কেন অতলান্তিক সাগর পাড়ি দিয়ে এদেশে এসে ওরবানের পক্ষে ওকালতি করছেন, প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তার অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। তার অভিযোগ ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হাঙ্গেরির ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে অবগত আছি যে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে এমন কিছু গোষ্ঠী আছে যারা নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে।‘ অভিযোগ করেছেন বটে, তবে তিনি এই ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দেননি বা দিতে পারেননি। উল্লেখ করা যেতে পারে যে হাঙ্গেরীয় সরকার এই বলে বারবার অভিযোগ করে আসছে যে কিয়েভ এবং ব্রাসেলস ওরবানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এও বলেছেন ওরবানকে সমর্থন দিচ্ছি আমরা, তবে নির্বাচনে যেই জয়ী হোক না কেন আমরা তার সাথে কাজ করবো।
এখন কথা হলো– এক নাগাড়ে ১৬ বছর যে ব্যক্তিটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন তার তো শক্ত জনসমর্থন থাকার কথা। তাহলে কি তার আসন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে? তা না হলে খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের মাত্র ছয় দিন আগে এই রাষ্ট্রীয় সফর কেন? গেল ফেব্রুয়ারি মাসে হাঙ্গেরি সফর করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনিও ওরবানের পক্ষে সাফাই গেয়ে ‘মার্কিন–হাঙ্গেরির সম্পর্ককে‘ একটি ‘সোনালী যুগ‘ বলে অভিহিত করেছিলেন। এতদিন ক্ষমতায় শক্ত অবস্থানে থাকলেও সামপ্রতিক নির্বাচনী জরিপে দেখা যায়, আসন্ন নির্বাচনে ভিক্টর ওরবানের অবস্থান বেশ নড়বড়ে। গত সপ্তাহে ২১টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, বিরোধী দল টিসা (বা ফ্রিডম এন্ড রেসপেক্ট পার্টি) ‘ডিসাইডেড‘ বা সিদ্ধান্ত–গ্রহণকারী ভোটারদের মধ্যে ৫৬% সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ওরবানের দল, ‘ফিদেজের‘ সমর্থন ৩৭% শতাংশ। দু–দলের মধ্যে ব্যবধান ১৯ শতাংশ।
হাঙ্গেরির বিরোধীদলীয় নেতা, পিটার মাগিয়ার (Peter Magyar) হাঙ্গেরির নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেন এবং ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বুদাপেস্ট সফরের তীব্র সমালোচনা করেন। সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স‘-এ তিনি লেখেন, ‘কোনো বিদেশী রাষ্ট্র হাঙ্গেরির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এটি আমাদের দেশ। হাঙ্গেরির ইতিহাস ওয়াশিংটন, মস্কো বা ব্রাসেলসসে লেখা হয় না।‘ একেবারে স্পষ্ট জবাব। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের দাবিকে সমর্থন করে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি এই বলে অভিযোগ করেন যে, ব্রাসেলসসের অনেক শক্তি ওরবানের বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং সক্রিয়ভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাহায্য করছে, তারা চাননা যে ওরবান আবার নির্বাচনে জিতুক। প্রশ্ন– তারা চাইবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক। যে–পক্ষ প্রো–ইউরোপীয় তা ক্ষমতায় আসুক সেটিই তো চাইবে ইউরোপিয় ইউনিয়ন। তারা কীভাবে চাইবে প্রো–রাশিয়ার কোন দল ক্ষমতায় আসুক, যে দলটি চায় দুর্বল–ইউরোপ।
অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ উঠেছে ওরবান ২০২৫ সালে এক ফোনালাপে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বলেছিলেন, ‘আই এম এট ইয়োর সার্ভিস‘ অর্থাৎ ‘আমি আপনার সেবায় নিয়োজিত‘। কোন পক্ষ এই ফোনালাপ স্বীকার না করলেও রাশিয়া তা অস্বীকারও করেনি। এতেই বুঝা যায় পুতিন–ওরবানের সম্পর্ক এবং ওরবান যদি আবার ক্ষমতায় আসেন তা হবে ব্রাসেলসসের জন্যে মাথা ব্যাথার কারণ। কারণ ইউনিয়নের সম্মিলিত কোন কোন প্রস্তাবে হাঙ্গেরি ভেটো দেয়াতে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা দেবার ইউনিয়নের প্রস্তাবে হাঙ্গেরি ভেটো দিলে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ইউনিয়নের নিয়ম অনুসারে কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্যে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন। ঠিক তেমনি হাঙ্গেরির জন্যে বরাদ্দকৃত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউরোর তহবিল স্থগিত হয়ে আছে। ফলে ওরবান সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সীমিত হয়ে পড়ছে সরকারি ব্যয়ের সুযোগ। করতে হচ্ছে বাজেট সংকোচন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড। যার ফলে দিতে হচ্ছে মারাত্মক রাজনৈতিক মূল্য। ইইউ–এর সাথে ‘সংঘাতকে‘ নিজেদের কৌশলের একটি মূল অস্ত্র বানিয়ে ওরবান প্রশাসন এখন টের পাচ্ছে যে তাদের অনুসৃত কৌশলটিই এখন তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
সবশেষে, এখন দেখা যাক ৪৫ বছরের ভিক্টর ওরবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার ম্যাগিয়ার (জন্ম ১৬ মার্চ ১৯৮১) হাঙ্গেরির রাজনীতিতে নূতন বাতাস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন কিনা। পিটার ম্যাগিয়ার এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে যে প্রো–য়ুরোপীয়দের জন্যে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে আনবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাতে নাখোশ হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নির্বাচনে বন্ধু হারলে বন্ধুর খারাপ লাগারই তো কথা, তা না হলে বন্ধু কিসের। তাই নয় কি? অপেক্ষা করি আর কটা দিন। (৯–৪–২০২৬)।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।













