গেল সংখ্যায় এসে থেমেছিলাম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে ডিনার টেবিলে সাংবাদিকদের চলমান আলোচনায়। তিনি যখন আমাদের বললেন ‘আপনাদের সবার পরনে বিদেশী কাপড় কেবল আমি ছাড়া‘ তখন লক্ষ্য করলাম, বাস্তবিক তাই। প্রেসিডেন্টের পরনে সাদা পাঞ্জাবি, গলায় সরু সোনার চেইন। আমাদের সময় সাংবাদিকদের দৃষ্টিকটু ও নির্লজ্জভাবে রাজনৈতিক দল কিংবা নেতার লেজুড়বৃত্তি করতে দেখা যেত না। সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত সমপ্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। রাজনীতির মতপার্থক্য থাকলেও পেশাগত কারণে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করতে দেখা যেতোনা। সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত স্বার্থে যে ঐক্য ছিল সে কথাটি বলার জন্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে আমাদের ডিনার–টেবিলের আড্ডার একটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। আমাদের সাথে ওই আড্ডায় ছিলেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক শক্তি পত্রিকার সম্পাদক (নামটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিনে বলে দুঃখিত)। উপস্থিত সাংবাদিকদের তুলনায় তিনি বয়সে বেশ বড়। তার পত্রিকার তেমন কাটতিও ছিলনা। অবশ্য বাংলাদেশে সেটি নুতন কোন ব্যাপার নয়। চট্রগ্রাম সহ গোটা দেশে এমন অনেক পত্রিকা আছে যা কেবল সরকারি বিজ্ঞাপন পেলেই দিনের মুখ দেখে। মজার ব্যাপার হলো এই সমস্ত পত্রিকার সম্পাদক কিংবা সাংবাদিকদের চাল–চলন হাবভাব কাটতি রয়েছে তেমন পত্রিকার চাইতেও অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি। যাই হোক, যে সময়ের কথা বলছি তখন দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক নির্মল সেন সরকারি পত্রিকা দৈনিক বাংলায় ‘অনিকেত‘ ছদ্মনামে উপ–সম্পাদকীয় কলামে জিয়াউর রহমান সরকারের নানা সমালোচনা করে চলেছেন। তার সেই কলাম ছিল বেশ জনপ্রিয়। দৈনিক শক্তি সম্পাদক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে অভিযোগের সুরে জানতে চাইলেন, সরকারি পত্রিকায় চাকুরী করে নির্মল সেন কী করে এইভাবে সরকারের বিরুদ্ধে লিখতে পারেন। সম্পাদক হয়তো আশা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার এই ধরনের তোষামোদি প্রশ্নে খুশি হবেন। কিন্তু তিনি আশাহত হলেন। তিনি খুশি হবার মত তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না প্রেসিডেন্ট জিয়া। তবে নির্মল সেনকে নিয়ে অভিযোগ করায় উপস্থিত সব সাংবাদিকরা খুব অসুন্তষ্ট হলেন। বামঘেঁষা রাজনীতিবিদ সাংবাদিক নির্মল সেন ছিলেন সবার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়, তার কলমের ধারও ছিল প্রখর। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগার পৌনে বার। প্রেসিডেন্ট জিয়া আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। আমাদের কেউ কেউ এগিয়ে গেলেন কাছেই সমুদ্র সৈকতের দিকে। দৈনিক শক্তির সম্পাদকও সাথে গিয়েছিলেন। সাংবাদিকরা তার ওপর এমনই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে এক পর্যায়ে ওই সম্পাদককে চ্যাংদোলা করে পানিতে ফেলে দেবার ভয় দেখান। যাই হোক–
পরদিন কাক ডাকা ভোরে দৌড়াতে হবে, যে কারণে কক্সবাজার আসা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উদ্বোধন করবেন ‘পাতালি খাল খনন কর্মসূচি‘। আমরা ফিরে এলাম মোটেলে। তখন রাত প্রায় দেড়টা। দেখি মোটেল তো বটেই দোতলায় আমাদের কামরার সামনের লম্বা টানা বারান্দায় সশস্ত্র পাহারা। হাজার হলেও খোদ দেশের রাষ্ট্রপতির অতিথি। আমি, বন্ধু সাংবাদিক ওসমান গনি মনসুর ও আমাদের পত্রিকার ফটোগ্রাফার বন্ধু ইলিয়াস– ফিরে আসি আমাদের কামরায়। আড্ডা চলে অনেক রাত অবধি। পরদিন খুব ভোরে রওনা দিলাম পাতালি খালের উদ্দেশ্যে। এক সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া এলেন। ঘটা করে উদ্বোধন করলেন কর্মসূচি। আমাদের সাথে পৃথকভাবে খালের পাশেই কথা বললেন। একটি কাগজে কলম বের করে এঁকে তিনি আমাদের ব্যাখ্যা করলেন তার পরিকল্পনা। কথা শেষে সেই কাগজটি সেখানে থাকা উঁচু টেবিলে রেখে তিনি চলে গেলেন। পরে দেখলাম সেই কাগজের টুকরোটি নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে পৃথক নিউজ করলেন চট্টগ্রাম ব্যুরো চিফ মঈনুল আলম ভাই (প্রয়াত)। সেদিন দুপুরে ঢাকা থেকে সাথে আসা সাংবাদিকরা ফিরে গেলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে একই প্লেনে। আমরা মোটেলে লাঞ্চ সেরে ফিরে এলাম চট্টগ্রাম শহরে।
এর কিছুদিন পর অন্যান্য দিনের মত এক দুপুরে অফিসে গেছি। আমাকে বলা হলো ‘এখনই হোটেল আগ্রাবাদ হোটেলে যাও। সেখানে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছেন জার্মানি থেকে আসা এক সাংবাদিক।‘ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খালখনন কর্মসূচি নিয়ে তিনি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরী করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ এসেছেন। তিনি ঠিক করেছেন গ্রামের দিকে যাবেন। কোন এক খালের কাছাকাছি পৌঁছে কথা বলবেন স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের সাথে, কথা বলবেন গ্রামবাসীদের সাথে। আমার দায়িত্ব ইন্টারপ্রেটার হিসাবে কাজ করা। অফিস থেকে রিকশা নিয়ে হোটেল পৌঁছি। তার রুমে মেসেজ দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি লবিতে। জার্মান সাংবাদিক আগেই ‘রেন্ট এ কার‘-এর গাড়ি ঠিক করে রেখেছিলেন। তখন দুপুর দুটো/আড়াইটা। তিনি এলেন, পরিচয়ের পালা শেষ করে দুজনেই গাড়ির পেছনের সীটে গিয়ে বসলাম। গাড়ি স্টার্ট দিতেই তিনি বললেন, ‘কিছু মনে করোনা, আমি মিনিট দশেক একটু চোখ বন্ধ করে থাকবো। তারপর তোমার সাথে আলাপ করবো।‘ ঠিক দশ মিনিট পর গা ঝাড়া দিয়ে নড়েচড়ে বসেন আধ বয়েসী এই জার্মান সাংবাদিক। আলাপ শুরু করেন এই বলে, ‘তোমাদের প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা হয়েছে। খুব একটিভ, বেশ জোরে জোরে হাঁটেন। ভালো লেগেছে।‘ তারপর খাল কাটা কর্মসূচি নিয়ে জনগণের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। জানতে চান বিরোধী দলের বক্তব্য।
আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলে পটিয়ার দিকে। কোথায় যাব তখনো ঠিক করিনি। সে ভার আমার ‘পরে। কালুরঘাট ব্রিজ পেরিয়ে কদ্দুর যাবার ্ল্ল্ল্লপর বোয়ালখালীর কাছাকাছি এসে গাড়ি থামাতে বলি। গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন জার্মান সাংবাদিক। স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বললেন। খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে তাদের অভিমত জানতে চাইলেন। এরপর গেলাম মনসা হয়ে বুধপাড়া পেরিয়ে পিঙ্গলা গ্রামে। হুলুস্থূল পড়ে গেলো। সাদা চামড়াধারী সাংবাদিক এসেছেন ওই অজ পাড়াগাঁয়ে। গ্রামটি আমার আগ থেকে চেনা। এক বাড়ির সামনে উঠোনে চেয়ার এনে দেয়া হলো। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে খবর দিতেই তিনি উপস্থিত। তার সাথে এবং স্থানীয় জনগণের সাথে জার্মান সাংবাদিক কথা বললেন। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে ফিরে চলি শহরের দিকে। সন্ধ্যেয় হোটেল আগ্রাবাদে ডিনার। আমিও আমন্ত্রিত। সেখানে দেখা সে সময়কার চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিন আহমদের। তার সাথে পরিচয় ছিল পেশাগত সূত্রে। এর আগে আমাকে জার্মান সাংবাদিক বলে রেখেছিল তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে। জিয়াউদ্দিন সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে বলি, ‘এবার তুমি ওনার অভিমত নিয়ে আলাপ করতে পারো।‘ ডেপুটি কমিশনারের সাথে আলাপ শেষে কাছে আসতেই তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তা কী বললেন এই সরকারি কর্মকর্তা ?’ মৃদু হেসে সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, আই এম নট গোয়িং টু টেল ইউ।‘ ডিনার শেষে হোটেল থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে ফিরে আসি সদরঘাট ডেইলি লাইফ অফিসে। তখন রাত প্রায় সাড়ে দশ। এরপর আর কোন যোগাযোগ হয়নি ওই জার্মান সাংবাদিকের সাথে। ক‘দিনের মাথায় দেখি জার্মান সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্র–পত্রিকায় বড় করে ছাপা হয়েছে প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে ভূয়সী প্রশংসা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খালখনন কর্মসূচির। প্রশংসা জিয়াউর রহমানেরও।
২) রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল কাটায় অংশ গ্রহণ করে দেশব্যাপী বেশ উৎসাহ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য ভালো কাজ বা ভালো উদ্যোগ শুরু হলেও, পর্যাপ্ত এবং সময়মত রক্ষণাবেক্ষনেণর অভাবে উদ্যোগের অপমৃত্যু ঘটে। তেমনটি ঘটেছিল এই খাল খনন প্রকল্পের, পরবর্তী সময়ে। নূতন সরকার এসে পুরানো সরকারের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক দশক পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার পিতার শুরু করা খাল খনন কর্মসূচি নুতন উদ্যোগ ও উৎসাহ নিয়ে শুরু করেছেন। বলা বাহুল্য, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আশা করবো এই প্রক্রিয়া চালু থাকবে যাতে এর সুফল সাধারণ জনগণের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। খাল খনন কর্মসূচি দেশের জন্যে কেন মঙ্গলজনক তা হল্যান্ডের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারবো।
৩) উত্তর পশ্চিম ইউরোপের দেশ, হল্যান্ডকে বলা হয় ঈড়ঁহঃৎু ড়ভ ঈধহধষং বা ‘খালের দেশ‘। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ডাচরা ভূমি উদ্ধার, পরিবহন, সেচ ও অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন এবং বন্যা প্রতিরোধের জন্যে গোটা দেশে খাল খনন করে আসছে। ‘পানির আর এক নাম যেমন জীবন‘, ঠিক তেমনি ‘খালের আর এক নাম হল্যান্ড‘। খাল না থাকলে হল্যান্ডের অস্তিত্বই থাকতো না। দেশটি অনেক আগেই পানির নিচে তলিয়ে যেত। এখনও হল্যান্ডের বেশির ভাগ অংশ সমুদ্রপৃষ্টের নিচে। হল্যান্ডের বিশাল অংশ উদ্ধার করা হয়েছে সমুদ্র থেকে। ডাচ স্বর্ণযুগে এই খালগুলি অভ্যন্তরীণ শহরগুলিকে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরগুলির সাথে সংযুক্ত করে বাণিজ্য ও নগর উন্নয়নে গতি এনেছিল। নৌ–বিহার থেকে শুরু করে প্রবহমান জলধারার–প্রান্তে ক্যাফে, রেস্টুরেন্টগুলি পর্যন্ত খালগুলি এ দেশের দৈনন্দিন জীবন ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। হল্যান্ডের প্রায় সব শহরেই খাল বহমান। আর তাতে রয়েছে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা। অনেক স্থানে খালের ধার ঘেঁষে রয়েছে ‘বোট হাউস‘ যেখানে অনেকেই নিয়মিতভাবে বসবাস করেন, আবার অনেকগুলি ভাড়ায় পাওয়া যায়। কেবল রাজধানী আমস্টারডামে রয়েছে এ ধরনের প্রায় ২৫০০টি ভাসমান বাড়ি। যাদের হল্যান্ড ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে, এমন কী যারা এদেশে কেবল পা দিয়েছেন তারাও দেখেছেন ডাচ সংস্কৃতি, পর্যটন ও অর্থনীতি সহ বহমান খালগুলি কীভাবে সমাজ ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ্লবাংলাদেশে যারা বলেন ‘খাল কেটে কুমির ডেকে আনা হবে‘ তারা যে কেবল সমালোচনার জন্যে সমালোচনা করেন তা বলা বাহুল্য। (সমাপ্ত) ০২–০৪–২০২৬
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।













