‘মানবতার ওপর বিশ্বাস হারানো উচিত নয়। মানবতা হলো সমুদ্রের মতো; সমুদ্রের কয়েক ফোঁটা নোংরা হলে সমুদ্র নোংরা হয় না’– মহাত্মা গান্ধী।
বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে (ইউক্রেন) প্রতিদিন যে হারে মানবতা লুণ্ঠিত হচ্ছে, নিরপরাধ মানুষ মরছে তাতে মহাত্মা গান্ধীর কথায় আর আস্থা ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে। অবস্থাদৃষ্টে পুরানো কথাটাই নতুন করে সত্যি মনে হয় যে, মানবাধিকার এবং অন্যায় ন্যায় বিচার দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় শক্তি দ্বারা। যত বড় বড় বুলি আওড়ানো হোক না কেন সত্যি এই, নগ্ন তরবারি এখনো কিং–মেইকার এবং কিং–কিলার। অন্য সকল তত্ত্ব মিথ্যা ও মরীচিকা মাত্র। বেশ কিছুদিন ধরে ইরানে চলছে আমেরিকা ও তার বিশ্বস্ত মিত্র ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ। চলছে ইরানের পাল্টা আক্রমণ। সে আক্রমণে মানুষ মরছে, ধ্বংস হচ্ছে দেশ, সভ্যতা। চারিদিক জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, আর এ পৃথিবী যেন ‘অবাক তাকিয়ে রয়’। বিশ্ব বিবেক যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। যেন নীরব দর্শক কিংবা গেছে নির্বাসনে। আন্তর্জাতিক নিয়ম–নীতি ও যুদ্ধ–নীতি কোনটাই মানা হচ্ছে না। হতে পারে ইরানের শাসকগোষ্ঠী তার জনগণকে চাপের মধ্যে রেখে তাদের উপর নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে কয়েক দশক ধরে। বিরোধী মতকে বুলেটে দাবিয়ে রেখেছে। কিন্তু ইরানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার থেকে নির্যাতিত ইরানিদের রক্ষা করার অজুহাতে বড় শক্তির এইভাবে বিশ্ব সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে অনেকটা যা ইচ্ছে তাই করে যাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত সে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমেরিকার এহেন এডভেঞ্চার যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি সহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ নিন্দা জানালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা আমলে নেননি। উল্টো ইরান আক্রমণে যুক্তরাজ্য আমেরিকার সঙ্গী হবার আহবানে প্রথমে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের কঠোর সমালোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরাক আক্রমণের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য যেভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, ঠিক তেমনি স্টারমারের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য এগিয়ে এসে ইরান আক্রমণে তার পাশে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু স্টারমার তেমনটি করেননি। অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতাদের মত তিনি মনে করেছিলেন এই আক্রমণ যুক্তিসঙ্গত নয় এবং এর প্রয়োজন ছিল না। আর তাই তিনি আমেরিকার অনুরোধে সাড়া না দিয়ে প্রথমে আমেরিকান যুদ্ধ বিমানগুলিকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি দেননি। তাতে ক্ষেপেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এতটাই ক্ষেপেছেন যে স্টারমারকে খাটো করে দেখানোর ছলে বলেন, ‘এটা তো আর উইনস্টন চার্চিল নয় যে আমরা তার মোকাবিলা করছি।’ এই বলে ট্রাম্প এটাই বুঝাতে চাইছেন যে স্টারমার চার্চিলের মত বড় রাষ্ট্রনায়ক নন। কথাটা হয়তো সত্যি। কিন্তু এভাবে এক রাষ্ট্রনায়ক আর এক মিত্র দেশের রাষ্ট্রনায়ককে আক্রমণ করাটা কোনোভাবেই শোভন নয়। তবে ট্রাম্প কোনও কিছুর ধার ধারেন না সে সবার জানা, আর তাই তার এমনতর মন্তব্যে কেউ খুব একটা অবাক হননি। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’–কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘ব্রিটেনের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিল সব চাইতে বেশি সুদৃঢ়। এখন দেখে দুঃখ লাগছে যে সম্পর্কটা আর আগের মত নেই।’
বিরোধী দল তো সব সময় তক্কে তক্কে থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। যুক্তরাজ্য সম্পর্কে ট্রাম্পের এই নেতিবাচক ও সমালোচনামূলক বক্তব্য লুফে নেয় ব্রিটিশ বিরোধী দল, কনজারভেটিভ পার্টি। স্টারমারের সমালোচনা করে বিরোধী রাজনীতিবিদরা বলেন, তিনি ইরানের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে তার ক্রোধের সৃষ্টি করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্ককে’ দুর্বল করে দিচ্ছেন। স্টারমারও সহজে ছাড় দেবার পাত্র নন। হাউস অব কমন্সে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের যে কোনো পদক্ষেপে সব সময় একটি আইনসম্মত ভিত্তি এবং একটি কার্যকর, সুচিন্তিত পরিকল্পনা থাকা উচিত।’ স্টারমার দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অবৈধ বলে মনে করেন এবং পাশাপাশি এও বলেছিলেন, তার সরকার আকাশ থেকে সরকার বা শাসন ব্যবস্থা (রেজিম) পরিবর্তনে বিশ্বাস করে না। তারপরও স্টারমারকে তার মত পরিবর্তন করতে হয়। কেননা দলের ভেতর–বাইরে থেকে বলা হলো ইরানকে ঘিরে স্টারমারের প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ মার্কিন–যুক্তরাজ্যের ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে বিপর্যস্ত করতে পারে। স্টারমার দেখলেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরান–আক্রমণকে অযৌক্তিক ও বিপজ্জনক অভিহিত করে নিন্দা জানালে ট্রাম্প স্পেনের সাথে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। তেমন ধরনের ঝুঁকি এড়ানোর জন্যে হলেও হতে পারে কিংবা বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে স্টারমার নিজ মত পরিবর্তন করে ইরানের ব্যালিসিটিক ক্ষেপণাস্ত্র ও তাদের সংরক্ষণাগারে আঘাত করার জন্যে ব্রিটিশ ও ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গর্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহারের জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দিলেন। তবে অন্যান্য লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত করতে নয়, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি ভুললেন না। স্টারমার বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রাথমিক হামলায় জড়িত না হওয়ার আমাদের সিদ্ধান্তের সাথে তার দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন। তবে ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থ কী তা বিচার করা আমার কর্তব্য।’ এই ধরণের কথাবার্তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প ও স্টারমার– এই দুই রাষ্ট্রনায়কের মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। মূলত বিগত কয়েক মাস ধরে এই দুই নেতার মধ্যে এক ধরণেনর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন তখন তার নিন্দা করেছিলেন কিয়ের স্টারমার। নিন্দা করেছিলেন ফ্রান্স, জার্মান সহ অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র নেতারা। তখন তীব্র প্রতিবাদের মুখে ট্রাম্প সরে আসেন গ্রিনল্যান্ড দখল করার বাসনা থেকে। এরপর ট্রাম্প ব্রিটেনের ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির আবাস্থল চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের চুক্তির নিন্দা করেছিলেন। যদিও তার প্রশাসন এর আগে এই চুক্তিকে সমর্থন করেছিল।
স্টারমারের দশা এখন অনেকটা ‘কুল রাখি না শ্যাম রাখির’ মত। ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবার কারণে ঘরে (যুক্তরাজ্যে) নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল বের হচ্ছে প্রায় সময়। ইরাক আক্রমণে আমেরিকার সাথে যাওয়া কতটা নৈতিক ও যুক্তিপূর্ণ ছিল এই নিয়েও সে সময় ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকার সমালোচনা উঠে এসেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন সরকার (ব্রিটিশ) জোটের বাধ্যবাধকতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি সংকীর্ণ পথ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের নীল মেলভিনের মতে, ব্রিটেনের অবস্থান ভূ –রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বয় সাধনের জন্যে একটি বৃহত্তর ইউরোপীয় সংগ্রামকে (স্ট্রাগল) প্রতিফলিত করে। মন্ত্রীপরিষদ মন্ত্রী জেমস মারে মনে করেন স্টারমার ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করছেন, তাকে সবদিক দেখে শুনে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। তিনি এই কথাও মনে করিয়ে দেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, দীর্ঘসনণর ভাঙন না ধরে সেই কথা মাথায় রেখে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। স্টারমারের সমালোচনা করে রক্ষণশীল নেতা কেমি ব্যাডেনোচ হাউস অফ কমন্সে বলেন, স্টারমারের মার্কিন–ইসরায়েলি আক্রমণের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করা উচিত ছিল। অন্যদিকে একই দলের আর এক আইনপ্রণেতা, গ্যারেথ বেকন প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনার প্রতি অস্পষ্ট এবং দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্যে অভিযুক্ত করেন। একটু দেরিতে হলেও স্টারমার সমর্থন দেয়ার পরও ট্রাম্প তাকে আক্রমণ করতে ছাড়েননি। ট্রাম্প বলেন, আমরা যখন অনেক দূর এগিয়ে গেছি তখন ব্রিটেন এগিয়ে এসেছে আমাদের সাহায্য করতে। ট্রাম্পের অভিযোগও উড়িয়ে দেবার নয়। কেননা অতীতেও কোনও সঠিক প্রমাণাদি ছাড়াই টনি ব্লেয়ার এগিয়ে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশের ডাকে। ট্রাম্প যদি তেমনটি আশা করে থাকেন তাহলে তাকে কি দোষ দেয়া যায়? ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির অভিযোগ খণ্ডন করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের যুক্তি, ব্রিটেন সহযোগিতা করছে না তা ঠিক না। কেননা তিনি মনে করেন আমেরিকান বিমানগুলি ব্রিটিশ ঘাঁটি থেকে কাজ করছে। আর এটাই হলো কার্যত দু–দেশের মধ্যেকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ এবং ব্রিটিশ জেটগুলি মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের যৌথ ঘাঁটিতে আমেরিকানদের জীবন রক্ষা করার জন্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ভূপাতিত করছে– এটিই কার্যত বিশেষ সম্পর্ক। আমাদের জনগণকে নিরাপদ রাখতে প্রতিদিন গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করছে– এটাই বাস্তবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’। মজার ব্যাপার হলো ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মনে করেন দু–দেশের সম্পর্ক ভালো হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ–মর্জির কথা সবাই জানে। কর্মকর্তাদের ধারণা ট্রাম্পের রাগ ক্ষণস্থায়ী। তার মেজাজের পরিবর্তন হতে পারে এবং তারা আশা করেন যে সর্বশেষ ঝড় কেটে যাবে। কেটে গেলেই ভালো। ভালো যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের জন্য। ভালো গোটা ইউরোপের জন্য।
লেখক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।










