ভেবেছিলাম এবারের সংখ্যায় ‘ডাচ রাজনীতি ও নুতন সরকার গঠন‘ নিয়ে লিখবো। কয়েক মাসের দীর্ঘ আলাপ–আলোচনা, দেন–দরবার, তর্ক–বিতর্কের পর সপ্তাহ দুয়েক আগে গঠিত হলো তিন দলীয় নতুন কোয়ালিশন সরকার। লেখা শুরুর কথা গতকাল দুপুরে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর। সেখানে যেতে হয়েছিল চোখ পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্যে। স্বল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতালে কাজটি সেরে বাসায় ফেরার পথে যে বিষয়টি নিয়ে লিখবো বলে ঠিক করেছিলাম তা নিয়ে না লিখে হাসপাতালের অভিজ্ঞতার কথাটাই পাঠকের সাথে ভাগাভাগি করবো বলে মনস্ত করলাম। এমন পরিবর্তন প্রায়শ ঘটে। অন্যের ক্ষেত্রে ঘটে কিনা জানিনে, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটে। ইদানীং হাসপাতাল ও ডাক্তারের সাথে আমার সখ্য বেড়েছে। মনে হয় বয়স যত বেড়ে চলেছে, তার চাইতে দ্রুত গতিতে হাসপাতাল ও ডাক্তারের সাথে সখ্য বেড়ে চলেছে। এ বুঝি বয়সের ধর্ম। একটা সময় দেশে ফিরে যাবার যে তীব্র আকুলতা ছিল বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা কমে আসে। এমন না যে ইচ্ছের কোন কমতি আছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সে ইচ্ছেয় ভাটা পড়ে। কেন, তা লিখছি একটু পর। তার আগে একটু ফিরে যাই অতীতে। হল্যান্ড এসেছি নব্বই সালের এপ্রিলের ৮ তারিখ। এর বছর খানেক পর দেশে গিয়েছিলাম কাজ নিয়ে। একানব্বই সালে দেশে যে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল তার রিলিফ ও পুনর্বাসন কাজ তদারকী করার জন্যে। গিয়েছিলাম ডাচ দাতা সংস্থা নভিব (বর্তমানে অক্সফাম–নোভিব) এর পক্ষ হয়ে। মাস খানেক ছিলাম সেবার দেশে। তখন আমি দৈনিক আজাদীতে নিয়মিত লেখা শুরু করেছি। লেখা পাঠাতাম অগ্রজ ও গুণী সাংবাদিক, সাহিত্যিক অরুণ দাশ গুপ্তের কাছে। এক সকালে রিক্সা নিয়ে আজাদী অফিসের সরু গলিতে ঢুকছি। এমন সময় দেখি উল্টো দিক থেকে আর এক রিক্সায় অরুণদা এগিয়ে আসছেন। কাছাকাছি আসতেই উঁচু গলায় বলে উঠলেন, ‘আরে একী, কখন এলে ভাই?’ উত্তরে বললাম, ‘দিন কয়েক হলো, তবে একেবারের জন্যে চলে আসবো।‘ আমার উত্তর দেবার সাথে সাথে প্রতিউত্তর এলো তার দিক থেকে, অনেকটা সাবধানী পরামর্শ। বললেন, ‘ওই কাজটা ভুলেও করোনা।‘ তার রিকশার গতি দ্রুততর হলো। তিনি চোখের আড়াল হলেন। আমার রিকশা এগিয়ে আজাদীর সিঁড়ির নিচে গিয়ে থামে। আমার লক্ষ্য সম্পাদক জনাব এম এ মালেক। অরুণদার দেশে ‘একেবারের জন্যে ফিরে না আসার‘ সেই সাবধানবাণী সে সময় খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। হল্যান্ড আসার আগে ঠিক করে রেখেছিলাম ‘দেশে ফিরে যাবোই‘, বড়জোড় বছর পাঁচেক থাকা, ঘুরে ঘুরে ইউরোপ দেখা, তারপর ঘরের ছেলের ঘরে ফিরে যাওয়া। কিন্তু সেটি হলো না। কথায় আছে– ‘ম্যান প্রপোজেস বাট গড ডিস্পোজেস‘, অর্থাৎ মানুষ চায় এক কিন্তু উপরওয়ালা ঠিক করে রাখেন ভিন্ন কিছু। অরুণদাকে বলা যে কথা – পাঁচ বছর পর ফিরে আসবো– তার আর হলো কই ! সাত সাতটি পাঁচ–বছর পিছু ফেলে এসেছি ইতিমধ্যে। দেশে ফি–বছরই যাওয়া হয়, কখনো দুবার, কখনো একবার, কখনোবা তিনবার। কিন্তু ওই যে অরুণদাকে বলা ‘একেবারের জন্যে ফিরে আসবো‘ তা এখন তক হলোনা। সামনের দিনগুলিতে হবে সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখিনে। তার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, এদেশের অতি উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিৎসক আর হাসপাতাল।
বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপে যারা আসেন, স্থায়ী বসত গাড়েন দেখা যায় একটা বয়সে পৌঁছে তাদের আর দেশে ফিরে যাওয়া হয়না। অথচ তারা যখন ইউরোপ–আমেরিকা–কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি অতি উন্নত দেশে আসেন, তখন মনের মধ্যে এই ইচ্ছেটাই লালন–পালন করেন যে একদিন তারা ফিরে যাবেন ফেলে আসা দেশে, অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে উঠা দেশে। প্রবাসে এসে তারা বেশি করে টের পান মায়ের টান, নাড়ির টান। দেশে ফেলে আসা নিকটজন, দেশের গল্প, গ্রামের মেঠো পথ, খাল–বিল, নদী, সবুজ শস্যক্ষেত্র, পাখির কলতান, এমনকী যানবাহনের লাগামহীন চলা, যানজট, কর্ণবিদীর্ণ হর্ন, মানুষের ভিড়, রাজনীতি, অনিয়ম – সবকিছু তাদের এক অদ্ভুত ভালো লাগায় টানে। মন বলে ফিরে যাবো, ফিরে যাবো। ফেরা হয়না। এই ‘ফিরে যাবো‘ কথাটা প্রায়শ বলতে শুনেছি হল্যান্ডের হাতেগোনা প্রথম কয়েক বাংলাদেশির একজন, সুনীল কান্তি বড়ুয়াকে, হল্যান্ডে সবার পরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন বড়ুয়াদা। তিনিই প্রথম বাংলাদেশী যিনি পুরো পরিবার নিয়ে স্থায়ী বসত গেড়েছিলেন উত্তর পাড়ের এই দেশে। তিনি বলতেন ছেলে–মেয়ে সবাই থিতু হয়ে বসলে ফিরে যাবো দেশে। একটা সময় সবাই যখন থিতু হয়ে বসলো, তখন তিনি ফিরে যাবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। কিন্তু শরীর বেঁকে বসে। ততদিনে ডাক্তার আর হাসপাতালের সাথে তার সখ্য বেড়েছে। নিকটজনেরা বলে, দেশে এখানকার মত চিকিৎসা পাবেননা। এদেশে সবকিছু হাতের কাছেই। ডাক দিলেই চলে আসে ডাক্তার, আসে এম্বুলেন্স। এদেশে সবকিছু চলে নিয়ম আর ঘড়ির কাঁটা ধরে। সবার বড়ুয়াদা একটা সময় দেশে ঠিকই গেলেন। তবে কফিনে বন্দী হয়ে।
ফিরে আসি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে। দুপর দুটোয় ছিল হাসপাতালে এপয়েন্টমেন্ট। সপ্তাহ দুয়েক আগে হাসপাতাল থেকে ফোন করে দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছিল। সময় মেনে চলা আমার বরাবরের অভ্যেস। চেষ্টা করি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই উপস্থিত থাকতে। এখানে সবকিছু চলে ঘড়ির কাঁটা ধরে সে কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। বাসা থেকে খুব একটা দূরে নয় হাসপাতাল। এপয়েন্টমেন্টের মিনিট পনের আগে পৌঁছে যাই। চমৎকার হাসপাতাল। যেন কোন আধুনিক হোটেল। রিভলভিং পুরু–কাচের দরোজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বাদিকে রেস্টুরেন্ট। সেখানে হাসপাতালে আসা রোগী, তাদের সাথে আসা লোকজন বসে আছে, কেউ খাচ্ছে, কেউ অপেক্ষায়। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সদেরও কেউ কেউ সাদা এপ্রোন পড়নে চা–কফি, সফট ড্রিংকস, স্ন্যাকস কিনে পাশেই তাদের নির্দিষ্ট কামরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডানদিকে রিসেপশন, তার পাশে সারিবদ্ধ আট দশটি অটোমেটিক মেশিন। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার কোন প্রয়োজন নেই। তারপরও যদিও কোন পরামর্শ বা সাহায্য লাগে তার জন্যে সেখানে বিশেষ ড্রেস পড়ে দাঁড়িয়ে আছে জনা চারেক পুরুষ–মহিলা কর্মী। মেশিনের পর্দা স্পর্শ করতেই ভেসে উঠে কয়েকটি শব্দ – ‘ইংরেজি না ডাচ ভাষা‘। পছন্দ মাফিক সুইচ চাপ দিলে বলা হলো, মেশিনে আপনার পাসপোর্ট, আইডি বা ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড রাখুন। তখন ভেসে উঠে নির্দেশনা– কখন, কটায়, কোন ডাক্তার এবং কোন কামরায় আপনার এপয়েন্টমেন্ট। সে মোতাবেক এগিয়ে যাই নির্দিষ্ট কামরার সামনে। সেখানে সারিবদ্ধ কিছু চেয়ার। সেখানে বসে আছেন তিন চার রোগী। আমার হাতে তখনও মিনিট দশেক বাকি। এমন সময় ছোট্ট ট্রলিতে চা–কফি নিয়ে এগিয়ে এলো হাসপাতালের এক কর্মী। কাছে এসে জানতে চাইলে, চা কফি কিছু খাবো কিনা। আমাকে জিজ্ঞেস করতেই হ্যাঁ বলতে যাবো, ঠিক তখন সামনের দরোজা খুলে আধবয়েসী এক মহিলা, পরনে সাদা ড্রেস, আমার নাম ধরে ডাকলেন। যে কর্মচারীটি চা–কফি নিয়ে এসেছিল তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, খেতাম, কিন্তু আমার ডাক পড়েছে। সে ডাচ ভাষায় ‘নো প্রব্লেম‘ বলে অপেক্ষমাণ অন্যান্যদের দিকে এগিয়ে যায়। হল্যান্ডের অনেক হাসপাতালে এই ধরনের ফ্রি–সার্ভিস রয়েছে যা ইউরোপের খুব কম দেশেই রয়েছে বলে জানি। যাই হোক, ভেতরে গেলাম। মহিলা একটি মেশিনে থুতনি রাখতে বললেন। তার আগে তিনি একটি টিস্যুতে ডিসইনফেকশন জেল লাগিয়ে মুছে দেন।সামনের দেয়ালে অক্ষরগুলি পড়তে বললেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখের পরীক্ষা শেষে পেছনের দরোজা খুলে মহিলা হাতের ইশারায় বললেন, ‘বাঁ দিকে ২৪ নম্বর দরোজার সামনে গিয়ে অপেক্ষা করুন। সেখানে আপনার চোখের স্ক্যান হবে।‘ তখনও আমার নির্দিষ্ট সময়ের আরো মিনিট তিনেক বাকি। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের আর এক কর্মী যিনি স্ক্যান করবেন দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ডাকলেন। ডাচ ভাষায় ‘গুড আফটারনুন‘ বলে চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলে বললেন, ‘সরি, একটু অপেক্ষা করতে হলো আপনাকে‘। উত্তরে বলি, দুঃখিত হবার কোন কারণ নেই, আমি তো নির্দিষ্ট সময়ের আগে এসেছি।‘ স্ক্যান করার পর বললেন, ‘ডাক্তার আপনাকে আগামীকাল সকালের দিকে ফোন করে রিপোর্ট সম্পর্কে অভিহিত করবেন।‘ এমন সুন্দর ও বন্ধুসুলভ ব্যবহারে মনটা আপনাতেই ভালো হয়ে এলো। এই ভালো–ব্যবহারটুকু দেশে অনুপস্থিত। সর্বসাকুল্যে মিনিট দশেকের মধ্যে চোখ পরীক্ষা, স্ক্যান সব হয়ে গেল। কত সহজে কাজটি কত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। আজ যখন এই লেখার বাকী অংশ শেষ করতে বসেছি তখন ফোন এলো ডাক্তারের। গতকালের স্ক্যান রিপোর্ট সম্পর্কে বললেন। জানালেন চোখের জন্যে তিনি একটি ড্রপ লিখে দিয়েছেন এবং অনলাইনে প্রেসক্রিপশন ফার্মেসিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আজ সন্ধ্যায় ঔষধ আমার বাসায় পৌঁছে যাবে সে কথাটিও বললেন। এমনটি এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা। হল্যান্ডের মত সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার দেশগুলিতে নাগরিকের তাবৎ সুযোগ–সুবিধা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। দিয়েছে নিশ্চয়তা, দিয়েছে নিরাপত্তা। ফেলে আসা দেশে অনেক কিছু হয়তো আছে, কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার যে কী করুণ দশা সে নুতন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে সামর্থ্যবানরা যান বিদেশে, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা ইউরোপ আমেরিকায়। যারা কম সামর্থ্যবান তারা যান ভারত। দেশে কয়েকটি উন্নতমানের হাসপাতাল আছে বটে। কিন্তু সে সাধারণ জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। পত্র–পত্রিকায় দেখি ভুল চিকিৎসা, নকল ঔষধের ছড়াছড়ি। আর এই সমস্ত সংবাদ শুনে প্রবাসে যাদের স্থায়ী বসবাস তাদের ভয়, শঙ্কা বাড়ে। দেশে ‘একেবারের জন্যে‘ ফিরে যাবার প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা ফিরে যেতে ভয় পান। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাব তাদের ইচ্ছের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অনেকের এই কারণে আর দেশে ফিরে যাওয়া হয়না। যেমনটি হয়নি হল্যান্ডের বড়ুয়াদার। বয়স বেড়ে চলেছে। এখন একটি প্রশ্নই কেবল মনের ভেতর ঘুরপাক খায়– দেশে ফিরে যাবো? না যাবো না? (৪–৩–২০২৬)।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।












