‘তুমি যদি কারো সাথে এমন ভাষায় কথা বলো যা সে বোঝে, তাহলে সেটা তার মাথায় যাবে, আর তুমি যদি তার সাথে তার ভাষায় কথা বলো, তাহলে সেটা পৌঁছুবে তার হৃদয়ে’– নেলসন ম্যান্ডেলা
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের তথা গোটা বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাসের একটি অন্যতম ‘মাইলস্টোন‘। ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এগিয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে এবং তার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে বাঙালির ওপর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারই সূত্র ধরে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।‘ তীব্র প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল তরুণ ছাত্র সমাজ। জীবনকে বাজি রেখে রাস্তায় নেমে পড়েছিল ছাত্র–আপামর জনতা। অকাতরে প্রাণ দিলো মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। অবশেষে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মর্যাদা পেলো। কিন্তু সে কাগজে কলমে। বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন সেখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৭১ সালে অর্জন হলো অনেক রক্ত, নির্যাতন আর অত্যাচারের বিনিময়ে প্রাণের স্বাধীনতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির। স্বাধীনতার প্রকৃত ফসল স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। ঘুঘু এসে বারবার ফসল খেয়ে গেছে। স্বাধীনতা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। মনে পড়ে কবি রবার্ট ফ্রস্টের লেখা, ‘আই হ্যাভ প্রমিজেস টু কীপ /এন্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ / এন্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।‘ আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের স্বপ্নকে। একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যে অধ্যায়ের উপর ভর করে বাঙালি জাতি তার জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘ভাষা হলো মানুষের চিন্তার প্রতিফলন, আর বাংলা ভাষা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ভাষার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের চিন্তা ও অনুভূতি সৃষ্টিশীলভাবে প্রকাশ করে। ভাষা মানুষের মনের দরজা খুলে দেয়, বাংলা ভাষা সেই দরজার চাবিকাঠি।‘
বাস্তবিক তাই! মনের কথাটি মনের মত করে বলতে গেলে তার একমাত্র বাহন মায়ের ভাষা। আমাদের ক্ষেত্রে সে বাংলা। কিন্তু বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটতে দেখি অনেক সময়। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আমরা ইংরেজির দিকে ঝুঁকে পড়ি। অনেক সময় যুগের চাহিদা, বাস্তব পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ ইত্যাদির কথা বলে বাংলাকে একপাশে রেখে ইংরেজি ভাষার উপর ভর করি। কিন্তু আমাদের অনেকের কাছে ইংরেজি যেন কুলীন বা অভিজাত ভাষা। এই মনোবৃত্তি তরুণ বয়সে আমাদের কারো কারো মধ্যে প্রকটভাবে ছিল। মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমাদের সাথে পড়তো চাটগাঁর ছেলে ফরিদ। তার নাদুস–নুদুস শরীর। কথা বলে উচ্চস্বরে। সে প্রয়োজনে–অপ্রয়োজনে ইংরেজি বলতো। ক্লাসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিতে সহপাঠীদের সাথে ইংরেজি বলা সে ঠিক আছে। আফটার অল ইংরেজির ছাত্র। কিন্তু এর বাইরে কেন? যদি হতো ইংরেজি চর্চার জন্য সে মেনে নেয়া যায়, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তাকে এই নিয়ে কিছু বললে সে গর্ব ভরে উত্তর দিতো, ‘আমরা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। দেখিস না সবাই কেমন করে আমাদের দিকে তাকায়।‘ অর্থাৎ তার কাছে ইংরেজিতে কথা বললে অন্যে কীভাবে বিচার করে সেটাই বিচার্যের বিষয়। এই লোক– দেখানো বা অন্যকে ‘ইমপ্রেস‘ করার জন্য অনেককে যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও ইংরেজিতে কথা বলতে দেখা যায়। বিরক্তিকর লাগে যখন দেখি ভুল ইংরেজি কিংবা ভুল উচ্চারণে যখন কেউ ইংরেজি বলে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হককে টেনে আনা যেতে পারে। তাকে কাছ থেকে দেখা, মেশার সুযোগ হয়েছিল। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম থেকে অফসেটে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি দৈনিক, ‘ডেইলি লাইফের‘ সহযোগী সম্পাদক। বাংলায় তো বটেই, সমানভাবে তিনি পারদর্শী ছিলেন ইংরেজিতে। তার ইংরেজি লেখার মান বিচার করার মত যোগ্যতা আমার নেই। তবে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসাবে নিঃসন্দেহে বলতে পারি এই ক্ষেত্রে দেশে তার সমকক্ষ তেমন একটা বেশি ছিল না। ডেইলি লাইফে তার অধীনে কাজ করার সুবাদে কাজের বাইরে তার সাথে এখানে–ওখানে কখনো–সখনো গেছি। কিন্তু কোনদিন তার কাছ থেকে একটি ইংরেজি শব্দ শুনিনি। তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি। মনে আছে একবার তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম ঢাকায় ইত্তেফাক ভবনে। চাটগাঁ ছেড়ে তখন তিনি নিউ নেশন পত্রিকায় কাজ করছেন। এক সন্ধ্যায় দু–সাংবাদিক বন্ধু সহ গিয়েছিলাম তার সাথে দেখা করতে। তখন আমি চাটগাঁ ছেড়ে ঢাকায় সাংবাদিকতা করছি। আলাপের ফাঁকে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমি হলাম মনে–প্রাণে বাঙালি। অথচ জীবনের প্রয়োজনে সারাজীবন একটা ইংরেজি দৈনিকের এক কোণায় বসে থাকতে হলো।‘ চিন্তায় ও মননে বাঙালি হয়ে এবং বাংলায় অবিশ্বাস্য দখল থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞ এই সাংবাদিককে পেশা হিসাবে বেছে নিতে হয়েছিল ইংরেজি সাংবাদিকতা। এ কেবল বাঁচার প্রয়োজনে। সেটি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় তার কথায়। তাতে এক ধরনের হতাশা ও আত্মসমর্পণ। এবার আসি নিজের কথায়। স্কুল বয়স থেকে বাংলায় লেখালেখির চর্চা ছিল, লিটল ম্যাগজিন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিচিত্রা সহ বিভিন্ন পত্র–পত্রিকায়। ইচ্ছে ছিল বাংলা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম এবং টিকেও গেলাম। কিন্তু শেষমেশ বেছে নিতে হলো ইংরেজি সাহিত্য। জীবনের প্রয়োজনে। বাবা বললেন, ক্যারিয়ারের জন্য ইংরেজি দরকার। কিন্তু তাই বলে, বাংলাকে একপাশে রাখিনি কখনো। হল্যান্ড যখন এলাম, তখন শুরু থেকে দৃঢ় প্রত্যয় ছিল এদেশে জন্ম ও বেড়ে উঠা আমার সন্তানদের বাংলা শেখাবো। তাতে প্রচেষ্টা ছিল। কন্যা সপ্তর্ষির যখন কথা বলার বয়স হয়নি তখন থেকে গাড়ির মধ্যে বাংলা গান বাজাতাম, যাতে শুনতে শুনতে কিছু শব্দ জানা হয়, শেখা হয়। বাসায় ওর সাথে বাংলা বলতাম। তখন ইউটিউব ছিলনা, মোবাইল ছিলনা। কম্পিউটারে টাইপ করার পর প্রিন্ট করে ছড়ার–বই বানিয়ে ওকে ছড়া শিখিয়েছি, সেই শিশু বেলায়। এখন সে অনেক বড় হয়েছে। তার ছোটজন, অতীশ সেও এখন অনেক বড়। দুজনেই বাংলা বলে। হল্যান্ডে ভাষাগত বৈরি অবস্থায় থেকেও তারা বাংলা শিখেছে। তা যদি না হতো তাহলে আমার অনেক ব্যর্থতার মধ্যে এই ব্যর্থতার গ্লানি বড় হয়ে বাজতো আমার বুকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন গ্লানি হয়না প্রবাসী অনেক মা–বাবার। কেবল ইংরেজি কেন পর–ভাষা যত বেশি জানা যায় ততই ভালো। তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। কিন্তু তাই বলে মায়ের ভাষাকে এড়িয়ে কিছুতেই নয়।
বাংলা ভাষার চর্চা হল্যান্ডে প্রবাসীদের মধ্যে, বিশেষ করে এখানে জন্ম নেয়া ও বড় হওয়া সন্তানদের মধ্যে খুব একটা চোখে পড়েনা। কেউ কেউ অজুহাত হিসাবে বলে, ‘এদেশে বাংলা বলার সুযোগ নেই। ঘর থেকে বাইরে পা দিলেই তো ডাচ বা ইংরেজি। বাসায় যদি বাংলা বলি তাদের ডাচ ভাষা দুর্বল হবে‘ ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা এমন অজুহাত দেখায় তাদের বলি, তোমরা যদি চাও যে তোমাদের সন্তানেরা ডাচ বা ইংরেজি না শিখুক, তারপরও তা তারা এমনিতেই শিখবে, স্কুলে গেলে। তবে ভুলে যাবে তোমার ভাষা, তোমার মায়ের ভাষা। এখানে জন্ম নেয়া ও বড় হয়ে উঠা ছেলে–মেয়েদের এই যে বাংলা বলতে না–পারা সেজন্যে আমি তাদের দোষ দেইনা। ‘চ্যারিটি বিগিন্স এট হোম‘ বলে কথা আছে। ঘরেই যদি বাংলা চর্চা না থাকে সন্তান তো ‘মা‘-কে মা না বলে ‘মামী‘ বা মাম/মম‘ ডাকবে এবং বাবাকে ‘পাপ‘, ‘পা‘ বা ”ড্যাডি‘ তো ডাকবেই। অনেককে আবার দেখি সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে সন্তানদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলাকে ‘গর্বের’ বিষয় হিসাবে দেখাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে। এই সব নিয়ে কথা বলতাম বিধায় আমার নিকট আত্মীয়দের কেউ কেউ বিষয়টি খুব একটা পছন্দ করতো না। আড়ালে–আবডালে বলতো, ‘বাংলা নিয়ে ও একটু বেশি বেশি করে‘। সে যাক –
বাংলা কি তার সঠিক অবস্থানে আছে? আমরা কি পেরেছি বাংলা ভাষাকে যথাযথ মর্যাদার আসন দিতে? এক কথায় বলা যায়, না, পারিনি। ‘একুশ‘ এখন অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে বললে কি খুব দোষের কিছু হবে? আমরা সেজেগুঁজে, মাথায় ফুল গুঁজে, ব্যানার নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি ‘গাইতে গাইতে এগিয়ে যাই শহীদ মিনারের দিকে, বেদীতে ফুল দেই, ঘটা করে ছবি তুলি, একা বা দলবেঁধে, তারপর ফেইসবুক। একুশ গিয়ে বাইশ এলো তো সব গেলাম ভুলে। বায়ান্ন থেকে একাত্তর, একাত্তর থেকে আজ অবধি অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলা কতদূর এগিয়েছে? সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে আমরা কতটা এগিয়েছি? শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ভাষার অবস্থান কী? যে ভাষার জন্যে আন্দোলন হলো, যে আন্দোলনে আবর্তিত হয়ে দেশ স্বাধীনতার মুখ দেখলো সে–দেশে দুঃখজনকভাবে বাংলা ভাষা এখনো অনেকটা ‘স্বদেশে পরবাসীর‘ মতো। সরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। সংস্কৃতি অঙ্গনের দশা তো আরো ভয়ংকর। আজকাল দেশে প্রতিটি বিয়ে, বৌভাত, গায়ে হলুদ, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে হিন্দি ছায়াছবির গান ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায়না। হিন্দি গানতো আছে, সাথে নাচ। কিছু কিছু নাচ দেখে তো মনে হয় পেটে বা কোমরে ব্যথা উঠেছে। বিদেশী সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি, বিদেশী পোশাক আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতিকে গিলে খাচ্ছে। কেবল কি দেশে? প্রবাসের প্রতিটি সামাজিক অনুষ্ঠানে হিন্দি গান, হিন্দি গানের সাথে নাচ থাকতেই হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাংলা গেছে আন্দামানে, নির্বাসনে। সেদিন এমনি এক সামাজিক অনুষ্ঠানে এই কথাটি বলছিলাম। যাকে বলছিলাম তিনি নিজেও সংস্কৃতিমনা, গান করেন। মঞ্চে হিন্দি গানের সাথে নাচ করছিল এক ঝাঁক পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে–মেয়ে, কিশোর–কিশোরী। সবাই বাংলাদেশী। ভদ্রলোকের সন্তানও সেই দলে আছে। তাকে বললাম, আপনি থাকতে বাংলা গান অনুপস্থিত কেন? কথাটা তার খুব একটা পছন্দ হলো বলে মনে হলোনা। আমি আর কথা বাড়ালাম না।
বাংলা ভাষাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি লাইন দিয়ে শেষ করবো আজকের লেখা। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা আমাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার অঙ্গ। ভাষার শক্তি মানুষকে প্রেরণা দেয়, বাংলা ভাষা সেই প্রেরণার উৎস।‘ সে আমরা দেখতে পাই বায়ান্ন থেকে একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












