হল্যান্ড থেকে

'এপস্টিন কেলেঙ্কারি' ঘিরে যুক্তরাজ্য সরকার বিপর্যস্ত: প্রধানমন্ত্রী স্টারমার আপাতত গদি রক্ষা করলেন

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

অপরাধ করেছেন কুখ্যাত যৌনকেলেঙ্কারি সম্রাট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, জেফ্রি এপস্টিন। তার এই যৌন কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক, রাজ পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে ধনকুবের। যাদের নাম নানা আলোচনা ও এই পর্যন্ত প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ রাজা চার্লসের সহোদর ডিউক অব ইয়র্ক প্রিন্স এন্ড্রু , ভূতপূর্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড ম্যান্ডেলসন সহ আরো অনেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও এই তালিকায় উঠে এসেছে বলে প্রকাশ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লেবার দলীয় প্রধান স্যার কিয়ের স্টারমার এই কেলেঙ্কারি কিংবা জেফরি এপস্টিনের ধারে কাছেও ছিলেন না। অথচ এই ইস্যু নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। কদিন আগেও তার প্রধান মন্ত্রিত্ব যায় যায় দশা। তার অপরাধ তিনি তার কাছের লোক, প্রভাবশালী ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড পিটার বেঞ্জামিন ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। নিয়োগ দেয়া কোন দোষের নয়, কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ম্যান্ডেলসনের কেলেঙ্কারি সম্পর্কে জানা সত্বেও তিনি তাকে এই নিয়োগ দিয়েছিলেন। অবশ্য পরে প্রধান মন্ত্রী বলেন, ম্যান্ডেলসন তাকে মিথ্যা বলেছেন। এপস্টিনের কাছে লেখা চিঠি পরীক্ষা করে যখন দেখা যায় যে ম্যান্ডেলসন এই কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন, তখন স্টারমার তার বিশ্বাসভাজন ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন। সাবেক প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের শাসনামলে লর্ড ম্যান্ডেলসেন মন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৯২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, ২০০৮ সালে এক নাবালকের সাথে যৌন সম্পর্কের জন্য প্ররোচনার অভিযোগে এপস্টাইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এবং জেল খাটার পরও লর্ড ম্যান্ডেলসন এই কুখ্যাত সেক্স অফেন্ডারের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন। সরকার থেকে দাবিকে করা হয় যে তাকে (ম্যান্ডেলসন) যখন নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তখন এই কেলেঙ্কারির ঘটনা জানা ছিলনা। কিন্তু ম্যান্ডেলসনের এই প্রথম পদস্খলন নয়। গেল বছর একই কারণে আমেরিকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়লে লর্ড ম্যান্ডেলসন নিজে দলীয় সাধারণ সম্পাদককে চিঠি দিয়ে দলের সদস্যপদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানান। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘সপ্তাহান্তে জেফরি এপস্টিনকে ঘিরে সৃষ্ট ক্ষোভের সাথে আমিও যুক্ত হয়ে পড়েছি। এই নিয়ে আমি দুঃখিত ও অনুতপ্ত।ব্যাপারটা এখানে হয়তো শেষ হতে পারতো। কিন্তু বিরোধী দল এই সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন।

বিরোধী দল ছাড়াও নিজ দল (লেবার পার্টি) থেকে কোন কোন নেতা তার পদত্যাগ দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত স্যার স্টারমার কোনভাবে টিকে যান। স্টারমারের ভাগ্য ভালো। কিন্তু কপাল মন্দ প্রিন্স এন্ড্রুর। এই কেলেঙ্কারির সাথে সম্পৃক্ততার কারণে ব্রিটিশ রাজা চার্লস তার সহোদর প্রিন্স এন্ড্রু থেকে কেড়ে নিলেন রাজকীয় সমস্ত খেতাব ও সামরিক সম্মাননা। প্রিন্স এন্ড্রুকে যে কেবল রাজকীয় ও সামরিক খেতাব ত্যাগ করতে হলো তা নয়, তাকে ত্যাগ করতে হলো লন্ডনের পশ্চিমে উইন্ডসর এস্টেটে অবস্থিতি তার ৩০ কক্ষ বিশিষ্ট প্রাসাদও। প্রিন্স এন্ড্রু যৌন কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করার জন্যে ২০২২ সালে এপস্টিনের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগকারী নারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রেকে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছিলেন, যদিও বা নিজের দোষ স্বীকার করেননি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা।

মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় নাগরিক ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ায় নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। ঘটনাটি যতদূর গড়িয়েছে হয়তো তা হতোনা যদি ভার্জিনিয়া জিউফ্রের মৃত্যুর পর তার একটি আত্মজীবনী প্রকাশ না পেতো। জিউফ্রে তাতে লিখেছেন, প্রিন্স এন্ড্রুর সাথে তার তিনবার যৌন সম্পর্ক হয়েছে। এর মধ্যে দুবার হয় যখন তার বয়স ছিল সতেরো। এপস্টিনকে ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় ১৮ বছরের কম বয়সী একজনের সাথে যৌন সম্পর্ক করার চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যৌনপণ্য পাচারের মামলায় বিচারাধীন থাকাকালে এপ্সটিন ২০০৯ সালে নিউয়র্কের কারাগারে আত্মহত্যা করেন। এদিকে এপ্সটিনের সাবেক প্রেমিকা ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছরের কারাদন্ড ভোগ করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি চার কিশোরীকে যৌন কাজে নিয়োগ ও পাচারের উদ্দেশ্যে এপস্টিনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এতো গেল সংক্ষেপে যৌন কেলেঙ্কারির কথা। ফিরে আসি ব্রিটিশ রাজনীতিতে।

এপস্টিন যৌন কেলেঙ্কারিকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ রাজনীতি উত্তপ্ত। এর জের ধরে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের শীর্ষ সহযোগী, চিফ অফ স্টাফ ৪৮ বছরের মরগান ম্যাকসুইনি। চলতি সপ্তাহের রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ভালোভাবে চিন্তা করার পর আমি সরকারের পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ দানের জন্য আমি প্রধান মন্ত্রী স্টারমারকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। এই পরামর্শের পুরো দায় আমিই নিচ্ছি।এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে লেবার দলীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা স্যার ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ দেবার জন্যে মরগ্যানকে দায়ী করেছিলে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সময় লর্ড ম্যান্ডেলসনের অতীত কর্মকান্ড যথাযথভাবে যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। দলের কোন কোন সদস্য প্রধান মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। একই দাবি করেন স্কটল্যান্ডের লেবার দলীয় নেতা আনাস সারওয়ার। সারওয়ার বলেন, ‘এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে হবে এবং ডাউনিং স্ট্রিটের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে হবে।সারওয়ার হলেন স্কটল্যান্ড লেবার পার্টির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি যিনি স্টারমারকে পদত্যাগের জন্যে বলেন। তিনি স্বীকার করেন যে আগামী মে মাসে স্কটল্যান্ডের আধাস্বায়ত্তশাসিত সংসদ নির্বাচনে লেবার পার্টির সম্ভাবনা রক্ষা করার জন্য তিনি এই আহ্বান জানান।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে স্টারমারকে বুঝি এই যেতে হয়। কিন্তু না, তাকে রক্ষা করলেন তার মন্ত্রী পরিষদ। মন্ত্রীরা একে একে তার প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেয়া শুরু করলেন। স্টারমারের পক্ষে প্রথম এগিয়ে আসেন প্রাক্তন উপ প্রধান মন্ত্রী ও লেবার দলীয় সিনিয়র সদস্য, এঞ্জেলা রেনা। ইক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘স্টারমারকে তিনি সমর্থন না করলেও (এই কেলেঙ্কারির) সব চাইতে খারাপ প্রতিক্রিয়া হবে দলীয় রাজনীতি বা দলগতখেলা খেলা।তিনি আরো বলেন, ‘আমি আমার সমস্ত সহকর্মীদের এক হওয়া, আমাদের মূল্যবোধগুলি মনে রাখার এবং একটি দল হিসাবে সেগুলি বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য অনুরোধ করছি। আর সেই লক্ষ্যে আমাদের পরিচালিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।তার এই বার্তা বলা চলে বাঁচিয়েছে প্রধান মন্ত্রী স্টারমারকে। এঞ্জেলার এই ইক্সবার্তার কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রায় সকল মন্ত্রী স্টারমারের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং জনগণকে স্টারমারকে একটি সুযোগ দেবার আহ্বান জানান। কর্ম ও পেনশন সচিব প্যাট ম্যাকফ্যাডেন বলেন, তিনি আশা করেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকবেন। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের সচিব ডগলাস আলেকজান্ডার বলেন, তিনি আনাস সারওয়ারের অবস্থানকে সম্মানকরেন, তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ‘সমর্থন’ করেন।

স্টারমার বেঁচে গেলেন। তার শেষ রক্ষা হলো। তবে স্বপ্ন সফল হলো না ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের। অনেকে ধরে নিয়েছিলেন যে স্টারমার লর্ড ম্যান্ডেলসনের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তাতে তার শেষ রক্ষা হবেনা এবং সেই মুহূর্তে প্রায় ডুবেযাওয়া তরীকে সামাল দিতে হাল ধরবেন এই সিনিয়র লেবার দলীয় নেত্রী। তার মাবাবা পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দা, জন্ম ১৯৮০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে। ২০১০ সালে বার্মিংহ্যাম লেডাউড আসন থেকে এম পি নির্বাচিত হয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম নারী সাংসদ হিসাবে ইতিহাস গড়েন। যাই হোক, মন্ত্রী পরিষদের শক্ত সমর্থন পেয়ে প্রধান মন্ত্রী গা ঝাড়া দিয়ে উঠেন। তার প্রতি সমর্থনের জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই। জনগণ আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন দেশের সেবা করতে।মাত্র দেড় বছর হলো তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। এখনো আর সাড়ে তিন বছর বাকি পরবর্তী নির্বাচনের। এখন দেখার বিষয় তিনি কতদিন তার পদে আসীন থাকতে পারেন এবং ব্রিটিশ জনগণের সেবা করতে পারেন।

এবার দেখা যাক এপস্টিন যৌন কেলেঙ্কারি নিয়ে অতলান্তিক পাড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী ঝড় বইছে। শুরুতে বলেছি এপস্টিনকান্ডে আমেরিকার অনেক রাঘববোয়াল জড়িত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। উভয়েরই এপস্টিনের সাথে বেশ কিছু তোলা ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। যারা এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের কেউ ক্লিনটন বা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোন অন্যায় অভিযোগ আনেননি। দুজনেই জানান এপস্টিনের যৌন কেলেঙ্কারির কথা তাদের জানা ছিলনা। তবে বিল ক্লিনটনকে এপস্টিনের সুইমিং পুলে কয়েক নারীর সাথে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। ইতিমধ্যে, এপস্টিনকান্ডে যে সমস্ত তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে একটি বিষয় ইঙ্গিত করে যে, এপস্টিনের সাথে তাদের সম্পর্ক বা যোগাযোগ তার (এপস্টিন) দোষী সাব্যস্ত হবার কয়েক বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এপস্টিন আত্মহত্যা করে বেঁচে গেছেন। কিন্তু মরে গিয়ে অনেক রাঘব বোয়ালের রাতের ঘুম হারাম করে গেছেন। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। (১২০২২০২৬)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধভালোবাসা দিবস : আবেগ, দায়বদ্ধতা ও মানবিক পুনর্জাগরণের প্রতিচ্ছবি
পরবর্তী নিবন্ধড্রাগন চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন