প্রায় বছর দেড়েক আগে (১ অক্টোবর ২০২৪) ভূতপূর্ব ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুতে যখন ‘ন্যাটো‘-র সব চাইতে ক্ষমতাধর পদটিতে আসীন হলেন তখন ইউরোপের অনেকেই তাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। অনেক ডাচ নাগরিকের মত আমিও খুশি হয়েছিলাম। যদিও বা আমি তার দল, ‘ফেই ফেই দে‘ বা ‘পিপলস পার্টি ফর ফ্রিডম এন্ড ডেমোক্রেসি‘-র সমর্থক নই এবং গত ৩৪ বছরে তার দলকে কখনো ভোট দেইনি। অবশ্য তাতে তার বা তার দলের খুব একটা কিছু যায় আসেনা। একটানা ১৪ বছর চার টার্মে হল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মার্ক রুতে। মাঝে দুবার পার্লামেন্ট ভেঙে যাবার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আগে নুতন করে নির্বাচন দিতে হয়েছিল। তাতে অনেকটা সহজে তিনি নির্বাচনী বৈতরণী পাড় হয়ে এসেছিলেন। এমন না যে তিনি সবার পছন্দের ছিলেন। কিন্তু ওলন্দাজ রাজনীতির মাঠে রুতের তেমন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না বলেই তিনি বারবার ফিরে এসেছেন ক্ষমতায়। অকৃতদার এই রাজনীতিবিদ সুদর্শন, প্রথম দর্শনে ভালো লাগে। সুন্দর করে কথা বলেন, বিনয়ী, সৎ, সহজ জীবন যাপন, প্রায় সময় বাসা থেকে সাইকেলে চেপে অফিসে (পার্লামেন্ট) যেতেন – বলা চলে অনেক গুনের অধিকারী। কিন্তু সরকার চালানো যতটা সহজ ছিল, ন্যাটোর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে সেক্রেটারি জেনারেল পদটিতে বসে তিনি টের পেলেন, এটি তত সহজ নয়। এটি একটি ‘হট সিট‘, যার উত্তাপ তিনি প্রায় প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছেন। ডাচ রাজনীতি অনেকটা নিরুত্তাপ। আমার কাছে ডাচ–রাজনীতিকে কখনোই খুব একটা চ্যালেন্জং বলে মনে হয়নি। অনেকটা গৎবাঁধা স্টাইলে চলে ডাচ রাজনীতি। সাধারণ জনগণের কাছ থেকে যেন অনেক দূরে। জনগণেরও তেমন আস্থা নেই রাজনীতিতে, রাজনীতিবিদদের উপর। ছাত্র সমাজের তো নেই–ই। সরকার আসে, টেক্স বাড়ে, স্বাস্থ্যখাত থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের উপর ট্যাক্স চাপানো হয়, সাধারণ জনগণের সামাজিক সুযোগ সুবিধা কমে, চাকুরীর বয়সের মেয়াদ বাড়ে, বাড়েনা কেবল বেতন। বিরোধী দলগুলি পার্লামেন্টে দিন কয়েক হইচই করে, মাঝে মধ্যে পার্লামেন্টের বাইরে একটু হইচই, প্রতিবাদ হয়। ব্যস, তারপর এক সময় সব নিস্তেজ হয়ে পড়ে , ঠিক এদেশের প্রাকৃতিক আবহাওয়ার মত। কিন্তু মার্ক রুতেকে এখন সামলাতে হচ্ছে নানা সমস্যায় জর্জরিত ইউরোপ–আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বের তাবৎ সমস্যা। তাই ন্যাটোর পদটি নিঃসন্দেহে কণ্টকময় এবং বড় চ্যালেঞ্জিং। আর সে জন্য সময়ের মধ্যে দিয়ে এই জোটকে পরিচালিত করার জন্যে প্রয়োজন তার সেরা কূটনৈতিক–দক্ষতা। এখন দেখার বিষয় এক সময়কার বিজ্ঞ ওলন্দাজ রাজনীতিবিদ রুতে তার দক্ষতা দেখাতে কতটা সফল হ।
ন্যাটোর এই শীর্ষ পদের জন্যে বেছে নেয়া হয় ইউরোপ–আমেরিকার সেরা ও সফল কূটনীতিবিদকে। মার্ক রুতে ন্যাটোর ক্ষমতায় এলেন এমন এক সময় যখন বিশ্ব অবলোকন করছে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য সহ একদিকে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং অন্যদিকে ন্যাটোর প্রতি আমেরিকান নেতৃত্বের নেতিবাচক মনোভাব ও উদাসীনতা। বলে নেই, মোট ৩২টি রাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত ‘ন্যাটো‘ একটি আন্তঃসরকারী সামরিক জোট। এই জোটের মধ্যে রয়েছে ইউরোপের ৩০টি এবং উত্তর আমেরিকার ২টি দেশ (আমেরিকা ও কানাডা)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়। জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, কোন একটি সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন দেশ আক্রমণ করলে তা সকল ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ হিসাবে বিবেচিত হবে।
মার্ক রুতে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ সন্দেহ নেই। তবে এই পদের জন্যে নানা যোগ্যতার পাশাপাশি জরুরি হয়ে পরে নেকনজর ও পছন্দ। জোটের ৩২ সদস্যের মধ্যে সবচাইতে ক্ষমতাবান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যিনি থাকেন তার ‘পছন্দ‘ এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ২০২৪ সালে যখন ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল পদে কে আসীন হবেন এই নিয়ে বেশ নানা জল্পনা কানাঘুষা হচ্ছিল, তখন বেশ কটি নাম উঠে এসেছিল সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে। এর মধ্যে ছিল ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন, যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস, এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কাজা ক্যালাস, লাটভিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিসজানিস কারিন্স এবং ডাচ প্রধান মন্ত্রী মার্ক রুতে। অল্প দিনের মাথায় ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন, যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস উভয়েই কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই এই দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। বাল্টিক রাজনীতিবিদের চাইতে মার্ক রুতে ‘নিরাপদ চয়েস‘ হিসাবে তার নাম উঠে আসে এবং তিনি ‘ন্যাটো‘-র হাল ধরেন।
২) সব চলছিল ঠিকঠাক মত। ইতিমধ্যে মার্কিন ক্ষমতায় দ্বিতীয়বারের মত এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এসেই বেশ কিছু বিতর্কিত–ঘোষণা দিলেন। ন্যাটোর সমালোচনা করে তিনি এর সদস্য রাষ্ট্রগুলির উপর চাপ দিলেন তাদের বাৎসরিক চাঁদার পরিমাণ জিডিপি–র শতকরা ৫% ভাগে উন্নীত করার। তিনি বললেন, বাইরের আক্রমণ থেকে ইউরোপকে রক্ষা করার দায়িত্ব কেবল আমেরিকার নয়। ইউক্রেনকে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব ইউরোপের বেশি করে নেয়া উচিত। ট্রাম্পের এই দাবি একেবারে অযৌক্তিক নয়। তবে আফগানিস্তান–যুদ্ধে ইউরোপের অবদানকে খাটো করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করার পর ইউরোপের নেতৃবৃন্দ নড়েচড়ে বসেন। দেরিতে হলেও তারা উপলব্ধি করেন যে অন্ততপক্ষে ট্রাম্পের শাসনামলে আমেরিকার উপর শতভাগ নির্ভর করা ঠিক হবেনা। নিজ শক্তি বৃদ্ধি এবং কেবল বড় শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী না হয়ে ভিন্ন বড় শক্তিধর রাষ্ট্রের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর দরকার। আর সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, কানাডা চীনের দিকে তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের উপলব্ধি ওয়ার্ল্ড অর্ডার‘ রক্ষায় ক্ষমতার একটি ব্যালান্স থাকা নিতান্ত জরুরি।
এদিকে ট্রাম্প যখন ন্যাটো ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করে দেশগুলির উপর বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছিলেন এবং ন্যাটোর অস্তিত্ব যখন কিছুটা সংকটের মুখে তখন অনেকেই অপেক্ষা করছিলেন ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল, মার্ক রুতে এই উদ্ভট পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেন তা দেখার জন্যে। অনেকে ধরে নিয়েছিলেন মার্ক রুতে হয়তো ট্রাম্পের বেসামাল কথাবার্তা ও পদক্ষেপের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হবেন। কেননা ট্রাম্প এবং রুতে এই দুজনের মধ্যে এক ধরণের বোঝাপড়া আছে বলে অনুমান করা হয়। ট্রাম্প রুতেকে পছন্দ করেন। সে কথা তিনি (ট্রাম্প) মিডিয়ার সামনে ও রুতের উপস্থিতিতে বার কয়েক বলেছেন। এর পেছনে কারণও আছে। ট্রাম্প তোষামোদ বা চাটুকারিতা খুব পছন্দ করেন। আর এই চাটুকারিতার গুণটি রয়েছে মার্ক রুতে। সুইজারল্যান্ডের দাভোস ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রাক্কালে মার্ক রুতে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, প্রিয় ডোনাল্ড, সিরিয়ায় আজ আপনি যা অর্জন করেছেন তা অবিশ্বাস্য। আপনাকে দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছি না (অর্থাৎ তর সইছেনা)।‘ একইভাবে, গত বছরের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে, রুতে ট্রাম্পকে টেক্সট করেছিলেন: ‘আপনি এমন কিছু অর্জন করবেন যা কয়েক দশক ধরে কোনও আমেরিকান রাষ্ট্রপতি করতে পারেনি।‘ রুতে এই ধরনের চাটুকারিতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করলেও খুশি হননি ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ। তবে খুশি না হলেও এটি সত্যি ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাভোসে গ্রীনল্যান্ড দখল করার ইচ্ছে পুনর্ব্যক্ত করলেন এবং পাশাপাশি হল্যান্ড সহ ৮টি ইউরোপীয় দেশের উপর বাড়তি শুল্ক দেবার হুমকি দিলেন, তখন অনেকেই আশংকা করেছিলেন যে আমেরিকা ও ন্যাটোর সম্পর্কে বুঝি ফাঁটল আসন্ন। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিলেন রুতে। দেখা গেলো হুমকি দেবার পর পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং ঘোষণা দেন যে গায়ের জোরে গ্রীনল্যান্ড দখল করার তার কোন অভিপ্রায় নাই। পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশের উপর বাড়তি শুল্ক দেবার যে হুমকি দিয়েছিলেন তা থেকেও তিনি সরে আসেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যে মত পরিবর্তন, তা সম্ভব হয়েছিল ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুতের কারণে। তার চাটুকারিতা এক্ষেত্রে কাজ দিয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরিস্থিতি বুঝিয়েছেন, বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন। সেখানেই রুতের কূটনৈতিক সফলতা, মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। (৫–২–২০২৬)।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












