দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেকের লেখা অনেকের মত আমাকেও আকর্ষণ করে। আগ্রহভরে তার লেখা পড়ি, পড়ায় আনন্দ দেয়। কিন্তু তিনি যে লেখেন এবং তার চাইতে বড় কথা ‘ভালো লেখেন‘ সে বিষয়টি জেনেছি তার সাথে পরিচয় হবার অনেক পরে। তার সাথে আড্ডায় বসলে টের পাওয়া যায় তার ভেতরের ‘উইট‘ ও ‘হিউমারের‘ ভান্ডার কত ‘রিচ‘। শব্দ ও চিন্তাকে দ্রুত ও উদ্ভাবনী উপায়ে প্রয়োগ করে হাস্যরস তৈরী করার স্বাভাবিক প্রবণতার যে গুন তার ভেতরে রয়েছে তা সবার মধ্যে থাকেনা। এই বৈশিষ্ট্য অনেক সফল লেখকের মধ্যে অনুপস্থিত। তার যে এই গুন সেটির খোঁজ পেয়েছি তার সাথে দীর্ঘ কয়েক দশকের মেলামেশায়, দেশে–বিদেশে। তবে আমার এই লেখা বিদগ্ধ এই জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিকের গুন–কীর্তন করার জন্যে নয়। আজকের (১৩ জানুয়ারি) দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত তার ‘ডিসি ওবায়দুল্লাহ খান ও আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স‘ শীর্ষক লেখাকে ঘিরে আমার কিছু অনুরূপ–অভিজ্ঞতা পাঠকের সাথে ভাগাভাগি করবো বলে এই কলম ধরা। সকালে দেরিতে ব্রেকফাষ্ট করা আমার নিত্যদিনের অভ্যেস। এতো দেরিতে এই কর্মটি সারা হয় যে এটিকে ‘ব্রেকফাস্ট‘ না বলে ‘ব্রুনচ’ (ব্রেকফাষ্ট ও লাঞ্চ) বলাই শ্রেয়। দেরিতে ঘুম থেকে উঠা অনেক দিনের পুরানো অভ্যেস। অভ্যেসেরও নানা ধরন আছে, ভালো অভ্যেস, মন্দ অভ্যেস। আমার রয়েছে এই মন্দ অভ্যেস। ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে ল্যাপটপ খুলে আগ্রহভরে পড়ছিলাম মালেক ভাইয়ের লেখা। হিউমার মেশানো লেখায় মালেক ভাই চট্টগ্রামের ডিসি ওবায়দুল্লাহ খানের কথা উল্লেখ করেছেন। চমৎকার বর্ণনায় পাঠককে জানিয়েছেন কী ভাবে তিনি ড্রাইভিং–এ কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই লাইসেন্স পেয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ৫০ বছর তার গাড়ি চালানোর সময় কোন দুর্ঘটনা না ঘটার কথাও উল্লেখ করেছেন। তার মত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি ও গাড়ি–বিষয়ক তথ্য আমার জানা নেই। গাড়ি নিয়ে তার রয়েছে অভিজ্ঞতার বিশাল ভান্ডার। আমার ভান্ডার শূন্য। মজার ব্যাপার হলো– মালেক ভাইয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া ও দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালেও কোন দুর্ঘটনা না ঘটার সাথে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেকটা জেরোস্ক ফটোকপির মত মিলে গেছে। বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলি।
২) তখন আমি ঢাকায় সাংবাদিকতা করি। চট্রগ্রামে বছর চারেক সাংবাদিকতা করে ১৯৮৪ সালে ঢাকায় এসে কয়েক গুণ বেশি বেতনে যোগ দিয়েছি ইংরেজি পত্রিকায়। ১৯৮৯ সালের দিকে আমার হল্যান্ড যাওয়া প্রায় চূড়ান্ত। ভাবলাম ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে নিয়ে গেলে কাজে লাগবে। কিন্তু তখন গাড়ি তো দূরের কথা, মটর সাইকেলও চালাতে পারতাম না। দু–একবার বন্ধু সাইফুলের মটর বাইক নিয়ে পাড়ার ভেতর ও পাড়া–লাগোয়া মূল সড়কে চালিয়েছি। এর বেশি নয়। কী করি! ফোন করলাম সে সময়কার এসিস্ট্যান্ট কমিশনার (ট্রাফিক) বন্ধুসম, হাসানকে। চট্রগ্রামে সাংবাদিকতা করাকালীন সময় থেকে তার সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। তখন সে ছিল ট্রাফিক সার্জেন্ট। সারাদিন মটর সাইকেল নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াতো। ‘বেড়াতো‘ বলাটা ঠিক হলো না। ডিউটি দিতো। ঢাকায় এসে প্রমোশন পেয়ে হাসান তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ট্রাফিক। পোস্টিং উত্তরায়। ফোন করে তাকে বললাম ‘আমার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ড্রাইভিং লাইসেন্স দরকার।‘ বললো, চলে আয়। অনেক দিন পর দেখা। যে কারণে আসা তা মনে করিয়ে দিলে হাসান বলে, ‘ড্রাইভিং সার্টিফিকেট দে।‘ আমার সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘সেটি যদি দিতে পারতাম তাহলে মতিঝিল থেকে মিনিবাস চড়ে এতদূর কেন আসা।‘ আশির দশকে উত্তরা মনে হতো অনেক দূরের একটি শহর। হেসে বলি, ‘আগে লাইসেন্স হাতে আসুক, তারপর গাড়ি চালানো শিখবো।‘ হাসান কলিং বেলে চাপ দিলে হাবিলদার গোছের পুলিশি–ড্রেস পড়া এক লোক এসে তাকে সালাম দেয়। আমাকে দেখিয়ে হাসান বলে, ওনার ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। পুলিশটি স্বাভাবিকভাবে আমার কাছ থেকে ড্রাইভিং পাশের সার্টিফিকেট চাইলো। হাসান বলে, ‘ওগুলো লাগবেনা, আমি দেখছি, আপনি রেডি করে নিয়ে আসেন।‘ অধস্তন পুলিশটি একবার আমার মুখের দিকে আর একবার হাসানের মুখের দিকে অনেকটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো। ঘন্টা খানেকেরও কম সময়ে হাতে এলো একটি নয়, দুটি ড্রাইভিং লাইসেন্স। একটি সাধারণ ড্রাইভিং লাইসেন্স, আর একটি ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, যা দিয়ে আপনি বিশ্বের সব দেশে গাড়ি চালাতে পারবেন। মনে মনে হাসলাম। দেশেই গাড়ি চালাতে পারিনা, আর সব দেশে। পেয়ে গেলাম লাইসেন্স। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে হল্যান্ডে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন অনুন্নত দেশ থেকে আনা ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে স্থানীয় (ডাচ) লাইসেন্স পাওয়া যেত। কিন্তু দেখা গেছে, এতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। তার মূল কারণ, গাড়ি চালাতে জানলেও ইউরোপের ট্রাফিক আইন কানুন সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিলনা। ফলে কয়েক বছর পর এই নিয়ম বন্ধ করে দেয়া হয় এবং লিখিত ও প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। হল্যান্ড আসার ঠিক এক বছরের মাথায় গাড়ি কিনে ফেললাম এবং উপরওয়ালার দোয়ায় এই দীর্ঘ ৩৪ বছর গাড়ি চালাতে গিয়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটাইনি এবং ঘটেনি। গাড়ি ড্রাইভ করে ইউরোপের বেশ কটি দেশে যাওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবুর্গ, জার্মানিতে অনেকবার। সৌভাগ্য হয়েছিল মালেক ভাই, তার স্ত্রী কামরুন ভাবি, আজাদীর চীফ রিপোর্টার হাসান আকবর সহ গাড়ি করে হল্যান্ড থেকে বেলজিয়াম বেড়িয়ে এসেছিলাম হইচই করে। গাড়িতে সুমনা সহ দেশ থেকে আসা আরো দুজন অতিথি ছিলেন। হল্যান্ডে ট্রাফিক আইন মেনে চলা হলেও প্যারিসের রাস্তায় প্রায় সময় তার ঘাটতি দেখা দেয়। সেখানে বিশেষ করে প্যারিসের হাইওয়েতে কে কাকে ডিঙিয়ে এগিয়ে যাবে তার প্রতিযোগিতা যেন। অন্যদিকে জার্মানির হাইওয়েতে খুব দ্রুত গাড়ি চালাতে হয়। এই দুই দেশে গাড়ি চালানো এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। তারপরও বলতে হয় উপরওয়ালার কৃপায় এখনো পর্যন্ত এক্সিডেন্ট–বিহীন গেছে।
৩) এবার আসি ঢাকায় ড্রাইভিং শেখা কীভাবে শুরু হলো সে কাহিনী ছাড়াও কীভাবে ড্রাইভিং শেখার প্রথম দিন মরতে মরতে বেঁচে গেলাম তার গল্প। আমার অফিস ছিল মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছাকাছি এক ভবনে। ব্যাঙ্ক–লাগোয়া রাস্তার ধারে ছিল এক স্টীল কারখানা, নাম বাংলাদেশ স্টিল হাউস। এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন আমার বিশিষ্ট বন্ধু, জাদুকর উলফাৎ কবীর। তার কারখানার পাশ দিয়ে রিকশায় চড়ে অফিসে আসা–যাওয়া করতাম। আমি তখন সবুজবাগ থাকি। প্রায় সময় তার কারখানায় নেমে পড়তে হতো। উলফাৎ কবীরের চাপে। চা–চপ, কাটলেট ইত্যাদি খেতে খেতে আড্ডা হতো সেখানে। উলফাৎ কবির ও তার স্ত্রী রুখসানা কবীর তখন ঢাকায় বাংলাদেশের ‘প্রথম জাদুকর দম্পতি‘ হিসাবে বেশ নাম কুড়িয়েছেন। উলফাৎ কবীরের একটা ভেসপা ছিল। তার পেছনে বসে বার কয়েক আমার ঘোরা হয়েছে। ড্রাইভিং শিখবো শুনে উনি বললেন, তাহলে আমিও শিখবো একসাথে। তার কারখানার অনতিদূরে নটরডাম কলেজ। কলেজের ঠিক উল্টোদিকে রাস্তা–লাগোয়া বেশ কটি ড্রাইভিং স্কুল। ময়লা, নোংরা, তার উপর চলমান যানবাহনের কারণে ধুলো–বালিতে ভরা স্কুলগুলি। কথা হলো সেখানে গিয়ে। আমাদের বেশ–ভূষা দেখে ড্রাইভিং স্কুলে যারা বসেছিলেন তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হলো সে টের পাই। কেননা এই সমস্ত স্কুলে ড্রাইভিং শিখতে আসে সাধারণত অশিক্ষিত বা কম লেখাপড়া জানা লোকজন। ওদের টার্গেট ড্রাইভিং শিখে ট্রাক বাস বা প্রাইভেট কোন গাড়ি চালানো। যাই হোক, হ্যাংলা–পাতলা গড়নের মধ্য বয়সী ইন্সট্রাক্টর আমাদের দুজনকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সামনে রাস্তার ধারে পার্কড করা ছিল পুরানো ধাঁচের একটি প্রাইভেট কার। উনি আমাদের বললেন, আপনাদের মধ্যে যিনি প্রথমে শুরু করবেন তিনি সামনের সীটে বসেন, অন্যজন পেছনে। যেহেতু উলফাৎ কবীর ভেসপা চালান তাই তাকে বলি, আপনিই আগে চালান। আমি পেছনে বসছি।‘ গাড়ি মতিঝিল, কমলাপুর রেল স্টেশন হয়ে বেশ কয়েকটি সড়কে চললো। উলফাৎ কবীরের হাতে স্টিয়ারিং। তার পাশে ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর। আমার কৌতূহলী দৃষ্টি সামনের দিকে। পৌনে এক ঘন্টা চালানোর পর গাড়ি এসে থামে ড্রাইভিং স্কুলের সামনে। এবার আমার পালা। উলফাৎ কবীর কিছুটা শংকিত হয়ে বলেন, ‘বিকাশ, আমার তো ভেসপা চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। আপনার তো তাও নেই, পেছনে কি বসবো?’ তারপর পেছনের সীটে গিয়ে বসলেন। আমার হাত স্টিয়ারিংয়ে। মিনিট পাঁচেক চালিয়েছি। কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে যে মোড় তাতে এক চক্কর দিয়ে মূল রাস্তায় আসতেই হঠাৎ জোরসে কষে ব্রেক করলো পাশে বসা ইন্সট্রাক্টর। গাড়ি গেল থেমে। দেখি আমাদের গাড়ির মুখোমুখি দৈত্যাকার এক ট্রাক। আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমার চাইতে বেশি ভয় পেয়েছিলেন পেছনের সীটে বসা উলফাৎ কবীর। বললেন, ‘দিয়েছিলেন তো শেষ করে।‘ এর পর আরো বেশ কিছুদিন দুজন মিলে একসাথে ড্রাইভিং শিখেছি। মোটামুটি ড্রাইভিং অনেকটা রপ্ত হলো। এই হলো আমার গাড়ি চালানো শেখা।
শেষ করবো মালেক ভাইয়ের লেখা দিয়ে। পুরানো একটি প্রবাদের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন– ‘Behind every great man, there’s a great Woman‘. কথাটি হয়তো সত্য। প্রায় ক্ষেত্রে তাই হয়। ওনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কামরুন মালেকের মত গ্রেট নারী ছিলেন বলেই মালেক ভাই সফল হতে পেরেছেন। মজার ব্যাপার হলো বিখ্যাত মার্কিন লেখক ও প্রাবন্ধিক মার্ক টোয়েন বলেছেন, ‘Behind every ssuccessful man there is a woman. And behind eveyr unsuccessful man there are two .’ ‘মার্কিন সাহিত্যের জনক‘ হিসাবে খ্যাত মার্ক টোয়েনের ছিল এক স্ত্রী, নাম অলিভিয়া। প্রশ্ন থেকে যায় – আমার মতো ‘অসফল‘ লোকদের জীবনে কি দুই নারী, যে–কারণে সফলতার দ্বারে পৌঁছুতে পারছি না? (১৩–০১–২০২৬)।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।












