আরো একটি বছর পিছু ফেলে এলাম। মানুষের জীবনটাই এমন। সবকিছুকে একটা সময় পিছু ফেলে আসতে হয়। কোন কিছুই সাথে নিয়ে যাওয়া যায়না। সাথে যায় কেবল ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। কী পেলাম, কী দেখলাম গেল বছর গোটা বিশ্বে। যেন হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী। শান্তির সুবাতাস যেন গেছে নির্বাসনে। নূতন বছরও শুরু হলো এক অনিশ্চয়তা নিয়ে। গোটা বিশ্বে যখন এক অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, দেশে দেশে নিরীহ মানুষ শিশু নারী মরছে বোমার আঘাতে, কারণে অকারণে, তখন চিরাচরিত নিয়মানুসারে ঘটা করে আহবান জানানো হয় নূতন বছর ২০২৬–কে, পাশাপাশি বিদায় জানানো হয় পুরানো বছরকে। দিন যায় মাস যায়, যায় বছর। কিন্তু ‘বৎসরের আবর্জনা দূর‘ হয়না। আবর্জনা জমে, আবর্জনা আরো বাড়ে। বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাচে সাধারণ জীবন হয় অচল, দেশ হয় বিধ্বস্ত। তারপরও মানুষ আশায় বাসা বাঁধে। প্রার্থনা করে ঘরে ঘরে, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডায়। একটি সুন্দর, সুস্থ আগামীর আশায়। আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান, উৎসব। কিন্তু কোন কোন স্থানে নিমিষে আনন্দোৎসব পরিণত হয় শোকে। হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড সহ ইউরোপের বেশ কটি দেশে ঘটে গেল বেশ কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। যে দুর্ঘটনা সবাইকে বেশি মর্মাহত করেছে তা হলো দক্ষিণ সুইজারল্যান্ডের ক্র্যানস–মন্টানায় স্কি–রিসোর্টের ‘লে কনস্টেলেশন‘ নামে একটি বারে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড। নূতন বছরকে স্বাগত জানাতে সেখানে জড়ো হয়েছিল সুইজারল্যান্ড সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ট্যুরিষ্ট, দর্শনার্থী। তার মধ্যে তরুণ তরুণীর সংখ্যা ছিল বেশি। উৎসব চলাকালীন সময়ে হঠাৎ ‘বারে‘ আগুন লেগে ৪০ জন মারা যায় বলে জানায় সুইস পুলিশ। আহত হয় ১১৫ জন, যাদের অনেকের অবস্থা স্থানীয় পুলিশের মতে ‘গুরুতর‘। শুরুতে কেউ কেউ ধরে নিয়েছিল সন্ত্রাসী কোন ঘটনা। কিন্তু ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তারা সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন, যদিওবা এখনো পর্যন্ত কোনও কারণ তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। অন্যদিকে হল্যান্ডে নূতন বছর উদযাপন করতে গিয়ে দুজন নিহত হয়। এর মধ্যে নাইমেইখেন নামক এক শহরে ১৭–বছরের এক তরুণ বাজি পোড়াতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করে। আলসমিয়ের নামক আর এক শহরে ৩৮–বছরের এক ব্যক্তি একই কারণে মৃত্যু বরণ করে। গোটা দেশে বাজি পোড়াতে গিয়ে ১২ জনের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বন্দর নগরী রটরডামের হাসপাতালে বাজিতে আহত হয়ে আসা ১৪ জন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়। এদের মধ্যে ১০ জনই অল্প বয়েসী। হাসপাতালে ৯৩ জনকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। হালকাভাবে আহত হয়েছেন অনেক। কোন কোন স্থানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এক শ্রেণীর অতি উৎসাহী কিশোর ও তরুণ। নুতন বছর উদযাপন করতে গিয়ে এরা বিভিন্ন স্থানে পার্ক করা গাড়ি পুড়িয়ে দেয়, পুলিশের সাথে অহেতুক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ব্রেদা নামক একটি শহর। সেখানে পুলিশকে লক্ষ্য করে জ্বলন্ত আতশবাজি ছুড়ে মারা ছাড়াও পেট্রল বোমা ছুড়ে মারে তারা। সারা দেশে পুলিশ এই সমস্ত অপকর্মের কারণে ২৫০ জনকে গ্রেপ্তার করে। বলা বাহুল্য, পৃথিবী ব্যাপী আতশবাজি পোড়ানো নতুন বছরকে আহবান জানানোর উৎসবের অন্যতম উপকরণ বা মাধ্যম। আমার বিবেচনায়, আতশবাজি পোড়ানো তো নয়, এর মধ্যে দিয়ে পরিবেশ পোড়ানো হয়, পোড়ানো হয় কোটি কোটি টাকা। মৃত্যুর ঘটনা তো আছেই। বিগত বছরগুলির চাইতে তুলনামূলকভাবে হল্যান্ডে এই বছর বেশি বাজি পোড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাচ পাইরোটেকনিক্স অ্যাসোসিয়শেনের মতে, আতশবাজি–উৎসবে এই বছর রেকর্ড ১২৯ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করা হয়। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা হলো, চলতি বছর থেকে হল্যান্ডের বেশ কিছু শহরে আইন করে আতশবাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে গোটা দেশে আতশবাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামী বছর থেকে বাজি পোড়ানো যাবেনা – এই ভাবনা থেকে হয়তো অনেকেই ভেবেছে শেষ বারের মত হোক আতশবাজির মচ্ছব।
নুতন বছরকে বরণ করে নেবার জন্যে ফি–বছর আয়োজন করা হয় ‘নিউ ইয়ার্স পার্টি‘। তাতে ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১ জানুয়ারির ভোর রাত ৩–৪ টা পর্যন্ত চলে নাচ, গান, পানাহার, হরেক রকম খাওয়া, আড্ডা। আমরা গিয়েছিলাম কাছের এক শহরে। আমন্ত্রক সুরিনামী এক যুবক। আইটি বিশেষজ্ঞ। নাম সুধীর নানান। তার রয়েছে নিজস্ব কোম্পানী, ট্রি–কনসাল্টিং। বিয়ে করেছেন বাংলাদেশী মেয়ে। সুধীরের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ড গার্ডেনে সামিয়ানা টাঙিয়ে আয়োজন করা হয় অতিথিদের জন্যে বাড়তি স্পেস। বাড়ির সামনে লাল সবুজ ও তারকা খচিত সুরিনামের পতাকা। আমাদের বলা হলো একটু আগ বাড়িয়ে যেতে, অতিথিদের এসে পৌঁছার আগে। আমন্ত্রিত অতিথিদের বেশির ভাগ স্থানীয় ডাচ, কিছু সুরিনামী রয়েছে, আছে আমরা ছাড়াও আরো দুটি বাংলাদেশী ইয়ং ফ্যামিলি। কিছুটা উঁচু ভলিউমে সুরিনামী গান বেজে চলে। আজ আর উঁচু–শব্দের জন্য প্রতিবেশীদের কোন আপত্তি বা বাধা নেই। গোটা দেশ জুড়ে চলছে উৎসব। গোটা দেশ জুড়ে সকাল থেকে এখানে ওখানে বাজি উড়ছে আকাশের দিকে, প্রচন্ড শব্দে ও নানা রঙ সৃষ্টি করে। ঠিক রাত আটটায় আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করে। কারো হাতে বাসায়–তৈরী কিংবা কেনা কেক, খাবার, কারো হাতে পানীয়ের বোতল। আজ যে সবার মাতাল হবার দিন। গানের তালে তালে চলে আড্ডা, খাবার দাবার, নাচ। রাত বারোটার ঠিক এক মিনিট আগে আয়োজকদের একজন মাইক হাতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে গুনতে থাকে নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক। তারপর সবার ‘টোস্ট‘ করা সুধাপাত্র হাতে নিয়ে, কারো হাতে কোলা কিংবা অন্য কোন সফট ড্রিঙ্কস। প্রচন্ড শব্দে আকাশ জুড়ে চলে আতশবাজির মহোৎসব। সেখানে দেখা ড্রয়িং রুমে বসা এক বৃদ্ধার সাথে। কৃষ্ণবর্ণের এই মহিলার সাথে এর আগে একবার দেখা হয়েছিল। ভিন্ন এক শহরে থাই বৌদ্ধ মন্দিরে। তবে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসে হিন্দু, আদিনিবাস ত্রিনিদাদ। ত্রিনিনাদ ও টোবাগো, দক্ষিণ–পূর্ব ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি অতি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। এই দুটি প্রধান দ্বীপ নিয়ে গঠিত – ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের কাছাকাছি ভেনেজুয়েলার উত্তর পূর্বে এবং গায়েনার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। এই দুটি দ্বীপের মধ্যে ত্রিনিদাদ বড়, আয়তন মাত্র ১৮৫০ বর্গমাইল এবং টোবাগো মাত্র ৩০ মাইল দৈর্ঘে ও এর প্রশস্ততম স্থান ১০ মাইলের সামান্য বেশি। দুই দ্বীপ মিলে জনসংখ্যা মাত্র এক লক্ষ ৩৭ হাজার। বৃদ্ধা এই মহিলার বয়স ৮১। সেটি জানলাম উপস্থিত অতিথিদের একজন তাকে যখন তার বয়স জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে মহিলা মুখে মৃদু হাসি মেলে ইংরেজিতে বলেছিলেন, ‘অনলি এইটি ওয়ান‘ (মাত্র একাশি)। উল্লেখ করা যেতে পারে, ত্রিনিনাদ ও টোবাগো এক সময় ইংরেজদের কলোনি ছিল। বছরের ছয় মাস মহিলা থাকেন হল্যান্ডে, তার মেয়ের কাছে। মেয়ের নাম তাঁরা। বিয়ে করেছেন এক ডাচ ভদ্রলোককে। তাঁরার মায়ের কথা এই কারণে লিখলাম, মহিলা এই বয়সেও শারীরিকের চাইতে মানসিকভাবে বেশি শক্ত। প্রতিবছর তিনি একা একটানা ৯ ঘন্টার প্লেন জার্নি করে হল্যান্ড আসেন এবং ফিরে যান একা। ভাবি এই বয়সে তো আমাকে পাওয়া যাবে না। মাস দুয়েক আগে একই দূরত্বে আমাকে যেতে হয়েছিল কলম্বিয়া। এতক্ষণ কী করে আকাশে থাকবো এইভাবে একবার ভেবেছিলাম না করে দেই। যাই হোক– ঘরে–বাইরে হইচই। আতশবাজির কান–ফাঁটা শব্দ। কিন্তু তাতে ভদ্রমহিলার কোন সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হলোনা। গায়ে মোটা কাপড় জড়িয়ে, পায়ে কম্বল জাতীয় চাদর দিয়ে দিব্যি তিনি একটি চেয়ারে আমাদের সাথে রাত দুটো অবধি বসে ছিলেন। মাঝেমধ্যে কারো সাহায্যে টয়লেটে গিয়েছিলেন। ফিরে আসি অন্য প্রসঙ্গে।
হল্যান্ড ছোট্ট দেশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অতি উন্নত। বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনীতিতে মন্দা যাচ্ছিল এবং এখনো যাচ্ছে, তখন ডাচ অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা অবস্থানে রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও গেল বছরের তুলনায় কিছু ভালো বলা চলে। ডাচ পুলিশ ও জাতীয় পত্রিকা দৈনিক টেলিগ্রাফের এক পরিসংখ্যান অনুসারে, অনেক বছর পর হল্যান্ডে খুনের সংখ্যা কমে ১০০–এর নিচে নেমে এসেছে। গেলো বছর (২০২৫) গোটা দেশে ৯৪টি ঘটনায় ৯৮ জন নিহত হয়েছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন এবং তার আগে ২০২৩ সালে মোট ১২৮ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে শিশু ও কিশোর–কিশোরী ছিল। আগেই উল্লেখ করেছি, সভ্য দেশ হল্যান্ড, উন্নত দেশ হল্যান্ড। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই দেশেও অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা ঘরে ও বাইরে নির্যাতিত হয় অনেক সময়। যে ৩৫ নারী খুন হয় তাদের মধ্যে ১৬ জন তাদের সঙ্গী বা প্রাক্তন বন্ধু বা স্বামীর হাতে নিহত হয় বলে পুলিশের তথ্য মতে জানা যায়। দুঃখজনক ব্যাপার যেটি আমাদের আঘাত করেছে বেশি তাহলো, মাসখানেক আগে হল্যান্ডের একটি শহরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছে বাংলাদেশী এক তরুণী মা। তাদের রয়েছে দুই ছোট সন্তান। পুলিশ বাংলাদেশী এই লোককে গ্রেপ্তার করেছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন গোটা হল্যান্ড বরফে ঢেকে গেছে। গুড়ি বৃষ্টির মত বরফ পড়ছে শূন্য থেকে। অপূর্ব সে দৃশ্য। ড্রয়িং রুম থেকে খোলা জানালা দিয়ে সে অপূর্ব দৃশ্য দেখে মনে হয় ‘আহা, যদি মানুষগুলো এমন হতো, পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো‘। ৪–১–২০২৬।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।











