‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। কে তাকে ভরসা দেবে, কে দেবে আশা।’ স্কুল বয়সে সিনেমা হলে দেখা ‘নবাব সিরাজদৌল্লা’ ছায়াছবিতে বাংলা বিহার উড়িষ্যার অধিপতি নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে দেখেছি তার দাদা নবাব আলীবর্দী খাঁর মসনদের সামনে দাঁড়িয়ে এই হতাশার কথা ব্যক্ত করতে। কত বছর আগে টানটান উত্তেজনায় দেখা এই ছবি। অথচ এখনো তার সিংহভাগ স্পষ্ট মনে রয়েছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ঠেকাতে পারেননি বাংলার আকাশের সেই দুর্যোগ। সেদিনকার বাংলার আকাশের মত আজ ইউরোপের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা। সামপ্রতিক সময়ে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে হঠাৎ করে কোথা থেকে উড়ে আসছে ড্রোন। তাদের উৎপত্তিস্থল কোথা, কারা এর পেছনে, কেন তাদের এই গোপন অভিসার, কী গোপন অভিসন্ধি তা কেউ বলছে না। কোন সরকারও না। এমনকী এই সমস্ত ড্রোনকে ভূপাতিতও করা যাচ্ছেনা। কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলি মিলিয়ে যাচ্ছে। কে বা কারা পাঠাচ্ছে তা এখনো কোন সরকার নিশ্চিত করে না বললেও এই কর্মটি যে রাশিয়া করছে তাতে কারো কোন সন্দেহ নেই। সবার ‘অঙ্গুলি‘ এখন স্বৈরশাসক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের দিকে। ইউক্রেন আগ্রাসনের পর থেকে যে–যুদ্ধ ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত রয়েছে তা কেউ কেউ আশংকা করছেন, ড্রোন পাঠানোর মধ্যে দিয়ে পুতিন এই অসম–যুদ্ধে ইউরোপকে প্ররোচিত করছেন। অনুমান করা হচ্ছে যে নিরাপত্তা বিষয়ক গোপন তথ্য জোগাড় করার লক্ষ্যে রাশিয়া এই সমস্ত ড্রোন পাঠাচ্ছে। পাঠাচ্ছে এমন এলাকায় যেখানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মূলত ২০২২ সালের গোড়ার দিকে রাশিয়া ইউক্রেনে পুরো মাত্রায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ড্রোনগুলি ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলির আকাশে উড়তে দেখা যায়। কেবল তাই নয়, গত সেপ্টেম্বর ২০টির বেশি রুশ ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। তিনটি রুশ মিলিটারি জেট এস্তোনিয়ার আকাশে ১২ মিনিট ধরে উড়াল দেয়। ইতিমধ্যে ড্রোন প্রবেশ করে বেলজিয়াম, হল্যান্ড, জার্মানি, রোমানিয়া সহ আরো বেশ কটি ইউরোপীয় দেশে। হল্যান্ডের আকাশে ড্রোন দেখার ফলে আইন্ডহোভেন বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীরা নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হন। যার ফলে বেসামরিক ও সামরিক উভয় কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গেল সপ্তাহে হল্যান্ডের দক্ষিণে ফলকেল এয়ার বেইসের উপরে উড়তে থাকা ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়, কিন্তু কোন ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। এর অর্থ তাদের প্রচেষ্টা ঠিক লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেনি। ভাবতে অবাক লাগে এই সমস্ত ড্রোন ইউরোপের আকাশে অনুপ্রবেশ করে এর আকাশসীমা–কর্মকান্ডের ব্যাঘাত ঘটিয়ে চলেছে, কিন্তু এই অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করার মত কোন ব্যবস্থা এখনো ইউরোপে গড়ে উঠেনি। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন দের লিয়েন এই ধরণের অনুপ্রবেশকে ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার‘ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
২) বিগত কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার এই ধরণের উষ্কানীমূলক কার্যকলাপ দেখে অনেকে আশংকা করছেন যে রাশিয়া ইউরোপকে এই যুদ্ধে টেনে আনতে চাইছে। আর সে কারণে নানা অজুহাতে, বিনা উস্কানিতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলির সীমান্তে অনুপ্রবেশ করছে, ড্রোন পাঠাচ্ছে এবং সীমান্ত–এলাকায় রাশিয়ার মিত্র দেশগুলির সাথে মিলে সামরিক মহড়া দিচ্ছে। ইউরোপের অনেকেই মনে করেন রাশিয়াকে রুখে দাঁড়ানোর মতো সামরিক শক্তি ন্যাটোর নেই। বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র শক্তভাবে ন্যাটোর কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করে। ইউরোপীয়দের ভয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার বর্তমান প্রশাসনকে নিয়ে। পুতিনের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক সম্পর্কে সবাই অবগত। ফরাসি পত্রিকা ‘লা মন্ডের‘ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ২০ বছর ধরে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে স্পষ্ট মোহ বা ফেসিনেশন রয়েছে তা কারো অজানা নয়। ওই পত্রিকা আরো লিখেছে, ‘তার (ট্রাম্প) রিয়েল ষ্টেট সাম্রাজ্য রাশিয়ার প্রাইভেট ক্যাপিটাল বা পুঁজি থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে। ক্ষমতাধরদের প্রতি, বিশেষ করে কর্তৃত্ববাদী–প্রবণতা–সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি তার যেমন রয়েছে এক ধরনের মোহ বা ভালোলাগা, তেমনি গণতান্ত্রিক ও উদারমনা ব্যক্তিদের প্রতি রয়েছে তার বিরূপ মনোভাব। বোধকরি এই কারণে ট্রাম্পকে দেখা গেছে সব সময় পুতিনের পক্ষ নিতে। ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ বিরতিতে সর্বশেষ যে প্রস্তাবনা ট্রাম্প রেখেছেন তাতে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে, যা দেখে মনে করা হচ্ছে এটি পুতিনের ‘উইশ লিস্ট‘ বা ‘পছন্দের তালিকা‘। কেননা তাতে রাশিয়াকে ইউক্রেনের অধিকৃত রাজ্য ছেড়ে দেয়া ছাড়াও, ইউক্রেন কখনোই ন্যাটোর সদস্য হতে পারবেনা, ইউক্রেনে রুশ ভাষা চালু করতে হবে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংখ্যা কমাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। ইউরোপ ও ইউক্রেন উভয়েই ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিতে পারছেনা। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য সহ ইউরোপের কয়েকটি বৃহৎ রাষ্ট্র চেষ্টা তদবির করছে কী করে ইউক্রেনের স্বার্থ ও ইউরোপের মুখ রক্ষা করে একটি গ্রহণযোগ্য যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবনা তৈরী করা যায়। বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্র না চাইলে ইউরোপের কোন প্রস্তাবনা যে বাস্তবের মুখ দেখবে না তা কারো অজানা নয়। ইউরোপের ভয় ট্রাম্পকে নিয়ে। তিনি কি ইউক্রেন কিংবা ইউরোপের চাওয়াকে অগ্রাধিকার দেবেন, না পুতিনের? এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো অনেকটা ‘কাগুজে বাঘ‘। যুক্তরাষ্ট্রের ‘বলে‘ বলীয়ান হয়ে ন্যাটো কিংবা ইউরোপ শক্তিশালী। এই অমোঘ সত্যটি ইউরোপ উপলদ্ধি করতে পেরেছে অনেক পরে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মত যখন ক্ষমতায় আসেন। ফলে দেরিতে হলেও তারা এখন নিজ নিজ দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে শুরু করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো ‘কাগুজে বাঘ‘ – এই কথাটি খুব ভালোভাবে জানেন বলে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউরোপের আকাশে ড্রোন পাঠানোর সাহস পান। ন্যাটোকে ট্রাম্প খুব একটা পছন্দ করেননা জেনেই পুতিন ইউরোপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস পান। আর সে কারণে তিনি ইউরোপের আকাশে ড্রোন পাঠিয়ে ইউরোপকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
৩) আর আসন্ন যুদ্ধের আশংকা থেকেই গেল সপ্তাহে ডাচ সরকার জনগণকে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘এমার্জেন্সি কিট‘ ঘরে মজুত করে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। জরুরি অবস্থায় পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলে ৭২ ঘন্টার জন্যে ‘সাহায্য না আসা পর্যন্ত’ কী কী করণীয় এবং কী ধরনের অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুত করা প্রয়োজন তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে খাবার পানির বোতল, মোমবাতি, শুকনো খাবার, ফার্স্ট এইড বক্স ইত্যাদি। তবে সরকার থেকে এটিও বলা হয়েছে, আতংকিত হবার মত পরিস্থিতি এখনো হয়নি, হবে তেমন নির্দিষ্ট করেও কিছু বলা হয়নি। কেবল সজাগ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সাধারণ জনগণের মাঝে অবশ্য এই ধরনের ঘোষণায় কোন আতংক বা ভীতি তেমনভাবে এখনো দেখা দেয়নি। তবে কেউ কেউ ইতিমধ্যে সুপারমার্কেটে ভিড় জমিয়েছেন এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়িতে মজুত করে রাখা শুরু করেছেন। আমরা? না, আমরা এখনো শুরু করিনি। তবে কয়েকদিনের মধ্যে মোমবাতি, লাইটার, পানি, সফট ড্রিংকস, ড্রাই খাবার, মরিচ, মসল্লা, টয়লেট পেপার ইত্যাদি কেনার চিন্তা ভাবনা করছি। ইউ নেভার নো। যুদ্ধ বলে–কয়ে আসেনা। যেমনটি বলে কয়ে আসেনা ভূমিকম্প। আর ইতিহাসের সব চাইতে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় এই ইউরোপে। সেটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এর শুরু নাৎসি জার্মানির ইউরোপ জুড়ে ভয়াবহ আক্রমনের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এই যুদ্ধ কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, চীন, বার্মা, থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরো অনেক দেশে। অর্ধেক বিশ্বকে এই ভয়াবহ যুদ্ধ গ্রাস করে। জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়, নিহত হয় প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার জাপানি নাগরিক। ‘হলোকষ্টে‘ ৬০ মিলিয়ন ইহুদি নিহত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী পাঁচ কোটিরও বেশি সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ মারা যায়। কী ভয়াবহ!
৪) সেখানেই ভয়। যুদ্ধ শুরু হয় একটি স্থানে, দুটি দেশের মধ্যে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে অন্য দেশে। এক থেকে অনেক দেশে। যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানির হিটলার বাহিনী ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করলে এগিয়ে আসে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। ১৯১৮ সালের ‘ভার্সাই চুক্তির‘ শর্তাবলী অনুসারে এই দুই দেশ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ক্ষুদ্র পোলিশ সেনাবাহিনী তিন সপ্তাহ দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু প্রবল শক্তিশালী জার্মান সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। ইউরোপে অনেকের আশংকা আবার কি সেদিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি? রাশিয়া নুতন করে পোল্যান্ড আক্রমনের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ পোল্যান্ড সহ ইউরোপের। তেমন আলামতও দেখা যাচ্ছে সামপ্রতিক সময়ে। ‘ঘর–পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়‘ বলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। আমাদের দশা অনেকটা ঘরপোড়া গরুর মত। আর তাই রাশিয়ার আন্তর্জাতিক নিয়ম–নীতিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে পরদেশে অযাচিত, অনাকাংখিত অনুপ্রবেশ ও আক্রমণের পাঁয়তারা দেখে আমাদের ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। (২৬–১১–২০২৫)।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












