হল্যান্ড থেকে

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর - তার কাছে যে আমার অনেক ঋণ

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১৯ জুলাই, ২০২৫ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

দেখতে দেখতে ৬টি বছর চলে গেল। অথচ ফিরে দেখলে মনে হয় এইতো সেদিন হল্যান্ডে আমার ড্রয়িংরুমে ডিনার শেষে পাশাপাশি দুটো সোফায় দুজনে বসে রাতভর দীর্ঘ আড্ডা দিচ্ছি। বেশ কয়েকবার হল্যান্ড এসেছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই। কখনো আমার আমন্ত্রণে, কখনোবা নিজ উদ্যোগে। নারীর ক্ষমতায়ন, রেমিটেন্স শীর্ষক সেমিনারে, কখনো বক্তা হয়ে, কখনোবা সঞ্চালক হিসাবে তাকে হল্যান্ড আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ হয়েছিল। আখেরি বার এসেছিলেন তার মৃত্যুর মাস কয়েক আগে। তখন তার শরীরের যে দশা তাতে অন্য কারো পক্ষে এতো দীর্ঘ আকাশভ্রমণ করার সাহস হতোনা। কিন্তু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ছিলেন তার মেজ ভাইয়ের ভাষায়, ‘রিয়েল ফাইটার’। সেকথাটি তার মেজ ভাই, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস আমাকে বলেছিলেন যখন তিনি জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মৃত্যুর বছর খানেক পর হল্যান্ড এসেছিলেন। ‘ফাইটার’ তো বটেই, তা না হলে তিনি অতটা সাহস করে শরীরের সাথে যুদ্ধ করে দীর্ঘ ইউরোপভ্রমণে আসতেন না। তবে শরীরের ভগ্নদশার কারণে একা চলাচল, দীর্ঘ আকাশপথ ভ্রমণ সম্ভব নয় বিধায় সাথে এসেছিল তার আত্মজ, অপু, অপূর্ব জাহাঙ্গীর। যে ড্রয়িংরুমে বসে জাহাঙ্গীর ভাই সহ আড্ডা দিয়েছিলাম তার একদিকে পাতানো ডাইনিং টেবিলটাকে অফিসটেবিল বানিয়ে রোজকার মত আজও ল্যাপটপ নিয়ে বসেছি এই লেখা লিখতে। উনি মারা যান ১০ জুলাই। সে আজ থেকে ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালে। ডাইনিং টেবিলের পাশে বড় সাইজের শোকেইজ। তাতে ‘শোপিচের’ বদলে থরে থরে সাজানো এক গাদা বই। পুরোটাই কাচের তৈরি এই বুকশেলফের দ্বিতীয়তাকে তার স্বহস্তে লেখা আমাকে উপহার দেয়া কটি প্রকাশিত বই শোভা পাচ্ছে। তার মধ্যে মোটাসোটা একটি, নাম ‘অপরাজেয় মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর’। প্রচ্ছদে তার ছবি। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ করে তার কাছেরজনেরা, চেনাঅচেনা, নামিদামি লেখকদের লেখা সংগ্রহ করে এই বইটি ঢাকা থেকে প্রকাশ করেছে সুবর্ণ। চমৎকার, দৃষ্টিনন্দন ও পাঠক প্রশংসিত ৩৪০ পৃষ্ঠার এই বইটি সম্পাদনা করেছে অপূর্ব জাহাঙ্গীর। স্মৃতিচারণ করে তাতে লিখেছেন তার মেজ ভাই অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, রামেন্দু মজুমদার, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মুস্তাফা মনোয়ার, কেরামত মওলা এবং আরো অনেকে। মনে আছে অপু চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিল ওর বাবার উপর একটা লেখা পাঠাতে। উত্তরে তাকে লিখেছিলাম, ‘তুমি না বললেও লিখতাম। সে হবে মনের তাগিদ থেকে লেখা’। দেখা যায় আমরা সাধারণত খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের অবদানের কথা স্মরণ করে লিখি, বলা চলে বেশ উদারভাবে। অথচ তারা যখন বেঁচে থাকেন, তখন তাদের অবদানের কথা, তাদের সৃষ্টির কথা লিখিনা। তখন আমাদের মাঝে সেই উদারতাটুকু দেখা যায়না। এই কথাটা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছিল অপূর্ব জাহাঙ্গীর। শিল্পকলা একাডেমিতে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি তার বাবার স্মৃতিস্মরণে আয়োজিত এক সভায়। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে তার জীবদ্দশায় এই পাতায় বার দুয়েক লিখেছিলাম। লিখেছিলাম– ‘মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের হাঁটুসমান সাংবাদিকদের অনেকে জাতীয় পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর দেশের প্রথম সারির সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়েও এই পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি। তিনি পাননি কারণ তিনি কোন রাজনীতি করেন না, কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে সাফাই গান না। কোদালকে তিনি কোদালই বলেন।’ এই প্রসঙ্গে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশে (পিআইবি) এক আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, ‘বিকাশ, এদেশে আপনাকে দুদলের এক পক্ষের হতে হবে। তা না হলে আপনাকে নানা বাধাপ্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে।’ এই মন্তব্য যে তার মনের ভেতর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তা বলা বাহুল্য, যদিও এই নিয়ে সরাসরি কোন অভিযোগ তিনি কখনো করেছেন বলে মনে পড়ে না। দুর্ভাগ্য, তার মত দক্ষ ও জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে তার জীবনের শেষ দিকটায় কয়েকটি টিভি চ্যানেল কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। এই নিয়ে একবার প্রশ্ন রেখেছিলাম এই পাতায় প্রকাশিত এক লেখায়– ‘মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কি দোষ তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সহোদর?’

বন্ধু, সহকর্মী, পরামর্শক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে লিখতে গেলে কয়েক দফায়ও লেখা শেষ হবে না। কেবল সময়ের বিচার্যে তার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক অর্থাৎ ৩৫ বছর। অনেকে তো ৩৫এ পৌঁছুনোর আগেই পৌঁছে যায় নাফেরার দেশে, চিরদিনের তরে। পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা, অথচ মনে হয় এইতো সেদিন, রৌদ্রস্নাত এক সকালে রিকশা নিয়ে হাজির হয়েছিলাম, ঢাকার সার্কিট হাউস রোডের তিন তলা চমৎকার এক ভবনে। তখন আমি ঢাকায় সাংবাদিকতা করি। ঢাকায় এসেছি বছর খানেক। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সোজা জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কামরা। তার সাথে এর আগে সম্মুখসাক্ষাৎ হয়নি।

কেবল তাকে জানতাম। তখন তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় টিভি ব্যক্তিত্ব, লেখক, সাংবাদিক। হাত বাড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে তার টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে বসে আমার আসার উদ্দেশ্য বলি। বলি, ‘প্রেস ইনস্টিটিউটে আমার চাকরিটা হয়ে গেছে, পরিচিত হতে এলাম।’ প্রথম দিনেই মনে হলো তিনি অনেক দিনের চেনা। ঠিক তার পাশের কামরায় হলো আমার ঠাঁই। তিন বছর পাশাপাশি একসাথে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন আমার সিনিয়র কলিগ। কিন্তু খুব বেশিদিন লাগেনি, কলিগ থেকে আমরা হয়ে গেলাম বন্ধু। কাছে থাকাকালীন গড়ে উঠা সেই বন্ধুত্বের বন্ধন আরো দৃঢ় হলো অনেক দূরে এসে। প্রেস ইনস্টিটিউটে আরামের চাকরি। সরকারি চাকরিতে যা হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত অফিস। অফিসের মিনি সাইজের সুজুকি মাইক্রো চড়ে বাসাঅফিসবাসা করতাম। যে দিকে আমার আবাস সেদিকটায় থাকতেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী কামাল লোহানী। তখন তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) তিন পরিচালকের একজন। জাহাঙ্গীর ভাই আসতেন অফিসের ভিন্ন আর এক মাইক্রোবাসে। অফিসে এসেই জাহাঙ্গীর ভাই তার কামরায় গিয়ে প্রথমে গোটা দিনের কাজের একটি তালিকা একটি ছোট কাগজের টুকরায় নোট করে নিতেন। (তার কাছ থেকে শেখা সেকর্মটি এখনো করে চলেছি)। তারপর সেদিনের বেশ কটি পত্রিকা হাতে নিয়ে আমার কামরায় এসে বসতেন। পিয়ন মিজানকে ডেকে চা দিতে বলতেন।

ইতিমধ্যে সেখানে যোগ দিতেন আর এক সহকর্মী, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম নাসিম। নাসিম ভাইও জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মত অকালে মারা গেছেন মরণ ব্যাধি ক্যান্সারে। দুজনেই আমার সিনিয়র, বয়স ও অভিজ্ঞতায়। কিন্তু দুজনেই এক সময় কলিগের গন্ডি পেরিয়ে সুহৃদ ও বন্ধু হয়ে গেলেন। আজ যে আমার টুকটাক লেখালেখি সে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কারণে। পিআইবিতে যোগ দেবার পর জাহাঙ্গীর ভাইয়ের তাগিদে দৈনিক ইত্তেফাক, নিউ নেশন, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক রোববার ইত্যাদি পত্রিকা ও সাময়িকীতে লিখতে শুরু করি। পিআইবিতে চাকরির পাশাপাশি তিনি বাইরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রকাশনা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। যেমন তখনকার সবেধন নীলমণি বিটিভি, আইসিসিডিআরবি, টোবাক্কো কোম্পানির প্রকাশনাগুলির সম্পাদনা করতেন। এর সব কটিতে আমাকে দিয়ে তিনি রিপোর্ট করিয়েছেন, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের কাজ করিয়েছেন। তাতে আমার পকেট কিছুটা ভারী হতো, সামাজিক যোগাযোগ বাড়তো, নানা জনের সাথে পরিচয় ঘটতো। আমাকে অনেকবার বলেছেন, সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রকাশিত ইংরেজি বই বাংলায় অনুবাদ করতে। বলেছিলেন, ‘আপনি কাজটি করেন, আমি পিআইবি প্রেস থেকে ছাপানোর দায়িত্ব নেবো, সে কথা দিচ্ছি।’ আমার চিরজীবনের সঙ্গী ‘আলস্য’, পিআইবিতে তিন বছর চাকরি করাকালীন সেকাজ আর করা হয়ে ওঠেনি। ১৯৯০ সালে হল্যান্ড চলে এলাম। কিন্তু উনি আমার পিছু ছাড়েননি। আমার ‘ভোঁতাকলম’ থেকে প্রথমে দৈনিক বাংলার জন্য নিয়মিত লেখা বের করিয়েছেন। এরপর দৈনিক আজাদীর জন্য। সে ১৯৯০ সালের কথা। তখন তিনি ঢাকা থেকে দৈনিক আজাদীতে নিয়মিত লিখতেন এবং একটি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। বললেন, ‘লেখা ডাকযোগে (তখন ইমেইল ছিল না) পাঠান, আমি লেখা প্রফেসর খালেদ সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দেব।’ বেশ কয়েক মাস এইভাবে চললো। প্রফেসর সাহেব অত্যন্ত যত্ন সহকারে আমার লেখাগুলি ছাপতে শুরু করলেন দৈনিক আজাদীর উপসম্পাদকীয় পাতায়। এরপর সরাসরি অরুণদার (শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক ও লেখক অরুণ দাশগুপ্ত) কাছে ডাকযোগে পাঠানো শুরু করলাম। তারই ধারাবাহিকতায় এখন পাঠাচ্ছি সুহৃদ কবিসাংবাদিক রাশেদ রউফের কাছে। কিন্তু এর কোনটাই শুরু হতো না, যদি বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আমাকে পেছন থেকে বিরামহীন না ঠেলতেন। তার কাছে যে আমার অনেক ঋণ। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর যে কী কর্মঠ, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন সে আমি অতি কাছ থেকে দেখেছি। তার কাছ থেকে কিছু কিছু জিনিশ শিখেছি। তার সম্পর্কে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন– ‘সাংবাদিক হিসাবে সে আমাদের মতামত জানতে চাইতো, উৎসাহিত করতো মত প্রকাশে, সর্বোপরি লিখতে। এমন কর্মঠ, সজীব, অন্যের সৃষ্টিশীলতায় আগ্রহী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।’ দেশে ফিবছর বিশেষ অবদানের জন্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পুরস্কার দেয়া হয় নানা ক্ষেত্রে, সাংবাদিকতা তার অন্যতম। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক এমন কী হাঁটুসমান সাংবাদিকদের অনেকেই স্বাধীনতা, একুশে পদক পেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর একজন চৌকষ ও সফল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, লেখক ও সাংবাদিকশিক্ষক হয়েও জাতীয় পর্যায়ের কোন সম্মাননা পাননি। এ দুর্ভাগ্য মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের নয়, এ আমাদের দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য জাতির। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের অকাল প্রয়াণের পর প্রকাশিত ‘অপরাজেয় মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর’ গ্রন্থে এক লেখকের মন্তব্য ছিল এমন– ‘তার দেবার যা সাধ্য ছিল, আমরা তা নেওয়ার উদারতা দেখাতে পারিনি। সামাজিক, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা আমাদের দরিদ্র করে রাখে এমন করেই।’ আজকের দিনে বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

(১৫০৭২০২৫)

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধমৃত্যুবার্ষিকীতে হুমায়ূন আহমেদের প্রতি অতল শ্রদ্ধা
পরবর্তী নিবন্ধবাণিজ্যিক লেনদেনে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব