কর্ণফুলী নদীর চরে দিগন্তবিস্তৃত কৃষিজমিতে চোখে পড়ছে হলুদ, সবুজ আর বেগুনি রঙের ফুলকপি। ব্যতিক্রমী এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন আশপাশের এলাকার মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন সেই রঙিন ক্ষেতের ছবি। অনেকেই ফিরছেন কয়েকটি রঙিন ফুলকপি হাতে নিয়ে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের পশ্চিম সরফভাটা এলাকায় কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন মওলার চরে এই ব্যতিক্রমী রঙিন ফুলকপি চাষে সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় নবীর হোসেনের ছেলে উদ্যোমী যুবক হেলাল উদ্দিন। তিনি জানান, রঙিন ফুলকপি চাষে খরচ তুলনামূলক কম হলেও লাভ বেশি। বাজারে এর চাহিদা ও মূল্য সাদা ফুলকপির চেয়ে বেশি। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে।
হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর রাঙ্গুনিয়ায় প্রথমবারের মতো প্রায় ৮০০টি রঙিন ফুলকপি চাষ করে তিনি এলাকায় বেশ সুনাম অর্জন করেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার অনলাইন থেকে বীজ সংগ্রহ করে তিন রঙের (হলুদ, সবুজ ও বেগুনি) রঙিন ফুলকপির আবাদ দ্বিগুণ পরিমাণে করেছেন। ইতোমধ্যে ফলন আসায় বিক্রিও শুরু করেছেন তিনি।
হেলালের হিসাবে, আবাদে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। তিন মাসের মধ্যে ফলন আসে এবং প্রতি কেজি রঙিন ফুলকপি পাইকারি বাজারে ৯০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।
রাঙ্গুনিয়ার একমাত্র রঙিন ফুলকপি চাষি হেলাল উদ্দিন বলেন, অনলাইনে রঙিন ফুলকপির সম্ভাবনা দেখে উৎসাহিত হই। গত বছর সফল হওয়ায় এবার দ্বিগুণ জমিতে আবাদ করেছি। গত অক্টোবরে বিদেশি একটি কোম্পানি থেকে বীজ সংগ্রহ করি। প্রথমে বাড়ির ছাদে ট্রেতে বীজ রোপণ করি। চারা উপযোগী হলে কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন মওলার চরে ১৬ শতাংশ জমিতে রোপণ করি।
তিনি আরও জানান, পাশের জমিতে মরিচ, টমেটো, বরবটি ও বাঁধাকপির চাষ রয়েছে। বাড়ির ছাদে বস্তায় আদা চাষও করছেন তিনি। কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে পোকা দমনে সেঙ ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ৮০ দিনের মধ্যে ফুলকপি পরিপক্ক হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই ক্ষেত থেকে প্রায় ২৫ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছেন তিনি। সরেজমিনে দেখা যায়, হলুদ, সবুজ ও বেগুনি রঙের ফুলকপি তুলছেন হেলাল নিজেই। ক্ষেত দেখতে আশপাশের একাধিক গ্রাম থেকে মানুষ আসছেন। কেউ রঙিন ফুলকপি হাতে নিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ সেলফি তুলছেন, আবার কেউ সরাসরি ক্ষেত থেকেই ফুলকপি কিনে নিচ্ছেন। ক্ষেত দেখতে আসা পাশের গ্রামের কৃষক আবদুল সবুর (৬২) বলেন, এই প্রথম রঙিন ফুলকপি দেখলাম। দেখতে খুব সুন্দর। আমারও এমন ফুলকপি চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তাই কাছ থেকে দেখতে এসেছি।
কৃষি কাজে আগ্রহের পেছনের গল্প জানিয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, ১০–১২ বছর আগে পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে কৃষিকাজে সহায়তা করতে গিয়ে সবজি চাষের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। চট্টগ্রাম নগরীর একটি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বেসরকারি একটি হাসপাতালে চাকরি শুরু করি। চাকরির পাশাপাশি কৃষিকাজ আমার নেশা হয়ে ওঠে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, উপজেলায় একমাত্র রঙিন ফুলকপি চাষি হেলালকে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছি। গত বছর সফল হওয়ায় এবার তিনি দ্বিগুণ জমিতে আবাদ করেছেন। তার দেখাদেখি অন্য চাষিরাও আগ্রহী হচ্ছেন। নতুন জাতের হওয়ায় রঙিন ফুলকপির চাহিদা বেশি। দাম কিছুটা বেশি হলেও এটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু এবং ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। আগ্রহী চাষিদের কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।












