একসময় বোরো ও আমন মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে ফেলে রাখা হতো ফসলি জমি। এখন দুই ফসলি এসব জমিকে তিন ফসলি করে গড়ে তুলতে কৃষকেরা রবিশস্যের আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে সরিষা চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে কৃষকদের মধ্যে।
রাঙ্গুনিয়ার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চোখে পড়ছে হলুদের সমারোহ। আগাম জাতের সরিষার হলুদ ফুলে ঢেকে গেছে মাঠের পর মাঠ। হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া সরিষা ফুল যেন প্রকৃতিতে যোগ করেছে এক অনন্য সৌন্দর্য। এ দৃশ্য মুগ্ধ করছে পথচারীসহ সকলকেই, আর প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে কৃষকের মন। বিগত কয়েক বছরে সরিষার ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় চলতি মৌসুমে কৃষকরা সরিষা চাষে আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকেছেন।
জানা যায়, গেল ৫ বছর আগেও হাতেগোনা কিছু পরিমাণ জমিতে সরিষা আবাদ হতো। তবে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে তেল ফসলের আবাদে জোর দিয়েছেন। তাই বছর বছর আবাদ দ্বিগুণ আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যেই সরিষা ফুল ফুটেছে এবং আগামী ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ফলন ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা। তবে তেল উৎপাদনের জন্য কোন ঘানি না থাকায় কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান কৃষকরা।
রাঙ্গুনিয়ায় ২০২৩ সালে ১০৪ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছিলো। এরপর ২০২৪ সালে আবাদ দ্বিগুণ বেড়ে হয় ২২০ হেক্টর। এবার ২০২৫ সালে রাঙ্গুনিয়ার ৩১৭ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে ৩৪৮ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে বলে কৃষি সমপ্রসারণ সূত্রে জানা যায়। এরমধ্যে পারুয়ায় ৪৫ হেক্টর, পোমরায় ৩৮ হেক্টর, বেতাগী ২৮ হেক্টর, পদুয়ায় ৩৬ হেক্টর, দক্ষিণ রাজানগরে ৪৪ হেক্টর, লালানগরে ৩৯ হেক্টর, পৌরসভা ও হোসনাবাদে ১৮ হেক্টর করে বাকী ইউনিয়নগুলোসহ সব মিলিয়ে এই সরিষাগুলোর আবাদ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরিষা চাষে খরচ কম এবং অল্প পরিশ্রমে লাভজনক হওয়ায় এই ফসল চাষাবাদের প্রতি কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। এছাড়া বিনাচাষে সরিষা আবাদ জনপ্রিয় হচ্ছে। ধান কাটার শেষ পর্যায়ে সরিষা বীজ ছিটিয়ে দিলেই কোনরকম মাঠ প্রস্তুত ছাড়াই সরিষার আবাদ হয়ে যায়। আট হেক্টর জমিতে এই পদ্ধতিতে আবাদ হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। শতক প্রতি আট কেজি সরিষা পাওয়া যাবে বলে কৃষকরা আশা করছেন। ৭৫–৮০ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যাবে বলে জানান তারা।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরিষা চাষে ভালো লাভ হয়, কারণ এতে খরচ কম এবং সেচ লাগে না বললেই চলে। সময় কম লাগে এবং কম সময়ে ভালো ফলন পাওয়া যায়। ১ বিঘা জমিতে বীজ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যা বাবদ প্রায় ৩–৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে বিঘায় ৫–১০ মণ সরিষা উৎপাদিত হতে পারে। প্রতি মণ ৩–৩.৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি করলে, বিঘায় ১৫–২০ হাজার টাকা আয় হয় এবং খরচ বাদে ১০–১৫ হাজার টাকা লাভ থাকে। এবার রাঙ্গুনিয়ায় সরিষার গড় ফলন প্রতি সেক্টরে ১.২–১.৫ মেট্রিক টন। সবমিলিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় প্রায় ৪৬০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ায় বেশ কয়েক জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বারি–১৪, বারি–১৭, বারি–১৮ ও বিনা–৯, বিনা–১১ জাতের আবাদ বেশি হয়েছে। হেক্টর প্রতি এক দশমিক দুই টন ফলন পাওয়া যেতে পারে। এবার উপজেলার বেতাগী, লালানগর, পোমরা, পারুয়ায় সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য এলাকাতেও মোটামুটি সরিষা আবাদ হয়েছে। সরিষা আবাদ বাড়াতে প্রণোদনা হিসেবে উপজেলার ২০০ জন কৃষকের প্রত্যেককে এক কেজি করে বীজ, ১০ কেজি এমওপি ও ১০ কেজি ডিএপি সার দেয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, উপজেলায় দিন দিন সরিষা আবাদ বাড়ছে। যেসব জমিতে চাষাবাদ হয়েছে সেগুলো আমনের পর পতিত থাকতো। কিছু জমিতে সবজি চাষ হতো। খরচ কম হওয়ায় সরিষা চাষের প্রতি স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। সরিষা আবাদের পর প্রথম অবস্থায় শাক এরপর ফলন পাওয়া যায়। সরিষা, তেল উৎপাদনের জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে দিন দিন কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।












