হরমুজ ইস্যুতে অনীহা মিত্রদের, একা হয়ে পড়লেন ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালি শত্রুদের জন্য বন্ধ থাকবে : তেহরান ড্রোন হামলায় বন্ধ দুবাই বিমানবন্দর যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে, ইরানে মার্কিন গ্রাউন্ড অপারেশনের জল্পনা

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ১৭ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ইরানযুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কার্যত একা হয়ে পড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানালেও মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা, জ্বালানি স্থাপনায় আগুন, দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন মার্কিন সেনা মোতায়েনসব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশকে সামরিক সহায়তার আহ্বান জানান ট্রাম্প। কিন্তু যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, তারা মিত্রদের সঙ্গে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলেও কোনো নেটো মিশনের অংশ হবে না এবং বৃহত্তর যুদ্ধে জড়ানোর প্রশ্নই আসে না। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াসও সরাসরি ট্রাম্পের আহ্বান নাকচ করে বলেছেন, এটি আমাদের যুদ্ধ নয়, আমরা এটি শুরু করিনি। জাপানও বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সামুদ্রিক নিরাপত্তা অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করছে না বলে জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়াও হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিষয়টি নিয়ে সতর্ক পর্যালোচনার কথা বলেছে।

মিত্রদের এই অনীহার মধ্যেই ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় অন্য দেশকে রক্ষা করে এলেও প্রয়োজনের সময় তারা পাশে দাঁড়াতে চায় না। এমনকি তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, হরমুজ ইস্যুতে মিত্ররা এগিয়ে না এলে নেটো জোটের ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের মাইন বসানো ৩০টি জাহাজ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং এখন পর্যন্ত ইরানের প্রায় সাত হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষায়, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘প্রায় নিশ্চিহ্ন’ হয়ে গেছে। তবে ইরান পাল্টা অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি তাদের শত্রুদের জন্য বন্ধ থাকবে এবং তেহরান কোনো যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার অনুরোধ করেনি।

চীনের দিকে তাকিয়ে ট্রাম্প : হরমুজ সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চেয়েছেন ট্রাম্প। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর চীন অনেকটাই নির্ভরশীল, তাই প্রণালি নিরাপদ রাখতে তাদেরও আগ্রহী হওয়া উচিত। এ কারণে চলতি মাসের শেষে নির্ধারিত তার চীন সফর নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূল না হলে সেই সফর পিছিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ : এদিকে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলেও। গতকাল ড্রোন হামলায় জ্বালানি ট্যাঙ্কে আগুন লাগার পর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট ওঠানামা। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা না হওয়া পর্যন্ত বিমান চলাচল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সময়সূচি বদলে যায় এবং যাত্রীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন। পরে কিছু ফ্লাইটকে বিকল্প হিসেবে আলমাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারা এই হামলা চালিয়েছে তা স্পষ্ট নয়, তবে ইরানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে এখন পর্যন্ত সাতজন নিহত ও অন্তত ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান আরও অন্তত তিন সপ্তাহ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটি এক লাখের বেশি রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করেছে এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

গ্রাউন্ড অপারেশনের জল্পনা : এদিকে যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জাপান থেকে প্রায় ২৫০০ মেরিনসহ একটি উভচর যুদ্ধজাহাজ পশ্চিম এশিয়ার দিকে পাঠিয়েছে। সামরিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘অ্যাম্ফিবিয়ান অ্যাসল্ট শিপ’। স্থল ও জল্তদুই পরিবেশেই সমান দক্ষতায় পরিচালিত হতে পারে এমন এই ধরনের যুদ্ধজাহাজ থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পদাতিক, আর্টিলারি এবং ট্যাঙ্ক ব্রিগেড সরাসরি স্থলভূমিতে অবতরণ করতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাপানের ওকিনাওয়ার মার্কিন নৌঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এঙপেডিশনারি ইউনিট ইতোমধ্যে পশ্চিম এশিয়ার দিকে রওনা হয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন মোতায়েন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন হয়তো যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে বলে ধারণা করছে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর হয়ে ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতিও থাকতে পারে।

যুদ্ধের বিস্তার, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন হামলার ঘটনায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধযুদ্ধে প্রথমবারের মতো ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ ছুড়ল ইরান