উত্তর চট্টগ্রামের অলিআল্লাহদের মধ্যে হযরত শাহজাহান শাহ (রা.) প্রাচীন পুরুষদের অন্যতম। তিনি সুদুর ইয়েমেন থেকে হিজরত করে বাংলাদেশে এসেছিলেন। কীর্তিমান পরিশ্রমী গবেষকদের তথ্যমতে তিনি ৫০০ বছরেরও পূর্বে লাহোর, দিল্লি, গৌড় হয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় আসেন। তাঁকে চট্টগ্রামের বারো আউলিয়াদের একজন মনে করা হয়। মহাপুরুষরা যেখানে যান সেখানেই কিছুনা কিছু জনশ্রুতি, প্রবাদ, কিংবদন্তী বা অভিনব কোনো ঘটনা চারিদিকে চাউর হয়ে যায়। এক মুখ হতে আরেক মুখে প্রচারিত হতে হতে ঘটনার বিবরণে অনেক সময় সংযোজন, বিয়োজন রঞ্জন অতিরঞ্জনও ঘটে যায়। তথাপি আদি সত্যের একটা ছোঁয়া প্রায়শ জড়িত থাকে, যা পরবর্তীতে হয়ে পড়ে ইতিহাসের উপাদান। ইতিহাসের লিখিত বিবরণ শুরু হয়েছে অনেক পরে। প্রকৃত পক্ষে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জনশ্রুতিই যুগে যুগে ইতিহাসের তথ্য উপাত্তের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। কথিত আছে হযরত শাহজাহান শাহ রা. সাতকানিয়ার উপকুলে পৌঁছে স্বীয় লাঠির প্রান্তভাগ মাটিতে পুঁতে প্রথম উচ্চারণ করেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। স্থানীয় ভাষা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক আনকোরা এক ভাষার সকল শব্দগুচ্ছ কর্ণে ও শ্রুতিতে ধারণ করার মতো মননশীলতা ও স্মৃতির তীক্ষ্ণতা সাধারণত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর থাকার কথা নয়। তাই আগন্ত্তুকের উচ্চারিত শেষ শব্দটিই তাদের স্মৃতিতে অনুরণন তুলেছিল বেশি। শব্দটা হচ্ছে ইল্লা। সে নামে নামকরণ হয়ে গেছে সাতকানিয়ার সে গ্রামের নাম। একপ্রকার নিস্তরঙ্গ জীবন যাপনে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে এ ঘটনা এক দৃষ্টি আকর্ষণী অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়। ফলে জনমনোসংযোগ এ মহান বুজুর্গের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই ধাবিত হয়। তিনি হয়ে পড়েন বিনা আয়াসে এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর চালচলন, কথা বার্তা, আচার আচরণ ব্যক্তিত্বের এক আভা বিদ্যুতের হঠাৎ এক ঝলকানির মতো ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এর পর তিনি এসে পড়েন হাটহাজারি থানার ধলই গ্রামে। সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠবে আধ্যাত্মিক এক আস্তানা, ‘ধলই শাহী দরবার শরীফ’। যা শুধু আধ্যাত্মিক চর্চা কেন্দ্র নয়, হয়ে পড়বে বিংশ শতাব্দীতে এসে ‘হককুল ইবাদের’ এক মজবুত সূতিকাগার।
কিন্তু প্রিয় জন্মভূমির মায়া ছিন্ন করে তিনি এসেছিলেন ভাগ্যের অন্বেষণে নয়, রাজ্যজয়ের অভিলাষে নয়, বাণিজ্যের লোভে নয়, প্রতিপত্তি লাভের আশায় নয়, প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় নয়, চমক সৃষ্টির প্রলোভনে নয়, দুনিয়াবী স্বার্থের ন্যূনতম কোনো প্রত্যাশায় নয়, কোনো মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, কোনো রাজা বাদশাহর অনুগ্রহ তালাশে নয়, নিছক কোনো ভ্রমণের তাড়নায়ও নয় শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে তিনি জন্মভূমির নিরাপদ আশ্রয়ের কোল ছেড়ে অচিন দেশের অনির্ভরযোগ্য প্রতিকুল পরিবেশের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। তিনি জানতেন না তাঁর দীর্ঘ চলার পথে পাহাড় পর্বতের প্রাচীর কেমন, বনজঙ্গলের শ্বাপদসংকুলের বিপদ কেমন, নদী সাগর মহাসাগরের বাধা বিঘ্ন কেমন, মানুষের প্রকৃতি কেমন,রুচির ইতিবাচক বা নেতিবাচক তারতম্য কেমন, মানুষের গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা কেমন, প্রত্যাখ্যানের তীব্রতা কেমন, মেহমানদারীর হৃদ্যতা কেমন, দুশমনীর তীব্রতা কেমন। তিনি জানতেন না তারা অতিথিপরায়ণ না আতিথ্যবিমুখ। তিনি জানতেন না এখানকার মানুষের বিশ্বাসের পঙ্খীরাজ ঘোড়া উড়াল দেয় দক্ষিণে না উত্তরে, তাদের সংস্কার বা কুসংস্কারের গতি পশ্চিমে ধাবিত হয় না পূর্বে প্রবাহিত হয়। শুধু জানতেন পৃথিবীর উত্তর মেরু হতে দক্ষিণ মেরু, পূর্বপ্রান্ত হতে পশ্চিম সীমান্ত, সূর্যের উদয়াচল থেকে অস্তাচল, উপরের সপ্তাকাশ থেকে নিচের সাত তবক জমিন জুড়ে বিরাজ করে মহান এক আল্লাহর রাজত্ব, যিনি একাধারে সার্বভৌম ও সর্বশ্রেষ্ঠ আর তথায় বাস করে শুধু আল্লাহর বান্দারা। আর বান্দার একমাত্র কাজ যে আল্লাহর বন্দেগী সে কথা জানতো কিনা তারা সেটাও জানা ছিল না তাঁর। তবে জানতেন তারা জানুুক বা না জানুক, তাদের মালিককে তারা চিনুক বা চিনুক আল্লাহর এ বান্দাদের করে তুলতে হবে আল্লাহ–সচেতন, তাদের মাঝে ঝারিত করে দিতে হবে আল্লাহর একত্ববাদের বীজ, তাদের দৈনন্দিন জীবনধারাকে দিতে হবে সংহত সংযত রূপ, মনের বক্রতাকে বদলে দিয়ে জীবনে আনতে হবে সহজ সারল্য, তাদের মধ্যকার শত্রুতাকে উপড়ে ফেলতে হবে, হিংসাবিদ্বেষের অন্যায্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে পরিয়ে দিতে হবে আলোয় ঝলমল অলঙ্কার। সৃষ্টির মাঝে তাদের মহত্ত্ব ও গুরুত্বকে বুঝিয়ে দিতে হবে, সৃষ্টির আরাধনাকে পরিহার করে তাদের মাঝে এক আল্লাহর প্রতি প্রার্থনার অনুরাগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। তাদের মাঝে প্রচার করতে হবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বাণী, জানিয়ে দিতে প্রতিটি মানুষ একই আল্লাহর সৃষ্টি, তাদের মধ্যে বর্ণ গোত্র জাতপাতের নেই কোনো ভেদাভেদ, প্রচার করতে হবে রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অমীয় উপদেশবাণী, ছড়িয়ে দিতে হবে কুরআনের শাশ্বত পয়গাম। ঠিক করে দিতে হবে তাদের জীবনের গতি ও গন্তব্য, শেখাতে হবে চলার ছন্দ, উপরে উঠার তাল ও নিচে নামার লয়। তাদের জীবনের নোঙরকে স্থাপন করতে হবে জান্নাতের চিরশান্তিময় উপকুলে, তাদের জীবন যেন কিছুতেই আছড়ে না পড়ে জাহান্নামের ভয়াবহ তটে। তাদের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে এক মজবুত হাতল, যে হাতল তওহীদের, শত আঘাতেও যা কোনোদিন ভাঙবেনা। তাদের অন্তরে প্রোথিত করে দিতে পবিত্র বাক্যের এমন এক সৃদৃঢ় বৃক্ষ যার শিকড় প্রসারিত হয়ে আছে মাটির গভীরে আর ডালপালা বিস্তৃত হয়ে থাকে আকাশের অবারিত সীমানায়।
কিন্তু আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল যিনি রাহমাতুল্লিলআলামীন হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ অভিপ্রায়কে মানবজাতিকে জানিয়ে দিতে তিনি বিদায় হজ্বের সমাবেশে লক্ষ সাহাবার উপস্থিতিতে এক কালজয়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। যা ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মুক্তিসনদ। ম্যাগনাকার্টা। সে ভাষণে তিনি সার্বজনীন মানবাধিকারের রূপরেখা মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর অন্যতম সর্বশেষ উচ্চারণ ছিল: ইয়া আইয়ুহান নাস, আস সাকিনাহ। হে মানবজাতি! তোমরা শান্তিতে থাকো।
তিনি দিকনির্দেশনামূলক সে ভাষণের একপর্যায়ে বলেছিলেন: তোমরা যারা এখানে উপস্থিত আছ, তারা এখনকার এবং অনাগতকালের সকল অনুপস্থিতদের কাছে আমার এ বাণী পৌঁছে দেবে। হয়তো যারা অনুপস্থিত আছে তারা আজকের উপস্থিতদের চাইতে আমার এ ভাষণ দ্বারা অধিক উপকৃত হবে।
উপস্থিত সাহাবাগণ তাঁর নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক সমাবেশ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর বাণী নিয়ে সাহাবাগণ পৃথিবীর দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের কাছে ঈমানের দাবিই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান। জীবন ছিল তুচ্ছ। আদর্শের মর্যাদা ছিল শীর্ষস্থানে। তাই কোনো কিছুর পরোয়া করেননি তাঁরা। আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়িত হবে আল্লাহর দেয়া জীবন। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবনিকেশ কী হতে পারে আর?
এখন মুসলমানদের জীবনের দাবির মোকাবিলায় আদর্শ পেছন দরজা দিয়ে পালায়। প্রাণ এখন তাদের জন্য প্রিয়তর। মৃত্যু ভয়ঙ্কর। জীবনের প্রতি প্রীতি মৃত্যুর প্রতি ভীতি সংখ্যায় আগের তুলনায় অধিক হয়েও তাদের জন্য নিয়ে এসেছে অপরিমেয় দুর্দশা দুর্গতি। তারা আগের মতো পাইওনিয়র নয় বরং অন্যের অনুগত ফলোয়ার। তাদের মন থেকে নিভে গেছে ঈমানের আলো, হাত থেকে খসে পড়েছে সত্যের তলোয়ার। ফলে এককালের অভাবিত উর্ধ্বমুখী অভিযাত্রীরা অধঃপতনের দিকে হয়েছে ক্রমাগত ধাবিত। যে নিচে নামে জেনে শুনে তার পতন ঠেকানোর কেউ নেই।
যা হোক। ইলা থেকে হযরত শাহজাহান শাহ রা. রওনা দিলে ধলইয়ের দিকে। ফারসী শব্দ ‘ধলই’। এর অর্থ সৈনিক। সৈনিক হয়েই এসেছিলেন তিনি। অস্ত্রধারী নন। এসেছিলেন ঈমানের দু’ধারী তলোয়ার নিয়ে। এ তলোয়ারের ক্যারিশমা যদি জানতেন পৃথিবীর রাজাবাদশাহরা তাহলে আল্লাহর অলিদের হাত থেকে সে তলোয়ার কেড়ে নেয়ার জন্য অস্ত্র হাতে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করে দিতেন। ভাগ্যিস তাঁরা আনবিক দানবিক অস্ত্রের খোঁজ জানেন জানেন না আধ্যাত্মিক, মানবিক অস্ত্রের সন্ধান। তাঁরা সিংহ চিহ্নিত আসনের অনুরাগী, আল্লাহর আরশের পায়া ধরে লটকে থাকা মূসা নবী নন। ছিন্ন বস্ত্রের নীচে লুকিয়ে থাকা ঈমানের দু’ধারী তলোয়ার নিয়ে তিনি আস্তানা গাড়লেন ‘ কোডের পাড়ে’। শটিবনে ভরা। সফেদ হলুদ ফুলে মোড়া। ঝোপঝাড় জঙ্গলে ভরপুর। ভরদুপুরেও গা চমকে উঠে এ পথে চলতে যাওয়া সাহসী পথিকদেরও। ‘জঙ্গলে মঙ্গল’ এ কথা মানুষ আবিষ্কার করেছে আরো পরে। ধলইতে মঙ্গলের মশালবাহী হয়ে এসেছিলেন তিনি। চুপচাপ আগন্তুকের কাছে ভয়ে ভিড় করে না মানুষ। নিয়মিত পাহারাদার হয়ে তাঁর চার পাশে বসে থাকে বনের বাঘ। বাঘতো আল্লাহর বান্দা। আর আল্লাহর অলিরা বাঘের সরদার। মানুষ চেনে না আল্লাহর অলিকে। চেনে বনের পশুরা। তাঁদের সান্নিধ্যে এসে পশুত্ব রূপান্তরিত হয়ে যায় মনুষ্যত্বে। মনুষ্যত্বের জয়গান গাওয়ার জন্য তাঁর আগমন। আল্লাহর রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর ইশারায় গাছ স্বস্থান ছেড়ে কাছে এসেছিল, আবুজেহেলের হাতের তালুতে লুকায়িত পাথরের কণা সাক্ষ্য দিয়েছিল কলেমার, আকাশের চাঁদ হয়ে পড়েছিল দু’টুকরো। বনের হরিনি, ক্ষুধার্ত উট অভিযোগ নিয়ে এসেছিল নবীর কাছে। আল্লাহর অলিরা সে–ই মহান নবীর প্রতিনিধি। তাঁর প্রতি আল্লাহর সুষ্টি ও সন্তুষ্টির সমপরিমাণ সালাম ও দরুদ।
বনের পশু যদি পোষ মানে তাহলে মানুষের ভেতরকার পশু কেন আল্লাহর অলির সান্নিধ্যে এসে পশুত্ব বিসর্জন দিয়ে গেয়ে উঠবে না মনুষ্যত্বের স্বতঃস্ফুর্ত জয়গান? এ জয়গানের অন্যতম রাহবার হযরত শাহজাহান রা.।
হযরত শাহজাহান রা. এর মতো সত্যের সৈনিকরা মানুষের দীলে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন ঈমানের আলোর মশাল।










