ইসলাম অর্থ শান্তি, আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পণ যা শাশ্বত, নিয়মানুগ নীতিমালা, আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মসর্বস্বতা নয়, ইসলামের মূল কথা প্রত্যেকের ভালো, সবার ভালো, সমাজের ভালো, রাষ্ট্রের ভালো। মূলত ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলাম এবং যুগে যুগে তার পূর্ণ জীবনের জন্য সীমাহীন আধ্যাত্মিক শক্তি, প্রচণ্ড জ্ঞানগরিমায় বিভূষিত করে তাঁর প্রিয় বান্দা মাহবুবদের বিশেষ বিশেষ স্থানে প্রেরণ করেছেন। যাঁদের অনন্যসাধারণ জীবন যাত্রা, প্রতিভা, ত্যাগ, উদারতা, সত্য ন্যায়ের পথে নিজেদের সম্পূর্ণ বিলীন করার কঠোরতা, সবার সাথে থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্নতায় সবার মাঝে থেকে সম্পূর্ণ অনন্যতায় উচ্চমার্গীয় আলোয় দেদীপ্যমান ও প্রোজ্জ্বল।
আখেরী নবী নূর নবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) প্রেরিত হয়েছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির হেদায়তের জন্য। তাই তিনি সারা বিশ্বের রহমত স্বরূপ, কোন একক জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। অথচ অন্যান্য নবী রসুলগণ কোন গোত্র, কোন সমপ্রদায়ের হেদায়তের জন্য আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত হয়েছিলেন। এখানেই নবী মোহাম্মদুর রসুলুল্লাহ্র বিশেষত্ব শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন নবী করিম (দ.)কে দু’ধরনের ঐশী শক্তি দিয়ে প্রেরণ করেছেন। একটা নবুয়তী বা রেসালতের শক্তি এবং অপরটা বেলায়তী শক্তি। এ নবুয়তী শক্তি বা রেসালতের শক্তিই ধর্মপ্রচারের ক্ষমতা, যার মাধ্যমে নবী করিম (দ.) শান্তির ধর্ম ইসলাম সেরা ধর্ম ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্মত সাম্য ও সৌহার্দ্যের ধর্ম ইসলামের ছায়াতলে–অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব জাতিকে আলোর পথের, মুক্তির পথের দিশা দেন। এ ক্ষমতা পূর্ববর্তী নবীদেরও ছিল যার বলে তাঁরা আল্লাহ্র একত্ববাদ প্রচার করতে সমর্থ হন। নবী করিম (দ.)’র অপর ক্ষমতাটি হলো বেলায়তী শক্তি বা স্রষ্টার গোপন রহস্য জানার শক্তি। যা চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে দেখানো, মরা গাছে ফল ফলানো এবং মেরাজে প্রভু মিলনে উৎকর্ষতা লাভ করে।
নবী করিম (দ.)’র ওফাতের পর থেকে জগৎবাসীর জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন নবী প্রেরণ সমাপ্ত করলেও মানব সমাজের লোভ লালসা হিংসা দ্বেষ খুনাখুনি অন্ধবিশ্বাস চক্রাকারে চলতে থাকার কারণে তাদেরকে সরল সোজা সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন দেখা দেয়ায় তিনি বেলায়তের ক্ষমতা সম্পন্ন অলি আল্লাহ্গণকে সংস্কারের দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান। ফলশ্রুতিতে সে সমস্ত অলিআল্লাহ্রাই আল্লাহ্র নির্দেশে যুগে যুগে দেশে দেশে সমাজে নিজেদের ত্যাগ তিতিক্ষা আচার ব্যবহার ও সাধারণ হয়েও অসাধারণত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে, তাঁদের কাছে টেনে গভীর বিশ্বাসস্থাপনে আল্লাহ্র পথে আনেন। তাই দেখতে পাই মানবজাতির ক্রান্তিকালে গাউসুল আযম পীরানে পীর দস্তগীর শেখ সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (রঃ), গাউসুল আযম শাহসূফি হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ), গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (কঃ)’র মত অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অলিআল্লাহ্দের আগমন ঘটেছে।
আমরা আজ আমাদের আলোচনা গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবো।
এদেশে যখন ইসলাম ধর্মের পালনীয় বিধানসমূহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে অনেকটা শিথিল হয়ে পড়ে, ন্যায় নীতি বিশ্বাস অনুপস্থিতের অবস্থায় পতিত হয়, হিংসা–দ্বেষ, খুনখারাবি, রাহাজানী, অবিশ্বাস, ভ্রাতৃঘাতী অবস্থা প্রায়ই সমাজ জীবনকে গ্রাস করে ফেলে। এরূপ অবস্থায় মানুষকে সৎপথ, সৎমতের দিশা দেওয়ার জন্য একজন ঐশী ক্ষমতাসম্পন্ন মহাপুরুষের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে যুগের এ ক্রান্তিলগ্নে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় ১৮২৬ খৃষ্টাব্দে ১২৪৪ সনের ১মাঘ বেলায়তে মোতলাকায়ে আহমদী (অর্গলমুক্ত ঐশী প্রেমবাদ) যুগের সূচনাকারী, আহমদী বেলায়তের ধারক, বিশ্ব ত্রাণকর্তৃত্ব সম্পন্ন মহান আধ্যাত্ম পুরুষ গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্সূফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এ ধরাধামে আবির্ভূত হন। তিনি ধরাধামে আবির্ভূত হয়ে শিক্ষাজীবনের সমাপ্তির পর কর্মজীবনে লোভ–লালসা হীন, কামনা–বাসনা হীন, নির্বিলাস জীবনযাপনকারী আল্লাহ্র প্রেমিক হয়ে নিরলস আল্লাহ্র প্রেমে মশগুল থেকে আল্লাহ্র রাস্তায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে একজন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেদায়েতকারীর মর্যাদায় বরিত হন এবং বাংলা মুলুকের জল হাওয়া সভ্যতা সংস্কৃতি পারিপার্শ্বিকতা ও সামাজিক জীবনাচারের সাথে সাজুয্য রেখে সময় এবং কালকে সামনে রেখে কাদেরীয়া চিশ্তিয়া ত্বরিকার সমন্বয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিষ্ঠিত করেন মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা বা মাইজভাণ্ডারী দর্শন। তিনি নীতি নৈতিকতায় অধিক গুরুত্ব দিয়ে আত্মোন্নয়ন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনে হেদায়তের পথে, আল্লাহ্র প্রেমিক, আল্লাহ্র পথের পথিক হওয়ার জন্য এ ত্বরিকায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন আত্মশুদ্ধির উসূলে সাবআ বা সপ্তকর্মপদ্ধতির উপর। মোল্লাদের কঠোর কঠিন ফতোয়ায় ইসলামের সত্যিকার অবস্থাকে যে কঠোরতা দান করেছিল, ধর্মকে আচার সর্বস্ব পরিণত করেছিল তাকে ইসলামের সত্যিকার প্রেমবাদ, সামপ্রদায়িক গোঁড়ামী, ধর্মীয় কৌলিন্য, সামাজিক উঁচু নীচু ভেদাভেদকে পরিহার করে উদার প্রেমপূর্ণ সামাজিক ক্ষমতা ধর্মীয় সমতা, আর্থিক বৈষম্যহীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন এ মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা। মানুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের সর্বৈব কল্যাণের দিক নির্দেশনা যেখানে অতি সূক্ষ্মভাবে নিহিত।
এ ত্বরিকার সপ্তকর্মপদ্ধতি ব্যক্তিকে উন্নতচরিত্রের অধিকারী, পরিবারকে অটুট চরিত্রে আল্লাহ্মুখী, সমাজকে সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, পরার্থপরতা, শৃঙ্খলাবোধ ও সামষ্টিক উন্নতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে। এবং সমাজের এ সামষ্টিক সচেতনতা, নিঃস্বার্থ জীবনযাপন, পরশ্রীকাতরতাহীনতা, পরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, পরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা, স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং একটি রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে, করতে পারে গোটা বিশ্বকে এক একটি কল্যাণ রাষ্টের সামষ্টিক রাষ্ট্র, যেখানে ধর্ম নয়, জাত নয়, দেশ নয়, গোটা মানব জাতিরই এ বিশ্ব, এখানে সকলের অধিকার সমান। যার যার অবস্থান থেকে স্রষ্টার প্রতি আস্থাশীল হয়ে বসবাস করার সবার অধিকার রয়েছে। পুরো বিশ্ব স্রষ্টার। রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তির অবস্থান সবই স্রষ্টার এক্তিয়ারভূক্ত। এ সময়ে আমাদের বড় প্রয়োজন মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা জানা ও বুঝা। যাতে এর ছায়াতলে থেকে তাকওয়াপূর্ণ জীবন গড়ে আমাদের পক্ষে আল্লাহ্র কাছে অবধারিত গমন এবং মিলন সহজ হয়।
সেই বিচার সাম্যের আদলেই মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকায় ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার জন্য সুন্দর নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী প্রবর্তিত মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার সেই সপ্তকর্ম পদ্ধতি হলো–
ফানায়ে ছালাছা বা মানুষকে উর্ধ্বমুখী করার ৩টি ব্যবস্থা (১) স্বাবলম্বী হয়ে জীবন ধারণ করা। অপরের উপর নির্ভরশীল না থাকা। (২) অনর্থক কাজ বা কথা থেকে বিরত থেকে প্রয়োজনের বাইরে কাজ বা কথা না বলা। (৩) নিজ ইচ্ছাকে খোদার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া তথা আল্লাহ্র উপর সর্ববিষয়ে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকা। তাছাড়া বাসনার চতুর্বিধ দমন তথা মৃত্যু বা মউতে আরফা হলো– (১) ত্যাগ, সংযম ও নির্ধারিত সময়ে উপবাসে জীবন পরিচালনা তথা সাদা মৃত্যু। (২) সহনশীল ধৈর্যপূর্ণ জীবন ধারণের কাল মৃত্যু। (৩) লোভ–লালসা, কামনা–বাসনা পরিহারে জৈবিক মৃত্যু। (৪) নির্বিলাস জীবন যাপনের সবুজ মৃত্যু।
মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার এ সাত নির্দেশনা যদি ব্যক্তি জীবনে পালিত হয় পারিবারিক জীবনের সকল অশান্তি অবিশ্বাস দূর হয়ে জীবন সুন্দর ও সুখী হবে। সামাজিক জীবন সৌহার্দপূর্ণ, শ্রদ্ধাশীল, নমনীয়, পরোপকারী, নিঃস্বার্থবাদী হবে। রাষ্ট্রীয় জীবনে অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গড়ে উঠবে। আত্মিক ও নৈতিক জীবন যথোপযুক্তভাবে গঠিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সহনশীল, শ্রদ্ধাশীল, উদার, ত্যাগী, বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। বিচারিক সাম্যে ও স্বাধীনতার নীতিতে সবার প্রতি ভালোবাসায় রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সংগঠক











