হত্যার প্রতিশোধ নেবে ইরান,বন্ধ থাকবে হরমুজ প্রণালি

প্রথম বার্তায় হুঁশিয়ারি মুজতাবা খামেনির মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা

আজাদী ডেস্ক | শুক্রবার , ১৩ মার্চ, ২০২৬ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া প্রথম বার্তায় ইরানিদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে ইরান কোনো দ্বিধা করবে না। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। বলেন, ঘাঁটিগুলো বন্ধ না হলে সেগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে জানা যায়, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার দেওয়া এই বার্তায় মুজতাবা খামেনি বলেন, ইরানের জনগণ ও দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চালানো হামলার জবাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমাদের শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। যারা ইরানের জনগণের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। তার বক্তব্যে বিশেষভাবে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের স্কুলে ইসরায়েলি হামলার কথা তুলে ধরেন তিনি। ওই হামলায় ১৬৮ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১১০ জনই শিশু। মুজতাবা খামেনি বলেন, এই হামলা ইরানের জনগণের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে এবং এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

মুজতাবা খামেনি তার বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিষয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, এই ঘাঁটিগুলোকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে এবং এসব ঘাঁটি আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করা উচিত। অন্যথায় সেগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শত্রুতা চায় না। বরং তেহরান আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তার ভাষায়, আমাদের লক্ষ্য কোনো প্রতিবেশী দেশ নয়। কিন্তু যে দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি রেখে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে, তাদেরকে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

মুজতাবা খামেনি তার বক্তব্যে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তেহরানের শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে এই প্রণালিকে ব্যবহার করা হতে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নৌপথ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান করিডোর। বিশ্বের প্রায় একপঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের জনগণের প্রতি ইস্পাত কঠিন সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন মুজতাবা খামেনি। তিনি বলেন, এই সংকটের সময়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূরে রেখে সবাইকে দেশের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আর্থিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে তেহরান ঘোষণা করে। ওই হামলার পরপরই দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘাত দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। এরপর প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দেন। খামেনির মৃত্যুর পর ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস মুজতাবা খামেনিকে ইসলামি বিপ্লবের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, মুজতাবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান তার কঠোর অবস্থান আরও জোরালোভাবে বজায় রাখবে।

এদিকে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্রুত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, শুরু থেকেই তেহরান সতর্ক করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ইরানের হাতে এখনো বহু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তুলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইসরায়েলি হামলায় ইউনেস্কো স্বীকৃত কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি চতুর্দশ শতাব্দীর পুরনো। তিনি ইউনেস্কোর প্রতি এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এবং আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করেন।

ইরানইসরায়েল সংঘাত ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হামলায় একজন নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরান ও ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরাকে অবস্থিত একটি ইতালীয় সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ইরবিলে অবস্থানরত ব্রিটিশ বাহিনী কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের শায়বাহ তেল স্থাপনার দিকে আসা একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব ইরানের ভেতরেও বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির ভেতরে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন দ্রুত বাড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও। পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও বাড়লে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বক্তব্য যখন প্রচার হচ্ছিল, ঠিক সেই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বক্তব্য দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশালে তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ, তাই তেলের দাম যখন বাড়ে, আমরা তখন অনেক টাকা আয় করি। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার কাছে এর চেয়েও বড় স্বার্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের মতো একটি শয়তান সাম্রাজ্যকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকে ধ্বংস করা থেকে থামানো। কখনোই আমি তা হতে দেব না।

এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের সামপ্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। বাহরাইনের উত্থাপিত ওই প্রস্তাবের পক্ষে ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩টি দেশ ভোট দেয়। তবে রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত থাকে। রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, প্রস্তাবটিতে ইরানের ওপর হামলা চালানো পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে কোনো নিন্দা না থাকায় এটি ভারসাম্যহীন।

সংঘাত ক্রমশ তীব্র হওয়ার এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত তৈরি করতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল যুবদল নেতার
পরবর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা