শাহ্ ছাহেব কেবলার পরিবারের সাথে আমাদের আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে। তাঁর নানার বাড়ি আমাদের বাড়ি। ফলে আমাদের বাড়িতে প্রতিনিয়ত তিনি আসা–যাওয়া করতেন। যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকে বাবাজানকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। শাহ্ছাহেবের মাথা মোবারক গোলগাল (সাজ্জাদানশীন হযরত মাওলানা আবুল ফয়েজ শাহে‘র মতো), বেশিসময় মাথা ন্যাড়া করে ফেলতেন। শরীর থেকে সবসময় একটি সুঘ্রাণ পাওয়া যেতো। এমন কী যে পথে পথ চলতেন সেদিকে সুঘ্রাণে সুবাসিত হতো। লম্বা পা ফেলে দ্রুতগতিতে হাঁটতেন। বেশিরভাগ সময় চেয়ারে পা মোবারক তুলে হাঁটুর ওপর দুহাত সোজা করে বস্ত্রহীন হয়ে লুঙ্গিটা কাঁধের ওপর দিয়ে বসে থাকতেন। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, মাঝে মধ্যে মুচকি হাসতেন, অট্টহাসি কখনো দিতেন না। অধিকাংশ সময় আল্লাহর ভাবে বিভোর থাকতেন। এসময় কেউ সহজে সম্মুখে যাওয়ার সাহস পেতো না। স্বাভাবিক অবস্থায় সবার সাথে সুললিত ও মার্জিত ভাষায়, এমনকী শিশুর সাথেও ‘আপনি‘ সম্বোধনপূর্বক কথা বলতেন। তিনি ছিলেন আদবের সম্রাট।
তিনি মাতৃগর্ভজাত আউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও সাধনা করেছেন। প্রতিনিয়ত নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। মহান রাব্বুল আলামিনের সত্তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার জন্য স্বীয় অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েছেন। রাতে ঘুমাতেন না বললেই চলে। অনেক সময় রাতে স্বীয় বিছানায় মুত্রত্যাগ করতেন যাতে ইচ্ছা হলেও নিদ্রাযাপন করতে না পারেন। মাসের পর মাস মাঘের কনকনে শীতে পুকুরে ডুবে থাকতেন। শুধু নাক মোবারক দেখা যেতো, আবার গরমের মধ্যে গরম কাপড় পরতেন। রেললাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পা দিয়ে রক্ত ঝড়তো। আল্লাহর প্রতি এতই নিবেদিত ছিলেন যে, জাগতিক কোনো মোহ ছিল না।
তিনি প্রায়শই আমাদের ঘরে অবস্থান নিতেন। অনেক সময় দিনের পর দিন আমাদের কাছারি ঘরে ঘুমাতেন। আবার কোনো সময় ভক্ত–অনুরক্তদের বিরক্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য আমাদের ঘরে অবস্থানের কারণ ছিল। আমরা, বাড়ির ছেলেমেয়েরা তাঁকে তেমন ভয় করতাম না বলে প্রায় কাছে কাছে থাকতাম। রান্নাঘর থেকে ভাত, তরকারি বা নাস্তাপানি মাঝে মধ্যে আনতে হতো যদিও বা খাওয়া–দাওয়ার প্রতি তাঁর ছিল দারুণ অনীহা। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে–একদা সকালবেলা শাহ্ছাহেব হুজুর হঠাৎ কোথা থেকে আমাদের ঘরে উপস্থিত হয়ে আমার দাদীকে বললেন-‘ভাত খাবো’। দাদী ছিলেন শাহ্ছাহেবের মামী। তখন আমি রান্নাঘর থেকে ভাত, তরকারি, মাছ, মাংস তাঁর সামনে এনে দিলাম। সেদিন আমাদের ঘরে যা রান্না হয়েছিল সবকটি দেয়ার পরও তিনি বারবার বলছিলেন রান্নাঘরে বেগুন তরকারি আছে, সেটিও নিয়ে আসেন। যেহেতু রান্নাঘর দূরে ছিল, আমি দৌড়ে গেলাম এবং আমার মা – দাদীকে বলি, ‘রান্নাঘরে ডেকচিতে নাকি বেগুন আছে তোমরা তা দাওনি’। এই অবস্থায় মা–দাদীরা সবাই হতবাক হয়ে বলেন, ঐ বেগুন তরকারি গতরাতে রান্না করা বাসি ছিল বলেই তা দিইনি। এতদূরে রান্নাঘরের ডেকচিতে কী কী তরকারি আছে অন্যের জানার কথা নয়। কিন্তু শাহছাহেব (রহ.) মহান আল্লাহর অলি। তাই আত্মিকভাবে জানা হয়ে গেছে।
আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন আমাদের সামনের রুমে আমার পড়ালেখার টেবিল, বই, খাতা সাজানো থাকতো। মাঝে মাঝে দেখতাম শাহ্ছাহেব হুজুর হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার কক্ষে ঢুকে আমার সাদা খালি খাতা নিজ হাতে নিয়ে কলম দিয়ে লেখা শুরু করতেন। একদিন ইংরেজিতে লিখলেন Minister, MP, D.C ইত্যাদি প্রশাসনিক বিভিন্ন পদের কথা। এভাবে প্রায় পুরো খাতাটা লিখে শেষ করে দিতেন। তখন তো তাঁর কেরামত বুঝে ওঠার সময় আমার হয়নি বিধায় মন খারাপ করতাম অথবা মা–বাবা–দাদীকে দৌড়ে গিয়ে বলতাম। শাহ্ছাহেব (রহ.)-কে কেউ বারণ করার সাহস করতেন না। আমার দাদী যেহেতু বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন এবং মামী হিসেবে মাঝে মধ্যে এসে আমার খাতার ওপর এভাবে লেখার কারণ জানতে চাইলে বাবাজান তখন একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে যেতেন। সেদিনের সে খাতায় লেখার ঘটনার কেরামত না বুঝলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় থেকে আজ অবধি এর উপকারিতা আমার নিজের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাঁর দয়ায় আমি সংসদ সদস্য হয়েছি।
পাকিস্তান আমলে রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আমার বাবা মরহুম আবুল হোসেন শাহ চৌধুরী রেলওয়ে বিভাগে অফিসার পদে শহরে চাকরি করতেন। তিনি নাজিরহাটে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন। প্রতি রোববারে আমার বাবা যখন বাড়িতে থাকতেন তখন মাঝে মাঝে আসরের নামাজের পর বিকেলে দেখি হঠাৎ শাহছাহেব হুজুর (রহ.) কোথা থেকে ঘরের উপস্থিত হয়ে আমার বাবাকে নাম ধরে সুন্দরভাবে ডাকাডাকি করতেন। বাবা ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে সামনে উপস্থিত হলে তিনি বলতেন, মাথায় টুপি পরিধান করে তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য। বাবা শাহ্ ছাহেবের সাথে হাঁটতেন এবং বাড়ির সামনের বিলের মধ্যে জলাশয়ের মতো পরিতাক্ত খালি জায়গার নিয়ে এখানে ঘোরাতেন। শুধু বলতেন– জায়গাটা দেখেন। পরবর্তীতে ঐ জায়গাতে আমার বাবার হাতে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঈদগাহ নির্মিত হয়।
আরেকটি ঘটনা – একদিন শাহছাহেব কেবলার বাড়িতে রাতে আমার চাচা আব্দুল হাই, সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা আবুল ফয়েজ শাহের সাথে আড্ডারত। তাদের চিন্তাভাবনা ছিল আজ রাতটা আড্ডা ও গল্পগুজবের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে। গল্পরত অবস্থায় হঠাৎ শাহ ছাহেবকেবলা এসে চিৎকার ও চেঁচামেচি শুরু করে আব্দুল হাইকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। শাহ্ ছাহেব কেবলার ভয়ে বাড়ি যাওয়ার কথা বলে কিছুদূর গিয়ে পুনরায় ফিরে আসেন। এদিকে বাবাজানকে খুবই অস্থির মনে হচ্ছে দেখে হযরত মাওলানা আবুল ফয়েজ শাহ চিন্তা করলেন –তার অস্থিরতার পেছনে নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। এর পূর্বেও তারা রাতব্যাপী আড্ডারত ছিলেন কিন্তু বাবাজান কখনো কিছু বলেননি। এর কারণ বুঝতে পেরে আব্দুল হাইকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি বাড়ি যাননি। এইবার বাবাজান জোরপূর্বক তাকে বাড়িতে ফেরত পাঠান। আর গালাগালি করতে থাকেন। বাবাজানের ভয়ে তিনিও এইবার বাড়ি ফিরে যান। তাঁর কী শান, তিনি বাড়ি পৌঁছার পর প্রচণ্ড তুফান শুরু হয়, তুফানে অনেকের বাড়িঘর উপড়িয়ে নিয়ে যায়। তখন তিনি বুঝলেন যে, কেন শাহ ছাহেব কেবলা তাকে জোরপূর্বক বাড়িতে ফেরত পাঠান।
এভাবে বলতে গেলে বাবাজান অনেক কেরামত বাবাজান দেখিয়েছেন, দয়া করেছেন, যা বলে শেষ হবে না। তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। সকল ধর্মের মানুষ তার দয়ায় সিক্ত হয়েছেন। তাঁর জীবন দর্শন থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। তিনি সবসময় বলতেন– ‘সুবুদ্ধির পথে চলো’। সুবুদ্ধিতেই সর্বশান্তি নিহিত। তিনি বলতেন, ‘সুবুদ্ধিতে খোদা, সুবুদ্ধিতে রসুল(দ.), সুবুদ্ধিতে কুরআন, সুবুদ্ধিতে ইসলাম, সুবুদ্ধিতে ঈমান, সুবুদ্ধিতে মানবতা’। যা সকলের জীবনের পাথেয়।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য (ফটিকছড়ি) ও সাবেক ভি পি (চাকসু)।











