
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম–এর প্রাক্তন উপাচার্য, বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ ১৯ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে রাতের শেষ প্রহরে (আনুমানিক রাত ৩টা) নিজ বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রাবাসে একসাথে থাকার সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলেজ জীবনে আমরা একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং একই দলের সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন আমার নিকট ছোট ভাইয়ের মতো প্রিয়। পরবর্তীতে আমি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করলে তাঁকে উপাচার্য হিসেবে পাই। তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য এবং প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি স্থাপন ও বিকাশে তাঁর ছিল অসামান্য ও দৃঢ় অবদান।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের ব্যবসায় শিক্ষা অঙ্গন এবং জাতীয় উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং মহান আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন–এই প্রার্থনা জানাই। তাঁর মৃত্যুতে শুভানুধ্যায়ীদের অবগতির জন্য উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালে প্রকাশিত আমার রচিত ‘স্মৃতির আলোকে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ’ গ্রন্থের ২৩৯–২৪১ পৃষ্ঠায় তাঁর সম্মতিক্রমে একটি সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত প্রকাশিত হয়েছিল, যা এখানে কিছু সংযুক্তিসহকারে উপস্থাপন করা হলো–
প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ ১৯৫১ সালের ১ মে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত দক্ষিণ ঢেমশা হাছামতর কুল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছৈয়দুর রহমান এবং মাতা আছিয়া খাতুন। তিনি ছিলেন পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র।
শৈশবে সাতকানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে এবং শুরু থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯৬৭ সালে সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে বাণিজ্য বিভাগে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এমন কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল তাঁর অধ্যবসায়, আত্মনিবেদন ও প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
একই বছরে তিনি ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে বাণিজ্য বিভাগে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নির্বাচনী প্যানেল ‘দিশারী’র আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং কলেজ ছাত্র সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ছাত্রাবাসে অবস্থান করে তিনি নেতৃত্ব, সংগঠন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গুণাবলি বিকশিত করেন।
১৯৭২–৭৩ শিক্ষাবর্ষে, তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র থাকা অবস্থায়, তিনি ছাত্রলীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্র সংসদের সহ–সভাপতি (ভিপি) পদে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একই সঙ্গে বিকম (অনার্স) পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তিনি প্রমাণ করেন যে, নেতৃত্ব ও শিক্ষার উৎকর্ষ একসাথে অর্জন সম্ভব। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তিনি দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার পরিচয় দেন।
পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। শিক্ষা জীবন শেষে তিনি একই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। তিনি বাণিজ্য অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর হাত ধরে বহু শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ব্যবস্থাপনা শিক্ষাকে আধুনিক, সময়োপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে তিনি এমবিএ প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে তিনি শিক্ষক সমাজের অধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে গণমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গবেষণাভিত্তিক করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল–শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
১৯৮০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ফিলিপাইনে গমন করেন এবং সেখানে একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশি–বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায় শিক্ষা ও গবেষণাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়–এর প্রো–ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও মানবিক নেতৃত্বের গুণে তিনি এই দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়–এর ব্যবস্থাপনা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা, গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালের ১৫ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে নিরলসভাবে কাজ করেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, একাডেমিক পরিবেশের উন্নতি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে তাঁর উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়।
শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, আর্থসামাজিক উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল–একটি উন্নত জাতি গঠনের মূল ভিত্তি হলো সুশিক্ষা, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের দক্ষ পেশাজীবীর পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।
প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ ২০০০ সালে পবিত্র হজ পালন করেন। তিনি সাতকানিয়ার গারাঙ্গিয়া বড় হুজুর কেবলা (রহ.) ও ছোট হুজুর কেবলা (রহ.)-এর একজন একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। ধর্মীয় অনুশাসন, মানবিকতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে তিনি নিজের জীবন পরিচালনা করেছেন এবং অন্যদেরও সে পথে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
সব মিলিয়ে, প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, দক্ষ প্রশাসক, দূরদর্শী শিক্ষানায়ক এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এক আলোকিত মানুষ। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। দেশ ও জাতি গঠনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।













