মহৎ গুণের অধিকারী মানুষের সংখ্যা বিরল। মানুষের বিনয়, ভদ্রতা, আচরণ, কর্তব্যপালনের আন্তরিক ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তাঁকে অন্য দশজন মানুষ থেকে আলাদা করে। ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে ফজলুল হক তেমনি এক বিরলপ্রজ ব্যক্তিত্ব। লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকা মানুষটির কর্মই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করার মন্ত্র হিসেবে সাহস যুগিয়েছে। তাঁকে আমি দেখিনি। কিন্তু তাঁর সন্তানদের কাছে এবং তাঁর সম্পর্কে পড়ে জেনেছি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশ–বিদেশের মানুষ তাঁকে কতটা ভালো জানতেন। তিনি মূলত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পেশা শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ছাত্র–ছাত্রীদের যেমন পরম স্নেহে পাঠদান করতেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তিনি নিজে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং এলাকার মানুষদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।
দেশের প্রতি, দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণা যুগিয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে শত্রুমুক্ত করার এবং দেশের শত্রু স্বাধীনতা বিরোধীদের অত্যাচারের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। সকলেই তাঁর উপর দায়িত্ব অর্পণ করে নির্ভার থাকতে পারতেন। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘তোমাদের মত অনেক নেতা, কর্মী আছে বলেই আমি যেকোনো ঝুঁকি নিতে ভয় পাইনা’। তিনি ছিলেন সত্যিকারের দেশ প্রেমিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার নির্মল চন্দ্র দে বলেছেন-‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রাউজানের ১১নং পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মরহুম এ.কে ফজলুল হক সাহেবের বড় অবদান হল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুজিব বাহিনী গঠন করা এবং সঠিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা’।
ফজলুল হক সাহেব যে সকল লোভ লালসা থেকে বিরত ছিলেন তাঁর প্রমাণ মিলে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল নোমান সাহেবের লেখায়, ‘বলতে দ্বিধা নেই, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার বহু চেষ্টার পরেও আমরা ব্যর্থ হই। তিনি তাঁর আওয়ামী রাজনীতির বাইরে গিয়ে অন্য কোনো রাজনীতি করতে অস্বীকৃতি জানান। যদিও তাঁর অনেক সহযাত্রীকে আমরা সহজে আমাদের সাথে পেয়েছি’। বঙ্গবন্ধুর ভাগিনা ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সেলিম এমপি বলেন, ‘যে কয়েকজন তরুণকে তাঁদের রাজনৈতিক জীবনে শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শেখ মুজিব, শেখ ফজলুল হক মণির স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগ লাভ করতে দেখেছি এ.কে ফজলুল হক তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির একজন’।
খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ, স্বীকৃতি, সম্মান কোনো কিছুই তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা লোভের বশবর্তী হয়ে ব্যবহার করেননি। আর দশজনের মতো তাঁরও নিজের একটি জীবন ছিলো। সেটি ছিলো তাঁর পোশাকের মতো সাধারণ এবং শ্বেতশুভ্র, তাঁর বাড়ি ছিলো মাটির ডেলায় বানানো। কিন্তু পবিত্র। এইখানেই তাঁর অনন্যতা। যেন অতি সহজেই তিনি অসাধারণ হয়ে উঠেছেন। যেন অসাধারণ হওয়া বড় সহজ কাজ, যেন জীবনের গ্লানি ও মালিন্য কাটিয়ে পবিত্র জীবন–যাপন কত সহজ।
এ.কে ফজলুল হক সম্পর্কে সত্য এবং সুন্দর কথাগুলো বলেছেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ আলম।
‘নাতিদীর্ঘ জীবনে অনেক চড়াই–উতরাই পেরিয়েছেন। অনেক ভাঙা–গড়া দেখেছেন, দেখেছেন সামপ্রদায়িক পাকিস্তানের দুঃশাসন, সরাসরি সংযুক্ত হয়েছেন ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশকে পুনঃনির্মাণের কারিগর হিসেবে জাতির পিতার আরাধ্য ও দীক্ষিত সন্তান হিসেবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের অনেকের কাণ্ডারি। কারো কারো অভিভাবকও। তাঁর মধ্যে আমরা বিবেকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেতাম, তাঁর ভূমিকায় খুঁজে পেতাম সত্য পথের দিশা। পাকিস্তান আমল আর স্বাধীন বাংলাদেশে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রায় একইভাবে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁকে শরিক থাকতে হয়েছে। যতো বয়স বেড়েছে, তাঁর তারুণ্যের তেজ ও প্রতিবাদী চেতনা যেন ততই জোরদার হয়েছে। নিজের জন্য নির্দিষ্ট ছিলো সাদামাটা সহজ জীবন, কিন্তু সেই জীবনের ভূমিকা ছিলো সবার জন্য নিবেদিত। সামান্য ব্যক্তির জীবন কী করে সবার হয়ে যায়, কীভাবে অসামান্য, অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠে, তাঁর জীবন ছিলো তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’
বিশিষ্ট রাজনীতিক মোহাম্মদ নাসিম তাঁর লেখায় এ.কে ফজলুল হককে তুলে এনেছেন এভাবে-‘আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর অবদান অপরিসীম। একজন দক্ষ সফল সংগঠক হিসেবে তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা চট্টগ্রাম ও রাউজানে নেতাকর্মীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের সাথে তিনি বেঈমানি করেননি। সৎ রাজনীতির মধ্যে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দরদি মনের মানুষ ছিলেন এ.কে ফজলুল হক।
সবার চোখে তিনি যে একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কবি শওকত হাফিজ খান রুশ্নি (যুদ্ধকালীন রাউজান মুজিব বাহিনীর প্রধান) তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে ফজলুল হক’ প্রবন্ধে পরম আন্তরিকতায় তুলে এনেছেন। ভাষাসৈনিক মাহবুব–উল–আলম চৌধুরীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, ‘১৯৫০ সালে আণবিক বোমা নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গঠিত বিশ্বশান্তি পরিষদের চট্টগ্রাম শাখায় তাঁদের সাথে ফজলুল হক ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলনে তিনি অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা এবং সাংগঠনিক সম্পাদক। ফজলুল হক সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও বিরামহীন কাজ করেছেন এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলনে মাহবুব–উল–আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিনিও যোগ দেন।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান–এর বয়ানে আমরা জানতে পারি, ‘১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকালে এ.কে ফজলুল হকের সাথে তাঁর পরিচয়। পরবর্তীতে সখ্য। সেই সখ্য আরো প্রগাঢ় হয় ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্যদিয়ে’। তিনি বলেন, ‘১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত চট্টগ্রামে অবস্থানকালে ফজলুল হক সাহেবের সাথে আমার নিবিড় বন্ধুতা চলমান ছিলো। এর মধ্যে যুদ্ধকালীন তথা ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ আমরা কুণ্ডেশ্বরী ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করি। সে সময়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি পশ্চিম গুজরায় বেশ ক’বার যাওয়া–আসা করেছি নানাভাবেই। আমাদের অনেকেই তাঁর সাথে গভীর যোগাযোগ রাখতেন। তিনি পরম বন্ধুবৎসল এবং আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। যুদ্ধকালীন রাউজানে তাঁদের বাড়ি ‘ওছমান আলী মাস্টার বাড়ি’তে ছিলো স্বীয় ইউনিয়নের প্রধানতম সেল্টার হাউজ। তিনি সেল্টার মাস্টার হিসেবে রাউজানে স্ব–নামে খ্যাত ছিলেন। নিজেদের বাড়ি ছাড়াও হাটহাজারী–রাউজানের অসংখ্য সেল্টার হাউজ তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী রাজনীতি এবং বহুমাত্রিক সমাজকর্মে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন ফজলুল হক। আধুনিক মানুষ ও জনদরদী এ.কে ফজলুল হককে শুদ্ধ রাজনীতির অভিভাবকতুল্য নেতা হিসেবে গণ্য করা যায়। আমরা একেবারে ঢাকা ফিরে গেলেও যোগাযোগহীনতা হয়েছে ঠিকই, তবে আন্তরিকতা বজায় ছিল আমৃত্যু।’
এছাড়াও তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ভাষাসৈনিক, রাজনীতিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক ও লেখক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী, বিশিষ্ট রাজনীতিক ভাষাবিদ এমএ ওয়াদুদ, শিল্পী মুর্তজা বশীর, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, সাবেক গণপরিষদ সদস্য আবু ছালেহ, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, কর্ণেল শওকত আলী (অব.), ভাষাসৈনিক ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল হারুন, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সহ–সভাপতি ডা. এম.এম জাকেরিয়া চৌধুরী, কাজী ইনামুল হক দানু এমন আরো অনেক রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আওয়ামী লীগ নেতা ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে ফজলুল হক সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন।
তাঁদের সকলের কথায় এটাই প্রমাণিত হয় একটু নীতিহীন হলেই তিনি দেশসেরা শিল্পপতি হতে পারতেন। প্রকৃত অর্থে এরাই দেশপ্রেমিক ছিলেন। ফজলুল হক সাহেবের মতো মানুষদের মৃত্যু নেই, তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী। বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে ফজলুল হক বেঁচে থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। তাঁর ৩৯তম মৃত্যুবাষির্কীতে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক: শিক্ষক প্রশিক্ষক ও চিন্তক।












