স্মরণের আবরণে শাহসূফী সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী

| সোমবার , ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

২রা মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ১৬ ই জানুয়ারি ২০২৬। দিবসটি শতাব্দীর স্বনামধন্য এমন এক আধ্যাত্মিক সুফি সম্রাটের প্রয়াণ দিবস যিনি হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অধ্যাত্ম শরাফতের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলার জমিনে মাইজভান্ডারি ত্বরিকার প্রবর্তক হযরত গাউছুল আজম মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (কঃ) পবিত্র রক্ত ও প্রিয় পৌত্র, মাইজভান্ডারি ত্বরিকার প্রথম ত্বাত্ত্বিক বিশ্লেষক ও রূপ উন্মোচক এক আলোকিত সংশপ্তক শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী।

দাদাজান গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারির দেওয়া এই নাম তার জীবনে বিরাট অর্থ বহন করে। দেলাওর অর্থ যোদ্ধা বা সেনাপতি হোসাইন অর্থ উত্তম। তাঁর জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, সমাজ প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আদলে মোতলাক প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন এক দুর্দান্ত সাহসী মসীযোদ্ধা।

গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারির সর্বোত্তম সেনাপতি হিসেবে জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত রাসূল পাক (দঃ) এর আদর্শ চরিত্রের সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে গেছেন অকুতোভয়ে। পিতৃ-মাতৃহীন ছিলেন বলেই শৈশব থেকেই দাদাজান গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারির মহব্বত এবং ছোহব্বতে লালিত পালিত হয়ে জীবনের ভীত গঠন হয়। তিনি আদর করে ডাকতেন ‘দেলাময়না’ এবং তাঁর গদী শরীফে নিজ পাশে বসিয়ে ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ ‘সুলতান’নবাব ও অছি ঘোষণা করেন এবং এলাকার সর্দার ছায়াদ উদ্দীন সাহেবকেও বলে যান যে ভবিষ্যতে তাঁর সিংহাসন স্নেহ ধন্য “দেলাময়না”ই অলংকৃত করবেন। সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী ও তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধন-জ্ঞান এবং স্বকীয় সত্তাকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিয়েছেন দাদাজানের সত্ত্বায়। তাঁর পবিত্র কালামই তার প্রমাণ।

“আমাকে দুই ভেবোনা, দুই জেনোনা, আমার নামে আলাদা কোন ওরশ ফাতেহা করোনা”। অর্থাৎ দাদাজানের সাথে তিনি এমন একাকার হয়ে মিশেছিলেন যে ওফাতের পরও তাঁকে আলাদা চোখে যেন না দেখে।

শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী ছিলেন একাধারে সুফি, কবি সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষা সম্প্রসারক,সমাজ সেবক এবং আধুনিক রেনেসাঁস ব্যাক্তি যিনি স্বকীয়তার ধর্মে-কর্মে, চিন্তা চেতনায় এলাকার রেনেসার আলো ফুটিয়েছেন। এলাকার উন্নয়নে স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার, রাস্তা নির্মাণ, ডাকঘর নির্মাণসহ অগণিত সমাজ সংস্কারে কাজ করে গেছেন।

একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে লেখনি ধারণ করেছেন, ছোট বড় ১২টি গ্রন্থ লিখেছেন। অন্যদিকে সমাজ বিনির্মাণে কজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন অনাথের আশ্রয়দাতা, দুস্থ-দুর্গতদের সেবক, সূক্ষ্মদর্শী লেখক, বারে এলাহির শান প্রচারক, জ্ঞানের সাগর ও মানবকল্যানময়ী আধ্যাত্মিক এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ।

তিনি নিজেকে কখনো ফোকাস করেন নি। অথচ তিনি সততা ও উদারতা, ধৈর্য ও মহত্ত্ব, বিশ্বাস ও ভালোবাসায়, মিতাচার ও সুরুচি, ন্যায়পরায়ণতায়, দয়া ও ক্ষমায়, সামাজিকতা ও সেবায়, এককথায় আদব ও আখলাকের গুণ গরিমায় রাসূলাল্লাহর পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ছিলেন তিনি। শুধু নিজে ধারন করেন নি সারা বিশ্ব যাতে এ আদর্শ লালন করে চরিত্রবান কল্যানকামী মানবগোষ্ঠী হতে পারে সেজন্য গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী তুবরিকা মূল উসূলে সাবআকে তাঁর লেখনির মাধ্যমে প্রচার করে গেছেন আর প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভান্ডারী সংগঠন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর গুণগরিমায় কখনো প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাঁর গুণ গরিমা চমৎকারভাবে ফোটে উঠেছে সাধক কবি ও শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী একনিষ্ঠ সেবক জনাব হারুন অর রশীদ ভান্ডারীর কাব্যের ঝংকারে।

যিনি ছিলেন শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীর শেষ জমানার সাথী, সুখ-দুঃখের সাথী, দিবা-রাত্রির সাথী যার সাথে যৌবনের ৭ টি বছর একাধারে পার করেছিলেন তিনি। মুর্শিদের গুণগরিমা তাঁকে এতই মুগ্ধ করেছিলেন যে মুর্শিদকে নিয়ে শতাধিক গীতিকবিতা লেখেন। তাঁর সবটুকু সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবুও শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীর ওফাত দিবসে তাঁর স্মরণে কবিতার কয়েকটি চরণ তুলে ধরে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি—–

“হযরতের প্রেমের খনি, ত্রিজগতে নয়নমণি
সিংহাসনের সুলতান তিনি, সর্বগুণে গুণী তিনি।”

“সোনার দেশের সোনার ময়না দেলাবাবাজান
হযরতের রাজ দরবারে অদ্বিতীয় এক সুলতান”

“আহমদ উল্লাহর প্রতিনিধি, তাঁরই প্রতিচ্ছবি
বিশ্বমাঝে প্রচার তোমার শানে আহমদী।

মানিবজাতির মুক্তির তরে সপ্তনীতি প্রচার
দেখাইলা বিশ্বজুড়ে একি চমৎকার।”

“হযরত কেবলার নবাব অছি,শাহ দেলাওর মাইজভান্ডারী
প্রেম জগতের মূল মহাজন আদি অন্ত তুমি তুমি।

হযরত কেবলার প্রেম সাগরে, দিলের ময়না বিরাজ করে,
আহমদি প্রেম কাননে,খেলে সদায় দিবানিশি
হারুন কহে তত্ত্ব ধর,আহমদের হুকুম বড়
আহমদ উল্লাহ বিশ্ব কেবলা,দিলের ময়না শাহেনশাহী।

শেষ জমানার বিপদ হতে চাহ যদি মুক্তি পেতে
সপ্তকর্মের পথ ধর, দেলাময়নার শান্তির বাণী।

হযরতের রুহে আজম,সবার সেরা তিনি উত্তম
ওয়ারিশে হযরত কেবলা,নিশান তাহার লেওয়ায়ে আহমদী।”

সব কথার মূলসার হলো শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী ছিলেন রাসুলাল্লাহর হোসাইনী নিশান, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর উত্তম সেনাপতি ও হযরত আলীর বেলায়তের উত্তম দ্বার উন্মোচক। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে তাঁর আহমদী নিশানের তলে দলে দলে সমবেত হওয়ার সুযোগ দান করুক। হারুন অর রশীদ মাইজভান্ডারীর কালামের আর দুটো চরণ দিয়ে সমাপ্তি টানছি।-

“বেলায়তের আহমদ জগতে প্রচার,নূরে আলানূর শাহ দেলাওর,
নবুয়তের সমাপ্তি,বেলায়তের উন্নতি,মূল কেন্দ্র তার আলী হায়দার।”

লেখক: জেসমিন আকতার
সহকারী শিক্ষক (ছিপাতলী জামেয়া গাউছিয়া মূঈনীয়া কামিল মাদ্রাসা)

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাস্টার দা সূর্য সেন : বিপ্লবী চেতনার প্রতীক
পরবর্তী নিবন্ধদূরের কোন গাঁয়ে