স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা

ড. ওবায়দুল করিম | বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

মানুষের জন্ম প্রাচীন অবস্থায় পরাধীনতায়। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র তখনো অস্তিত্বে আসেনি। প্রকৃতির দাস, মানুষ। পশুপাখী থেকে নিরাপদ থাকবার চেষ্টা ছিলো, উপায় জানা ছিলোনা। পশু শিকার অথবা ফলমূল সংগ্রহ করে ক্ষুধা মেটাতে হতো। প্রকৃতির কাছে ছিলো জীবন অসহায়। এই হলো প্রকৃতির কাছে মানুষের পরাধীনতা। এ ছিলো, শৃঙ্খলিত জীবনপরাধীনতা। জীবন ছিলো শৃঙ্খলিত, তবে ছিলো না শৃঙ্খলা, কারণ সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার তখনো তৈরি হয়নি।

শৃঙ্খল যা ইংরেজীতে chain আর শৃঙ্খলা হলো order বা discipline বা নিয়ম নিষ্ঠতা। শৃঙ্খলিত জীবন মূলত, indisciplined বা বিশৃঙ্খল। শৃঙ্খলা থাকেনা তখনই যখন নর্ম, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, মানব আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করেনা অথবা এই সমাজের অনুষঙ্গীগুলোর উদ্ভবই হয়নি। শৃঙ্খল জীবন মানেই বিশৃঙ্খল জীবন যেখানে সমাজ নেই, পরিবার নেই,নেই রাষ্ট্র আর নেই আইনকানুন, রীতিনীতি ইত্যাদি।এমন অবস্থাকে অনেক সময়ে নৈরাজ্যিক বা নৈরাষ্ট্রিক অবস্থা বলে। অর্থাৎ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র নামের কর্তৃত্বের প্রয়োজন। কিন্তু এই অবস্থায় কোনো কর্তৃত্বই কাজ করে না, এমনকি নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ কিছুই মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এমন অবস্থা মানুষের অসহায়ত্বকে নির্দেশ করে। এমন অবস্থা মানুষকে প্রকৃতির দাসে রূপান্তর করে। মানুষ পরাধীন এখানে। মোদ্দা কথায় শৃঙ্খলিত জীবনই হলো পরাধীন জীবন। আজকেও যেখানে সন্ত্রাস, আতংক, জঙ্গীবাদ বহাল যে সমাজে, সেই সমাজ স্বাধীনতার স্বাদ পায়না। স্বাধীনতার বোধ আসে শৃঙ্খলায়, সামাজিক সংহতিতে, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের চেতনাবোধের জাগরণে।

মানুষের সম্পর্কে, শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সৃজন। রাষ্ট্র হচ্ছে, নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে মানুষের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। রাষ্ট্র মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আইনকানুন, নিয়মনীতি তৈরি করে। সমাজ করে নর্ম, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি। এখানেও পযধরহ বা শৃঙ্খল আছে তবে শৃঙ্খলার শৃঙ্খল। আইনকানুন, রীতিনীতি, মেনে চলার শৃঙ্খল। সামাজিক সংহতি মেনে চলার শৃঙ্খল। রাষ্ট্র সৃষ্টির চুক্তিমূলক মতবাদে, বিশৃঙ্খল জীবন থেকে শৃঙ্খলিত (শৃঙ্খলাময় )জীবন প্রতিষ্ঠার জন্যই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয় বলে মনে করা হয়।

তবে রাষ্ট্র হলেই শৃঙ্খলাময় জীবন হবে এমন নয়। রাজতন্ত্রে রাজা ও অভিজাতদের সাধারণের উপর নিবর্তন, শৃঙ্খলহীন জীবন নিয়ে আসে। মধ্যযুগে ইউরোপে ডাকিনী সন্ধানের নামে, আইনী কাঠামোর অভাবে নিবর্তন চরম অবস্থায় পৌঁছেছিলো। ভূমিদাসের জীবন ছিলো সামাজিকভাবে জমির দাস হিসেবে আজীবনের পরাধীনতা। একটি সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিলো জনমতের তোয়াক্কা করে এমন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব স্থাপন। রুশোর, ‘স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী’র প্রণোদনায় ফরাসী বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়। এর জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্রের আবহ। পুঁজি ও পুঁজিবাদের বিকাশেও দরকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ। গণতন্ত্র আর কিছু নয়, জনমতের ভিত্তিতে আইনী শাসন। আর এতেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা পায়।

স্বাধীনতা মূলত দুই মাত্রার। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর নিজেদের শাসন করবার সার্বভৌম ক্ষমতা যা সরকারের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এর একটিও যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে শৃঙ্খলা বা স্বাধীনতা বাস্তব হয় না। স্বাধীনতার জন্য রাষ্ট্র আইন তৈরি করে জনগণের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থাৎ শৃঙ্খলা করবার জন্য। কোনো রাষ্ট্র গঠিত হলে, জনগণের চেতনাবোধ ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের নিমিত্তেই হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অর্জন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মের অধীন জীবনই হলো স্বাধীনতা। এজন্য আইনী সমাজের প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে, স্বাধীনতা।

১৯৪৭ এ ভারতবর্ষ বিভক্তির পরে পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়। রাষ্ট্রের আইনী ভিত্তি হচ্ছে সংবিধান। ১৯৫৬ সালের আগে কোনো সংবিধানই রচনা করতে পারেনি এই রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী। একটি ভূমি অর্জন করলেও সেই ভূমিতে বাস করেন যে জনসাধারণ, তাঁদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য কোন শৃঙ্খলা রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে ছিলো না। আর এই বিশৃঙ্খলা দেখতে পাই, রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণার মধ্যে। প্রকৃতি শুধু তার মণ্ডলের ভারসাম্যই রক্ষা করে তা নয়, যে সামাজিক জগত মানুষ তৈরি করে, তাও প্রকৃতিকে মেনে সামাজিক জগতকে নিয়মের অধীন, শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে হয়। যে কারণে মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র সৃষ্টি করলো তা উহ্য থাকলে, রাষ্ট্র সৃষ্টির উদ্দেশ্যই থাকে না।

তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, শতকরা ৫৬ ভাগ জনগণের ভাষাকে বাদ দিয়ে মাত্র ৩ শতাংশ লোকের ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করবার চিন্তা, প্রকৃতি ও সামাজিক স্থিতি বিরুদ্ধ কাজ। এ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নামান্তর। রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের অধিকার ও শৃঙ্খলা রক্ষা করবার জন্য অথচ পাকিস্তান তার জন্মের পরেই, এই উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা মানুষের অধিকারের অংশ। শুধু তাই নয়, এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য না থাকলে, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও নষ্ট হয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শুধু বাংলা ভাষার বিরুদ্ধেই নয়, বাঙালি সংস্কৃতির বিনাশের জন্য রবীন্দ্র বিরোধী, নজরুলের কবিতার বিকৃতি, রোমান হরফে বাংলা লেখার জন্য চেষ্টা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিরোধী কাজ করতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে এক ইউনিট প্রথা সৃষ্টি করে, বালুচ, সিন্ধী জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশের বিরুদ্ধেও কাজ করে। অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক শোষণ ও প্রশাসনে ও সেনাবাহিনীতে যে বৈষম্য তা‘ সমাজ সংহতি ও শৃঙ্খলা বিরোধী। এর সমার্থক হলো পরাধীনতা। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে শাসন একেবারেই অনুপস্থিত ছিলো। তেইশ বছরের আগে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে কোন নির্বাচনই হয়নি। এমনকি প্রথমবারের মতো ভোটাধিকারের ফলাফল মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরেও তারা রাজি ছিলো না। ঘনঘন সামরিক অভ্যুত্থান, গণবিরোধী শাসন দেশে নৈরাজ্যকর, বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো। বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ রাষ্ট্র বা সমাজের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সৃষ্টি করেছিলো। আর সেই রাষ্ট্রই যদি, নৈরাজ্যকর ও বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করে তখন গণমানুষের মুক্তির জন্য শান্তিপূর্ণ অথবা শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজনীয় হয়ে পরে।

পাকিস্তানী শাসনে নিপীড়িত, নিগৃহীত বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির সন্নিবেশে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়্বে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এইটি একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এক মহতী উদ্যোগ বলা যেতে পারে। কিন্তু শৃঙ্খলা আসবে কি করে? মানুষের আচরণের নিয়ন্ত্রক হচ্ছে, নর্ম, মূল্যবোধ, আদর্শ, বিশ্বাস ইত্যাদি। প্লেখানভ বলেছিলেন, each and every society is consisting of norms, values, ideology etc., and these are acquired by individuals as a member of the society বা প্রতি সমাজই নর্ম, মূল্যবোধ বা আদর্শ নিয়ে গঠিত এবং মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে তা গ্রহণ করে থাকে। উল্লেখ্য, এই হচ্ছে সামাজিকীকরণ। আর এই সামাজিকীকরণের মাধ্যমে, সামষ্টিক আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয়। সমাজ তখন হয়, শৃঙ্খলাপূর্ণ। আর শৃঙ্খলার মাঝেই আসে স্বাধীনতার পরিপূর্ণ স্বাদ। আর এই স্বাদ আস্বাদনের জন্য স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের ভেতরেই ৭ই নভেম্বরে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতির দিক নির্ণায়ক শৃঙ্খলার জন্য বহুদলীয় ব্যবস্থার উপহার দেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

পাকিস্তানী আমলে ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে এই প্রতীতি জন্মায় একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশি সমাজের বিনির্মাণে জাতির সামাজিকীকরণের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সমাজবিজ্ঞানী ডুর্খীমের কাছে সামাজিক সংহতি, সামাজিক অস্তিত্বের প্রধান শর্ত। মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ ইত্যাদি সামাজিক সংহতির জন্যই গড়ে ওঠে। আমাদের চারপাশের প্রতীক, চিহ্ন এমনকি ভাষাও শুধুমাত্র সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষায় আবির্ভূত হয়। এজন্যই রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে বসনষবস বা জাতীয় প্রতীক দেখি। রুশো যখন বলেন, বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে শৃঙ্খলায় আসবার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা চুক্তি করে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে তখন চুক্তির মাঝে সামাজিক ঐক্য সৃষ্টির উপায় হিসেবে, ধ্যানধারণা, বিশ্বাসের সৃষ্টিও উল্লেখ্য।

স্বাধীনতার দুই দ্যোতনা আছে। প্রথমটি, নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের প্রকাশ ও দ্বিতীয়টি, নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রিত আচরণ। পশু জগতে নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ ওদের রাষ্ট্র নেই, পরিবার নেই, সামাজিক প্রতিষ্ঠান নেই। মানুষের আছে। আছে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার ও হাজারো প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের আছে আইনী ভিত্তি। ফলে মানুষের জীবন হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রিত জীবন, সামাজিক সংহতি রক্ষার জীবন, অসংখ্য বন্ধনের মাঝের জীবন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো অনিয়ন্ত্রিত জীবন নয়, নিয়ন্ত্রিত জীবনের জন্যই বলেন, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়। অসংখ্য বন্ধনমাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ’। এই বন্ধন আইনের, বিশ্বাসের, চেতনার ঐক্য বোধের।

আমরা দেখি স্কুলে শিশুদের অ্যাসেম্বলি হয়। ছাত্ররা জাতীয় সঙ্গীত গায়, জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করে, এতে ওরা শৃঙ্খলা শেখে, শেখে দায়িত্ববোধ, ওদের মাঝে গড়ে ওঠে জাতীয় চেতনা, ফলে দেশ গড়বার প্রস্তুতি গড়ে ওঠে। এখানেই স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায়।

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশ হবে শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংবিধান হবে আমাদের আচরণের নিয়ন্ত্রক, গণতন্ত্র, কেবলমাত্র নিখাদ গণতন্ত্র হবে আমাদের জাতীয় আদর্শ ও আমাদের সামষ্টিক ব্যবহারের নির্দেশক, এর মান্যতাতেই আমাদের স্বাধীনতাকে বরণ করতে হবে। স্বাধীনতা তাই শৃঙ্খলার জীবন,বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তির জীবন। এক পতাকা, এক জাতীয় সঙ্গীত, আমাদের স্বাধীনতার ঐক্যের প্রতীক।

লেখক : সমাজবিজ্ঞানী; উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসেছি, আমি স্বাধীনতা
পরবর্তী নিবন্ধস্বাধীনতা আমাদের মুক্তি আর সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি