নির্বাচন যতো কাছে আসছে অস্থিরতা ততো বেড়ে চলছে। জনমনে শঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের আশঙ্কা কাটছে না। কেউ কেউ বললেও মানুষ শঙ্কামুক্ত হতে পারছে না। বক্তৃতা বিবৃতির সাথে মানুষ কোনোভাবে একমত হতে পারছে না। কেউ সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। কোনো কথা বার বার বললে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে যায় না। বিশ্বস্ততার জন্য আস্থার প্রয়োজন হয়। আস্থা একবার হারালে সহজে পুনরুদ্ধার হয় না। আস্থাহীনতায় অনেক ভালো উদ্যোগ ভেস্তে যায়। মহৎ উদ্দেশ্যেও ব্যাহত হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা যায় না। আস্থার সংকট একবার শুরু হলে আর শেষ হয় না। এজন্য নির্বাচন নিয়ে যে আশংকা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তা আর শেষ হবে না।
নির্বাচনের পূর্বশর্ত স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নির্বাচন হয় না। স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইন শৃঙ্খলার উন্নতি না হলে নির্বাচন করা যায় না। বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নির্বাচন হয় না। নির্বাচনের জন্য আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে হয়। কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে কঠোর হস্তে দমন করতে হয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রয়োগ করতে না পারলে নির্বাচনের পরিবেশ থাকে না। হত্যা খুনের মতো ঘটনায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যায়। হত্যাকারী ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলে আস্থা কখনো ফিরে আসে না। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। নির্ভয়ে বা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করা যায় না। ভয় ভীতির মাঝে দিন কাটে। যা নির্বাচনী পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। কেউ বলবে না পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবী করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। জোর জবরদস্তি ও বল প্রয়োগ বেড়েছে, ভয় ভীতি প্রদর্শন বেড়েছে, অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে, ধর্ষণ বেড়েছে, খুন খারাপি বেড়েছে। মানুষ পদে পদে মবের শিকার হচ্ছে। হেনস্তা হচ্ছে, অপমানের শিকার হচ্ছে, অপদস্থ হছে। বিশেষ কোনো সময়ে বা দিনে ঘটছে তা নয়, এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার। এসব অপরাধ দমনে তারা যেন নির্লিপ্ত। কোথাও কোথাও ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তারপর পুলিশি অভিযান শুরু হয়। ততক্ষণে অপরাধীরা পালিয়ে যায়। নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারে। প্রকৃত অপরাধীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় যারা ঘটনার সাথে মোটেই সম্পৃক্ত নয়। নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা বা হয়রানি করা আইনসঙ্গত নয়। এতে মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়।
প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণা নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলে। জনসংযোগের মাধ্যমে প্রার্থীরা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। জনগণই প্রার্থী বাছাই করে কাকে ভোট দিবে। এখন প্রর্থীরা অবাধে চলাফেরা করতে না পারলে জনগণ পর্যন্ত কি করে পৌঁছবে। রাজনীতিতো জনগণের জন্য। জনগণই নেতা নির্বাচন করে। যে রাজনীতির সাথে জনগণের সম্পর্ক তৈরি হয় না সে রাজনীতি বেশিদূর এগুতে পারে না। এজন্য রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের জনগণের কাছে যেতে হয়। জনগণের কাছে থাকতে হয়। জনবিচ্ছিন্ন থেকে রাজনীতি করা যায় না। নেতা হওয়া যায় না। নির্বাচন করতে হলে জনগণের প্রয়োজন হয়। জনসমর্থন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। জনগণের মাঝে সহজে বিচরণ করতে না পারলে কিংবা নির্ভয়ে প্রচারণা চালাতে না পারলে নির্বাচন অবাধ হয় না। নির্বাচনে প্রার্থীরা ভয় ভীতির মধ্যে থাকলে ভোটাররা কখনো নির্ভয়ে থাকতে পারে না।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে থাকে। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও স্বতন্ত্রপ্রার্থী তেমন থাকে না। কোন দল বা জোট থেকে মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তাকে বিদ্রোহী প্রার্থী বলা হয়। আসলে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে থাকে। জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার ধারণা আগে থেকে প্রচলিত। এতে লাভ লোকসান দুই আছে। তবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য জোট অনেক সময় ভালো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।
আদর্শের দিক থেকে পার্থক্য থাকলেও সমমনা দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে। কেউ কেউ নির্বাচনী জোট বলে। অনেক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও কোন কোন দল নির্বাচনের আগে জোটবদ্ধ হয়ে যায়। কেউ নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার জন্য কেউ আবার কিছু আসন পাওয়ার আশায় জোটে যায়। যদিওবা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব মতাদর্শ ও সুুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। তবে নির্বাচনী জোটে থেকে কোনো দলের জনসমর্থন কতটুকু তা নির্ণয় করা যায় না। রাজনীতির জন্য জনসমর্থন অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের পক্ষ। বিশেষ করে যেসব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে। বড় বড় রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক থাকে। এসব দলের প্রভাব নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচনের অংশ গ্রহণ করলে একভাবে প্রভাবিত করে আবার না করলে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে। যেহেতু নির্বাচনে জনসমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জনসমর্থন আছে এমন রাজনৈতিক বড় দল নির্বাচন থেকে দূরে থাকলে ঘুরে ফিরে প্রশ্নটা চলে আসে। এ দলের সমর্থকরা কোন প্রার্থীকে ভোট দিবে? ভোট দিতে গিয়ে কি তারা বাধার সম্মুখীন হবে। ভয় ভীতির মুখামুখি হবে। নাকি তারা ভোট প্রদানে বিরত থাকবে। তাদের মতামতের প্রতিফলন কি করে ঘটাবে। এসবের সহজ কোন উত্তর নেই। যারা যেদিকের সে পক্ষে কথা বলে। নিরপেক্ষ মতামত কেউ দিতে চায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবার মতামতের প্রতিফলন হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে পরে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠতে পারে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন সবাই চায়। প্রতিহিংসা কেউ চায় না। প্রতিহিংসা থেকে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। সংঘাতপূর্ণ নির্বাচন কেউ চায় না। তবুও নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত হয়। রক্তপাত হয়, খুন খারাবি হয়। প্রতিপক্ষ চাইলে এসব থেকে দূরে থাকা যায়। কিন্তু কোন পক্ষ দূরে থাকতে চায় না। সবাই চায় ভোটে জয়লাভ করতে। কেউ হারতে চায় না। হারলেও হার মানতে চায় না। এক ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করে। কখন তা মাথাচড়া দিয়ে ওঠে বলা যায় না। নিজেরা সংঘাত করে বানচাল কারীদের ওপর দোষ চাপাতে চেষ্টা করে। যারা নির্বাচন থেকে দূরে থেকে যায় তারা কখনো চায় না একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। চায় বিতর্কিত নির্বাচন হোক। শুধু বানচালকারীরা নয় যারা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশংকা করে তারাও সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না।
নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো কে কি বললো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। একে অন্যকে দোষারোপ করা নতুন কিছু নয়। আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতির উন্নতি কতটুকু হয় বলা যায় না। নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তাও নিশ্চিত হয়। সরকার নিরপেক্ষ থাকতে পারবে কিনা তা একেবারে বলা যায় না। দলাদলি মারামারি কখনো বন্ধ হবে না। বিষোদগার কখনো থেমে যাবে না। মিথ্যা হঠকারিতা চলতে থাকবে। ফেসবুক ইউটিউব কিছু বন্ধ হবে না। খুন খারাপিও বন্ধ হবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কখনো বন্ধ করা যায় না। এ সবকিছু চলমান থাকবে। এতো কিছুর পর মানুষ একটা নির্বাচন চায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা কেউ বলতে পারে না। অবাধ নিরপেক্ষ হবে কিনা তাও বলা যায় না। অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা তাও । গ্রহণযোগ্যতা পাবে কিনা তা পরের কথা, আগে নির্বাচন হোক। উৎসবমুখর পরিবেশে না হোক, ইতিহাসের সেরা নির্বাচন না হোক, একটা ভালো নির্বাচন হোক। তাও না হলে অন্তত একটা নির্বাচন হোক। মানুষ এখন এটাই চায়। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী












