নগরীতে ১২ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী শ্রাবন্তীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় র্যাব দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ নগরীর লালখান বাজার এলাকা থেকে ওই দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে র্যাব–৭এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃত দুইজন হলেন, প্রদীপ লাল ঘোষ (৫২) ও অজয় সিংহ (২৫)। তারা নগরীর লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা।
র্যাব জানিয়েছে, গত ৩ জানুয়ারি নগরীর খুলশী থানার লালখান বাজারের টাংকির পাহাড় এলাকার এক বাসা থেকে শ্রাবন্তী ঘোষ নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। শ্রাবন্তী স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়।
শ্রাবন্তীর বাবা তপন ঘোষ সিইপিজেডে এবং মা রোজি ঘোষ ওয়াসার মোড় এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। যাতায়াতের সুবিধার জন্য তপন ঘোষ সিইপিজেড এলাকায় একটি ব্যাচেলর বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন এবং রোজি ঘোষ ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে লালখান বাজার টাংকির পাহাড় এলাকায় একটি সেমিপাকা কলোনিতে ভাড়া বাসায় থাকেন। তপন ঘোষ সপ্তাহে একদিন টাংকির পাহাড় এলাকার বাসায় এসে স্ত্রী সন্তানদের দেখে যান। টাংকির পাহাড়ের বাসায় রোজি ঘোষ ছেলে মেয়েকে রেখে প্রতিদিন দুপুরে পোশাক কারখানার কাজে যেতেন, ফিরতেন বেশ রাতে।
র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, লালখান বাজারে রোজিদের বাসার কাছেই তার শ্বশুর–শাশুড়ি অর্থাৎ শ্রাবন্তীর দাদুর বাসা। মা কর্মস্থলে থাকার কারণে শ্রাবন্তী প্রায়ই ছোটভাইকে নিয়ে বাসায় থাকতো। এজন্য প্রায়ই সে নিজেদের বাসা থেকে দাদুর বাসায় আসা–যাওয়া করতো। ঘটনার দিন ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে দাদুর বাসায় গিয়ে রাত ৯ টার দিকে নিজের বাসায় ফিরে আসে। তখনও তার মা কারখানা থেকে ফিরেননি। কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসায় রাত পৌনে ১০টার দিকে শ্রাবন্তীর দাদু তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখেন, দরজা খোলা এবং বাসার ভেতর সে সিলিংয়ের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলে আছে।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশকে খবর দেয়া হলে পুলিশ রাতেই লাশ উদ্ধারের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। এরপর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে সেটি নগরীর বলুয়ার দীঘির পাড় শ্মশানে দাহ করা হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলাও দায়ের করে।
তবে বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নজরে আসার পর চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সহ–সভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল ও তার অনুসারী নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। শিশুটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে গত বুধবার রাতে মা–বাবাকে নিয়ে সৌরভ খুলশী থানায় যান। রাতেই শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ওই কলোনির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ এবং তাদের পাশের বাসার ভাড়াটিয়া অজয় সিংহসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২–৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন শ্রাবন্তীর মা রোজি ঘোষ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সং/২৫) ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। মামলা নম্বর– (৫)/২৬।
মামলা রেকর্ডের ২৩ ঘণ্টার মধ্যে গতকাল সকালে র্যাব দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত দুজন হচ্ছে কলোনির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ ও অজয় সিংহ। প্রদীপ লাল ঘোষ মতিঝর্ণা এলাকার মৃত মতি লাল ঘোষের পুত্র এবং অজয় সিংহ রাঙ্গুনিয়ার চা বাগান এলাকার স্বপন সিংহের পুত্র।
স্থানীয়রা জানান, শ্রাবন্তী আত্মহত্যা করেছে এটি কোনোভাবেই তার মা–বাবা মানতে নারাজ। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে বাড়ির মালিকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভয় কিংবা সামাজিকভাবে হেনস্থা হওয়ার আশঙ্কায় এ বিষয়ে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বিষয়টি জানতে পারার পর ছাত্রদল নেতা সৌরভ প্রিয় পাল তাদের সঙ্গে দেখা করে মামলা করার জন্য থানায় নিয়ে যান। মামলা দায়েরের পর র্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্থানীয়রা প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।
প্রদীপ ও অজয়কে সন্দেহ করা প্রসঙ্গে তপন ঘোষ বলেন, ‘আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি। তার পা মাটির সঙ্গে লাগানো ছিল। এভাবে আত্মহত্যা করা যায় না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির মালিক তপন সবসময় মদ্যপ অবস্থায় থাকতো। আমাদের পাশে অজয়ের বাসায় আসতো, আমাদের বাসার সামনেও লোকজন নিয়ে আড্ডা দিত, যদিও তার বাসা আরও দূরে। আমার মেয়েসহ ছোট ছোট মেয়েদের তারা নানাভাবে উত্যক্ত করতো। এজন্য আমাদের সন্দেহ প্রদীপ ও অজয় নিশ্চয় এই ঘটনার সাথে জড়িত।’
খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে ধর্ষণের মামলা দায়েরের পর হত্যার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। এছাড়া তদন্তে যদি কারও সম্পৃক্ততা উঠে আসে, সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’












