মীরসরাই উপজেলায় একসময় প্রকৃতির সৌন্দর্যবর্ধক ফসল হিসেবে সরিষার চাষ শুরু হলেও বর্তমানে এটি উপজেলার অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে পরিচিত। একদিকে কৃষকরা নিজেদের চাষকৃত সরিষা থেকে তেল উৎপাদন করে পরিবারের চাহিদা মিটাচ্ছেন, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষও সরিষা তেলের প্রতি অভ্যস্ত হওয়ায় সরিষা চাষ এবং সরিষা তেল উত্তোলন মিলের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
গত তিন বছরে মীরসরাইয়ের বিভিন্ন হাটে নতুন করে ৯টি সরিষা তেল মিল স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উপজেলায় ৬৬৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। শীতের উষ্ণ বেলাগুলোতে উপজেলার গ্রামগুলোতে হলুদ সরিষার গালিচা বিস্তার করেছে, যা সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের জন্য অর্থকরী ফলন নিয়ে এসেছে। এ বছরের সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬৬৫ মেট্রিক টন, যেখানে প্রতি হেক্টর এক টন সরিষা উৎপাদিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। উপজেলার হিঙ্গুলী গ্রামের সরিষা চাষি আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি এ বছর ১২ কড়া জমিতে বারি–১৪ এবং বিনা–৯/১০ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। খরচ মাত্র কয়েক হাজার টাকা হলেও ভালো ফলনের কারণে তিনি ১০ গুণ লাভ আশা করছেন। দক্ষিণ মধ্যম অলিনগরের চাষি গনি আহম্মদ বলেন, গত বছর ২০ শতক জমিতে বারি–১৪ সরিষা চাষ করে ৩০ কেজি ফলন পেয়েছিলাম। এবার একই জাত ৩০ শতক জমিতে চাষ করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ বছর ভালো ফলনের আশাবাদী।
মীরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কৃষক সরিষা চাষ করছেন। একসময় উপজেলায় মাত্র একটি মিল থাকলেও এখন ব্যবসায়িক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন হাটে বছরে কয়েকটি করে নতুন মিল স্থাপন হচ্ছে। বর্তমানে করেরহাটে ১টি, বারইয়াহাটে ২টি, মিঠাছরায় ২টি, আবুতোরাবে ২টি, হাইতকান্দিতে ১টি এবং মাতবরহাটে ১টি নতুন মিল বসানো হয়েছে। এর আগে শুধু বড়দারোগারহাটে একটি মিল ছিল। মীরসরাই পৌরসদর বাজারের সরিষা তেল মিলের মালিক রেজাউল করিম জানান, স্থানীয় কৃষকরা সরিষা ভেঙে তৈরি তেল শুধুমাত্র নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটাচ্ছেন। অন্যদিকে, বাইরে থেকে আসা ক্রেতারা চট্টগ্রাম থেকে সরিষা এনে এখানে তেল উৎপাদন করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ পরিবার সরাসরি সরিষা তেল মিল থেকে ভোজ্য তেল গ্রহণ করছে।
উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কাজী নুরুল আলম জানান, করেরহাট ইউনিয়নে ১৭ হেক্টর, হিঙ্গুলীতে ১৪ হেক্টর এবং দুর্গাপুরে ১২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এছাড়া ইছাখালী, কাটাছরা, ওয়াহেদপুর এবং হাইদকান্দিতেও সরিষা চাষ হচ্ছে। সরিষা চাষে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম লাগে, অল্প পুঁজিতে ভালো লাভ হয় এবং আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে এই অতিরিক্ত ফসল ঘরে তোলা যায়। বারি সরিষা–১৪, ১৭ এবং বিনা সরিষা–৯, ১১–এর মতো উচ্চ ফলনশীল জাতগুলো কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়।
কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, কিছু চিকিৎসকের স্বাস্থ্যসচেতন অনলাইন প্রচারণায় সয়াবিনের পরিবর্তে প্রাকৃতিক সরিষার তেল খাওয়ার পরামর্শের কারণে মানুষ সরিষা তেলের দিকে ঝুঁকছে। স্থানীয় সরিষার দাম কিছুটা বেশি হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে অন্যান্য জেলা থেকে সরিষা আমদানি হচ্ছে।
এতে বোঝা যায়, উপজেলায় সরিষা চাষ বৃদ্ধি পেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, যদি আমন ধান আগে লাগানো হয়, তবে ধান ওঠার পর একই জমিতে সরিষা লাগিয়ে ফলন আরও বাড়ানো সম্ভব।












