সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মানসিক স্বাস্থ্যে বিপর্যয় ও থ্রি ‘এল’ থিওরি

ফজলুর রহমান | শুক্রবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মিনিট দশেকের জন্য ফেসবুকে ঢুঁ মারতে গেলেন। কিন্তু স্ক্রলিং করতে করতে কখন যে একঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে, ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাচ্ছে টেরই পাননি! ফেসবুক তথা সোশ্যাল মিডিয়া নিজেদের অজান্তেই এভাবে করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামের মতো সোশ্যাল সাইটগুলোতে পড়ে থাকলে কেবল সময়ই নষ্ট হয় না, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আজকাল বিষণ্‌ণতার মতো ব্যাধি অনেক বেড়ে গেছে অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কারণে।

বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মহামারী আকার ধারণ করার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া অন্যতম দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বর্তমানে সারাবিশ্বে একশ’ কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ইউনিসেফের একটি জরিপে উঠে এসেছে ৫১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার প্রবণতা বেশি। বিবিসি এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সামপ্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বজুড়ে যুবসমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার দিকগুলো নজরে আসতে শুরু হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার এই ঝুঁকিতে বিশেষভাবে সামনে আসছে কিশোর ও তরুণদের কথা। ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাত জনের একজন (ছেলেমেয়ে উভয়) কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের এক গবেষণায় জানানো হয়। ল্যানসেট সাইকিয়াট্রি কমিশনের মতে, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানসিক সমস্যার সূচনা ২৫ বছর বয়সের আগেই হয় এবং এর সর্বোচ্চ মাত্রা মাত্র ১৫ বছর বয়সে শুরু হয়। শারীরিকভাবে তরুণরা আগের চেয়ে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে তারা বেশি বিপর্যস্ত এবং এই সংখ্যা বাড়ছে, যা যুব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বিপজ্জনক ধাপহয়ে উঠছে, বলছে সাইকিয়াট্রি কমিশন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান দুটি কারণের একটি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব । সামাজিক মাধ্যমের ভালো খারাপ দুই দিকই আছে। একদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া টিনএজার বা কিশোরকিশোরীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে ও তথ্য দেয়, আবার অন্যদিকে ক্ষতিকর কনটেন্ট এক ধরনের বিষাক্ত ধারণা ছড়ায়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে সোশ্যাল মিডিয়ার সব বিষয়বস্তু নেতিবাচক নয়, এবং অনলাইনে থাকা কিছু বিষয়বস্তু মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যও কার্যকর হতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম বড় সমস্যা তৈরি করে, কারণ এগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যা ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এমন কনটেন্টকে প্রাধান্য দেয়। ইতিবাচক ও স্বাস্থ্যকর কনটেন্ট সেগুলোকে ছাপিয়ে যেতে পারা বেশ কঠিন। কিশোরকিশোরী ও অভিভাবকদের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে তা শেখানো জরুরি।

ওয়েবএমডি সামপ্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দুশ্চিন্তার এক উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে। কারও কারও হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ (ফোমো)। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুপস্থিতিতে যা ঘটছে, তা ‘মিস’ হয়ে যাওয়ার ভয়। সময়ের সঙ্গে ‘আপডেটেড’ থাকতে না পারার ভয়। এই ব্যক্তিরা এই প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে সমস্যায় পড়েন। আবার ধরুন, কেউ কোথাও বেড়াতে গেছেন, সেখানকার সৌন্দর্য, খাবারের স্বাদ, এমনকি রোজকার জীবনের বাইরে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য্তসবকিছু নিজে উপভোগ করার চেয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়াটা বেশি ‘জরুরি’ হয়ে দাঁড়াতে পারে কারও কারও কাছে। সব কিছুর ছবি তোলার বাড়াবাড়ি রকমের বাসনা, ছবিতে নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা্তসবটা মিলিয়েই একধরনের অস্থিরতা কাজ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ‘সুখময়’ জীবনছবি দেখে নিজেকে ‘বঞ্চিত’ ভেবে বসতে পারেন কেউ কেউ। কারও ছবি বা ভিডিও দেখে মনে হতে পারে, ‘ও কত সুখী’ বা ‘ও কত সফল’। অথচ বাস্তব জীবন সুখদুঃখ মিলিয়েই। ‘ওর ছবিতে কত কত রিঅ্যাকশন, আর আমারটায় মাত্র এই কটা!’্তএমন তুলনাও মনে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করতে পারে। আবার অন্যের তির্যক মন্তব্যের কারণেও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবচেয়ে বড় যে নেতিবাচক প্রভাবটি তৈরি করে সেটা হলোহীনমন্যতাবোধ। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অন্যের পোস্ট দেখে নিজের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে মানসিকভাবে হীন বোধ করার ফলেই এমনটা হয়ে থাকে। যেটাকে বলা হয়ে থাকে ইনফিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা। মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেশি; বাড়ে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ আর অলীক ঘনিষ্ঠতা।

কীভাবে দূরে থাকবেন ফেসবুক, টুইটার বা ইন্সটাগ্রাম থেকে? ইনসাইডার ম্যাগাজিন কিছু উপায় প্রকাশ করেছে:

১। ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা:

আপনি কেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছেন? এই উত্তর খুঁজে বের করতে হবে আপনাকেই। বিষয়টি সম্পর্কে আপনি একবার সচেতন হয়ে গেলে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করা যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে পারবেন।

২। নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করা:

প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে কতোটা সময় ব্যয় করবেন সেটা ঠিক করুন। সে অনুযায়ী স্মার্টফোনে অ্যাপ টাইমার সেট করে নিন।

৩। নোটিফিকেশন অ্যালার্ট বন্ধ করা:

ফোনে সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন আসলে বারবার চেক করতে ইচ্ছে হয়। তাই মুঠোফোনে যেন নোটিফিকেশন না আসে সেজন্য সেটিং বদলে দিন।

৪। শখের কাজে সময় ব্যয়:

সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাহীন সময় ব্যয় করা কোনও ভালো ফল বয়ে আনে না। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে তাই অন্যান্য শখের কাজের প্রতি মনোযোগ দিন। বই পড়া, শখের বাগান করা বা অন্য কোনও শখের কাজ থাকলে সেটা নিয়ে সময় কাটান।

৫। বাস্তব যোগাযোগ বাড়ানো:

চেষ্টা করুন বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করে আড্ডা দিতে। আড্ডার সময় ফোন ব্যবহার করবেন না, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করবেন প্রয়োজন ছাড়া ফোন ব্যবহার না করার জন্য। পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটান, খাবার খান, নির্মল আড্ডা দিন। এই সময় হাতের কাছে স্মার্টফোন রাখবেন না।

৬। পেইজগুলোতে প্রয়োজন ছাড়া লাইক না দেয়া:

শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, গয়না, গ্যাজেট বা অনলাইন কেনাকাটার সাইটগুলোর পেইজ লাইক করবেন না। অযথা বিজ্ঞাপন আসলে সেগুলো হাইড করে দিন।

৭। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করা:

একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিন নিজেকেই। সেটা শুরুতেই অনেক বেশি সময়ের জন্য হতে হবে এমন নয়। শুরুতে একটি পুরো বেলা, এরপর একদিন এভাবে এগিয়ে সপ্তাহখানেকের জন্য সময় নির্ধারণ করতে পারেন।

এরপর জোর দিতে হবে ‘মন উদ্ধার কার্যক্রমে। গুরুতর মানসিক সমস্যায় থাকলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনটি এলমনে রাখতে হবে।

. লুক অর্থাৎ দৃষ্টি দেওয়া: যাদের ভেতর তীব্র কষ্টযন্ত্রণা ও মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে, তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া।

. লিসেন বা শোনা: মনোযোগ দিয়ে তাদের চাহিদা ও উদ্বেগগুলো শোনা; তাদের স্বস্তি দিতে ও শান্ত রাখতে তাদের কথা শুনুন।

. লিংক বা সংযোগ স্থাপন: চাহিদা পূরণ ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে, সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করতে হবে, প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে, সামাজিক সহায়তা দিচ্ছে, এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দিতে হবে।

ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া থেকে পুরোপুরিভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলাটা বাস্তবসম্মত সমাধান নাও হতে পারে। তবে সেখানে নিজের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা জরুরি। মনে রাখতে হবে, আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাতে আপনাকে ব্যবহার করতে না পারে।

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

পূর্ববর্তী নিবন্ধআহ্‌লান সাহ্‌লান মাহে রামাদান
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা